ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে কোরবানির পশু পরিচর্যার প্রস্তুতি প্রায় শেষ হলেও পশুখাদ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় লাভ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন খামারিরা। পাশাপাশি নতুন করে যুক্ত হয়েছে আর্থিক ও ক্রেতা সংকট। খামারিদের বড় একটি অংশ কোরবানিকে সামনে রেখে গরু মোটাতাজা করে থাকে। ফলে এ সময় পশুর প্রত্যাশামতো দাম না পেলে তাদের বড় ধরনের লোকসান গুনতে হয়।
গত বছরের তুলনায় এবার গরুর দাম কম—এমনটা দাবি করেছেন খামারিরা। বড় গরুর তুলনায় মাঝারি মানের গরুর চাহিদা বেশি থাকায় দাম ওঠা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন তারা। খামারিরা বলছেন, কোরবানির হাটে চার থেকে ছয় মণ ওজনের গরুর চাহিদা বেশি। তবে ক্রেতার পরিমাণ সে তুলনায় কম। এছাড়া সীমান্ত দিয়ে ভারতের গরু ঢুকছে বলেও দাবি করছেন অনেক খামারি।
রাজধানীতে কোরবানির পশুর বড় অংশই আসে উত্তরাঞ্চল থেকে। এর মধ্যে বিশেষ ভূমিকা রাখে জয়পুরহাট, বগুড়া, পাবনা ও সিরাজগঞ্জ জেলা। জয়পুরহাটে গবাদিপশুর খাবার জোগান সহজ হওয়ায় এক সময় মাঝারি ও বড়—সব মিলিয়ে প্রায় ৬৫ হাজার ৭৬৪টি ডেইরি ফার্ম গড়ে ওঠে। বর্তমানে পশুখাদ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় অনেক খামারি তাদের খামার বন্ধ করে দিয়েছেন।
জেলায় বর্তমানে ১০ থেকে ২০টি গরু আছে, এমন খামারির সংখ্যা তিন থেকে চার হাজারের কাছাকাছি। খামারিদের অনেকে বলছেন, সম্ভাবনাময় এ খাতে সরকারি নজরদারি এবং সহায়তা না পেলে ভবিষ্যতে ডেইরি ফার্ম শিল্প হুমকির মুখে পড়তে পারে।
জয়পুরহাট ডেইরি ফারমার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সাদমান জয় রায়হান বলেন, খামারে যে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়, তা কৃষি খাতে নেওয়ার দাবি দীর্ঘদিনের। কিন্তু সরকার এখনো তা বাস্তবায়ন করেনি। ফলে খামারিরা অর্থনৈতিক চাপে রয়েছেন। একই সঙ্গে শ্রমিকের মজুরিও বেড়েছে।
সদর উপজেলার দোগাছি গ্রামের খামারি রোজিনা পারভিন ২০২১ সালে ১০টি গরু নিয়ে খামার শুরু করেন। বছর দুয়েক তিনি খামার থেকে লাভ করলেও ২০২৩ সালের পর থেকে টানা লোকসান গুনতে থাকেন। লোকসানের ধাক্কায় শেষমেশ খামার বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন তিনি।
তিনি বলেন, গরু মোটাতাজা করতে চার থেকে ছয় মাস সময় লাগে। এই সময়ে একটি গরুর খাবারের পেছনেই খরচ হয় ৪৭ থেকে ৫৪ হাজার টাকা। এর বাইরে চিকিৎসা, শ্রম এবং অন্যান্য খরচ তো আছেই। এত ব্যয় করার পর দেখা যায় সর্বোচ্চ ১০-১৫ হাজার টাকা লাভ হয়। এভাবে খামার টিকিয়ে রাখ দায়।
জয়পুরহাট জেলায় কোরবানির পশুর প্রস্তুতি ও বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মহির উদ্দীন বলেন, এ বছর কোরবানির জন্য প্রায় তিন লাখ ২৬ হাজার পশু প্রস্তুত আছে। স্থানীয় চাহিদা প্রায় দুই লাখ। এ হিসাবে জেলায় প্রায় এক লাখ ২৩ হাজার পশু উদ্বৃত্ত থাকবে।
কৃষকদের সমস্যার কথা তুলে ধরলে তিনি বলেন, জয়পুরহাট প্রধানত ধান উৎপাদনকারী জেলা হওয়ারয় এখানে প্রচুর পরিমাণে খড় এবং ঘাস উৎপাদন হয়। ফলে অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় এখানে গোখাদ্যের সংকট বা উচ্চমূল্যের প্রভাব খামারিদের ওপর তুলনামূলক কম।
সীমান্ত এলাকা হওয়ায় সতর্কতা কেমন—এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে কোনো গরু যাতে দেশে প্রবেশ করতে না পারে, সেজন্য বিজিবি এবং স্থানীয় প্রশাসন অত্যন্ত সতর্ক রয়েছে। সম্প্রতি আইনশৃঙ্খলা বিষয়ক সভায় প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রীর উপস্থিতিতে এ বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়। এখন পর্যন্ত অবৈধ পশু অনুপ্রবেশের কোনো ঘটনা ঘটেনি।
দাম নিয়ে শঙ্কায় বেড়ার খামারিরা
এবার কোরবানির পশুর ন্যায্য দাম পাওয়া নিয়ে পাবনার বেড়া উপজেলার গো-খামারিদের মধ্যে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। বেড়া প্রাণিসম্পদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, উপজেলায় ৪০ হাজার ১১০টি কোরবানির পশুর চাহিদা রয়েছে। এর বিপরীতে বেড়া পৌরসভা ও উপজেলার ৯টি ইউনিয়নে প্রস্তুত রয়েছে ৯২ হাজার ১২০টি পশু। অতিরিক্ত পশু আছে প্রায় ৫২ হাজার, যা চাহিদার তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। উপজেলার মোট ৫৩ হাজার ৫০০টি খামার ও গ্রামীণ পরিবারের উদ্যোগে দেশীয় ও প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে এসব পশু লালন-পালন করা হয়েছে।
বেড়া উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. সাইফুল ইসলাম বলেন, এ উপজেলায় মোট গরু বেচাকেনার হাট রয়েছে তিনটি। এর মধ্যে উত্তরাঞ্চলের প্রবেশদ্বার উপজেলার প্রাণকেন্দ্র সিঅ্যান্ডবি চুতুর হাট, নাকালিয়া হাট ও বাধের হাট। হাটগুলোয় গরু বেচাকেনার জন্য ব্যাপারীরা দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসেন। তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার্থে এবং গবাদিপশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, এ উপজেলায় মোট খামারের সংখ্যা ৫৩ হাজার ৫০০। এর মধ্যে চর এলাকায় খামারের সংখ্যা রয়েছে ৪৮ হাজার ৮০টি।
এদিকে চরাঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকার একাধিক খামারি এবং গরুর ব্যাপারীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এখনো গুরুর হাট পুরোপুরি জমে ওঠেনি। কিছু কিছু এলাকার স্থানীয় ব্যাপারীরা ঘুরে ঘুরে দেখে গরু পছন্দ করছেন।
চর এলাকার হাটুরিয়া গ্রামের খামারি মাসুদ বলেন, চর এলাকায় গরুর খাবারের সংকট থাকে। বাজারে গোখাদ্যের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় এবার গরুতে লাভ করা কঠিন হয়ে যাবে।
পরেন ব্যাপারী ও পেচাকোলা গ্রামের মাসুদ মণ্ডল বলেন, এমনিতেই দেশি গুরর জোগান চাহিদার তুলনায় বেশি। তারপর যদি ভারত থেকে সীমান্ত দিয়ে গরু আসে, তাহলে পশুর বাজারে ধস নামবে।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, কোরবানির ঈদ সামনে রেখে দেশে গবাদিপশুর উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে বিদেশি গরুর ওপর নির্ভরশীলতা অনেকাংশে কমে গেছে। বিশেষ করে দেশের প্রায় প্রত্যেক জেলায় চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত পশু প্রস্তুত আছে।
সাতক্ষীরা, শেরপুর এবং ভৈরবের মতো অঞ্চলগুলোয় স্থানীয় চাহিদার তুলনায় প্রচুর পরিমাণ অতিরিক্ত পশু প্রস্তুত রয়েছে। সাতক্ষীরায় ১৮ হাজার এবং ভৈরবে ১২ হাজার পশু উদ্বৃত্ত আছে। শেরপুরের পাহাড়ি অঞ্চলে প্রাকৃতিকভাবে লালন-পালন করা গরুর ব্যাপক চাহিদা দেখা গেছে।
তবে খামারিরা দাবি করছেন, পশুখাদ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, পরিবহন খরচ এবং বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেছে।
সাতক্ষীরা জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. এএফএম আব্দুল মান্নান বলেন, এবার জেলায় কোরবানির পশুর কোনো সংকট নেই। স্থানীয় চাহিদা পূরণের পর উল্লেখযোগ্যসংখ্যক পশু উদ্বৃত্ত থাকবে। সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় গরু প্রবেশ প্রায় বন্ধ থাকায় দেশীয় খামারিরা ভালো বাজার পাওয়ার আশা করছেন।
সম্প্রতি বগুড়ায় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেছেন, প্রতিবেশী রাষ্ট্র থেকে সীমান্ত এলাকা হয়ে অবৈধভাবে গবাদিপশু প্রবেশ রোধে বিজিবিসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং প্রশাসনকে কঠোর নজরদারি ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।