কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের ছাত্রী সোহাগী জাহান তনু হত্যা মামলার তদন্তে নতুন তথ্য সামনে এসেছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মামলার সন্দেহভাজন আসামি সাবেক সেনাসদস্য শাহিন আলম দেশ ছেড়ে কুয়েতে পালিয়ে গেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর মামলার তদন্তে গতি আসার খবর ছড়িয়ে পড়লে তিনি দেশত্যাগ করেন বলে জানা গেছে।
শাহিন আলমের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তার মোবাইলফোনও বন্ধ পাওয়া যায়।
পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, শাহিন আলমের ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরগুলোর সর্বশেষ অবস্থান ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পর্যন্ত পাওয়া গেছে। এরপর আর কোনো অবস্থান শনাক্ত করা যায়নি।
জানা গেছে, শাহিন আলম কুমিল্লা সেনানিবাসের ২ সিগন্যাল ব্যাটালিয়নের সৈনিক ছিলেন। চাকরির অল্প সময়ের মধ্যেই শারীরিকভাবে ‘আনফিট’ হওয়ার কথা প্রচার করে সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেন। পরে কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার গোবিন্দপুর এলাকায় গড়ে তোলেন একটি বড় গরুর খামার। দেশ ছাড়ার পর তার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেলে সেটি অন্য একটি পক্ষ ভাড়া নিয়ে পরিচালনা করছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
মামলার বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা মো. তরিকুল ইসলাম তদন্তকালে তিনজন সাবেক সেনাসদস্যের নাম কুমিল্লার জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম ১ নম্বর আমলি আদালতে দাখিল করেন। বিচারক মুমিনুল হকের আদালতে দাখিল করা ওই তালিকায় শাহিন আলমের নাম তিন নম্বরে রয়েছে। আদালত তার ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের অনুমতি দিয়েছেন। একই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আবেদনও করেছেন তদন্ত কর্মকর্তা।
২০১৬ সালে সোহাগী জাহান তনু হত্যার পর দেশজুড়ে ব্যাপক গণ-আন্দোলন গড়ে ওঠে। পরে মামলার তদন্তভার পায় অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। তবে নিহতের পরিবার শুরু থেকেই অভিযোগ করে আসছে, তদন্তে প্রকৃত সন্দেহভাজনদের আড়াল করা হয়েছে।
জানা গেছে, ২০১৬ সালে তদন্ত কর্মকর্তারা অন্তত ১৩ জনের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে সিআইডির ডিএনএ ল্যাবরেটরিতে পাঠান। ডিএনএ পরীক্ষক নুসরাত ইয়াসমিনের ছয় পাতার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ওই ১৩ জনের কারও ডিএনএর সঙ্গে তনুর পোশাকে পাওয়া পুরুষের ডিএনএর মিল পাওয়া যায়নি।
সে সময় যাদের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছিল, তাদের মধ্যে ছিলেন মাহামুদুল হাসান, মহাইমিনুল ইসলাম জিলানী, মেহেদী হাসান মুরাদ, মিজানুর রহমান সোহাগ, রকিবুল ইসলাম, রুবেল আহমেদ, সৈয়দ সাইফুল ইসলাম, শেখ পেয়ার আহমেদ, নুর আলম বাপ্পী, সোহেল রানা, ওয়ালী উল্লাহ হৃদয়, নুরুল আজম ও মোজ্জামেল হোসাইন। তাদের কয়েকজন ভিক্টোরিয়া কলেজ থিয়েটারের সদস্য ছিলেন, যেখানে তনু নাট্যকর্মী হিসেবে যুক্ত ছিলেন।
তখনই তনুর বাবা অভিযোগ করেছিলেন, ‘আমার মেয়েকে হত্যা করা হয়েছে সেনানিবাসের ভেতরে। অথচ তারা সেনানিবাসের বাইরের লোকদের নমুনা সংগ্রহ করে ভিক্টোরিয়া কলেজ থিয়েটারের ছেলেদের হয়রানি করেছে।’
পরে এ মামলার তদন্তের দায়িত্ব পায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। সম্প্রতি পাওয়া ডিএনএ পরীক্ষার প্রতিবেদনে ওই অভিযোগের সত্যতা মিলেছে বলে দাবি করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংগ্রহ করা ১৩ জনের কারও ডিএনএর সঙ্গে আলামত থেকে পাওয়া ডিএনএর মিল পাওয়া যায়নি।
তনুর বাবা ইয়ার হোসেন অভিযোগ করে বলেন, ‘যাদের নাম আমি বারবার বলেছি, সিআইডির তদন্ত কর্মকর্তারা কাউকেই সামনে আনেননি। তাদের নমুনাও সংগ্রহ করেননি। সার্জেন্ট জাহিদ ও সৈনিক জাহিদের কথা বলেছি। অন্তত তাদের নমুনা সংগ্রহ করলেও হতো। কিন্তু তারা তা করেনি।’
তবে সম্প্রতি মামলাটি নতুন করে আলোচনায় আসে সন্দেহভাজন অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য হাফিজুর রহমান গ্রেপ্তারের পর। গত ২১ এপ্রিল ঢাকার কেরানীগঞ্জের নিজ বাসা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে পিবিআই। পরে আদালতের মাধ্যমে তিন দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। বর্তমানে তিনি কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারে রয়েছেন।
এদিকে ডিএনএ পরীক্ষায় তনুর পোশাকে তিনজন পুরুষের শুক্রাণুর পাশাপাশি আরও একজনের ডিএনও পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে পিবিআই। গত রোববার (১৭ মে) রাতে মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের কল্যাণপুরের পরিদর্শক মো. তরিকুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেন। এর ফলে মামলায় সন্দেহভাজনের সংখ্যা চারজনে দাঁড়িয়েছে বলে জানিয়েছে তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র।
তদন্ত কর্মকর্তা মো. তরিকুল ইসলাম বলেন, ‘সন্দেহভাজন আসামি শাহিন আলমের অবস্থান সম্পর্কে আমরা পুরোপুরি নিশ্চিত হতে পারিনি। শতভাগ নিশ্চিত হতে পারলে গণমাধ্যমকে জানানো হবে। আমরা চাই একটি বড় সাফল্য নিয়ে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে।