Image description

চেক ডিজঅনার মামলায় নামের মিলের জেরে ভুল ব্যক্তিকে আসামি করে এক বছরের সাজা দেওয়ার এক অদ্ভুত ঘটনায় বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। আদালত ও পুলিশের তদন্তে নিশ্চিত হওয়া গেছে, যাকে কারাগারে রাখা হয়েছে তিনি ব্যাংক হিসাবধারী সেই ‘আসল মামুন’ নন। অথচ নাম ও এলাকার মিলের ভুলে সহজ-সরল এক ব্যক্তি সাড়ে তিন মাস ধরে কারাভোগ করছেন, আর প্রকৃত আসামি রয়ে গেছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।

মামলার নথি অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ১৮ জুন ‘মেসার্স পড়ন্ত বেলা পোল্ট্রি ফিডের’ মালিক পরিচয়ে মো. মামুন মিয়া প্রাইম ব্যাংক লিমিটেডের ৩২ লাখ টাকার একটি চেক দেন। পরদিন ১৯ জুন চেকটি ‘অপর্যাপ্ত তহবিল’ মন্তব্যে ডিজঅনার হয়। পরে ১১ জুলাই মামুন মিয়াকে আইনগত নোটিশ পাঠানো হয়।

 

এরপর ‘বিশ্বাস পোল্ট্রি এন্ড ফিস ফিডস লিমিটেডের’ রিকভারি ম্যানেজার মোহাম্মদ ওয়াছিকুল আজাদ সরকার ২০১৯ সালের ২৫ আগস্ট নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্ট, ১৮৮১-এর ১৩৮ ধারায় মামলাটি করেন।

 

 

মামলায় ২০২১ সালের ১৪ ডিসেম্বর আদালত অভিযোগ গঠন করেন। এ সময় আসামিকে পলাতক দেখানো হয়। বিচার চলাকালে রাষ্ট্রপক্ষ একজন সাক্ষী এবং দালিলিক প্রমাণ আদালতে উপস্থাপন করে।

 

পরবর্তীতে ২০২৩ সালের ১৩ মার্চ পাওয়ারমূলে পরিবর্তন হয়ে মামলার বাদী হন মজিবুর রহমান।

 

দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে ২০২৫ সালের ২৯ জুন ঢাকার মহানগর যুগ্ম দায়রা জজ- ৪র্থ আদালতের বিচারক নাজমুন নাহার মামলার এক তরফা রায় ঘোষণা করেন। রায়ে আসামিকে এক বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং ৩২ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।

 

আদালত রায়ে উল্লেখ করেন, আসামি পলাতক থাকায় সাক্ষীদের জেরা করা সম্ভব হয়নি এবং রাষ্ট্রপক্ষের উপস্থাপিত সাক্ষ্য-প্রমাণে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে।

পরে ২০২৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি ওয়ারেন্টমূলে মামুন মিয়াকে গ্রেফতার করা হয়।

 

গ্রেফতারের পর আসামিপক্ষ দাবি করে, যিনি গ্রেফতার হয়েছেন তিনি প্রকৃত আসামি নন। তাদের দাবি, সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাব কিংবা চেকের সঙ্গে গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তির কোনও সম্পৃক্ততা নেই। এরপর আদালত নরসিংদীর শিবপুর মডেল থানাকে তদন্তের নির্দেশ দেন।

 

তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান আদালতে দেওয়া প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, প্রাইম ব্যাংক লিমিটেডের শিবপুর শাখার হিসাব নম্বর ২১৪১১০৮০০১০১০১-এর প্রকৃত মালিক মামুন মিয়া, যার পিতা সুরুজ মিয়া এবং মাতা যমুনা বেগম। কিন্তু বর্তমানে গ্রেফতার হওয়া মামুন মিয়ার পিতা মৃত আলী আকবর এবং মাতা নুরুন্নাহার—দুই ব্যক্তি সম্পূর্ণ আলাদা।

 

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, প্রকৃত আসামি বিভিন্ন ব্যাংক থেকে চেকের মাধ্যমে অর্থ উত্তোলনের পর প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে আত্মগোপনে চলে যান। একই এলাকায় বসবাস ও নামের মিলের কারণে লিগ্যাল নোটিশ ভুল ব্যক্তির কাছে পৌঁছে যায়। সরল বিশ্বাসে তিনি নোটিশ গ্রহণ ও স্বাক্ষর করেন। পরে ওই ঠিকানায় গ্রেফতারি পরোয়ানা কার্যকর করতে গিয়ে পুলিশ ভুল ব্যক্তিকেই গ্রেফতার করে।

 

এসআই মাসুদুর রহমান তার প্রতিবেদনে বলেন, “ধৃত আসামি মামুন সহজ-সরল প্রকৃতির লোক। প্রাথমিক তদন্তে প্রতীয়মান হয়েছে, ধৃত আসামি এবং ব্যাংক হিসাব পরিচালনাকারী ব্যক্তি একই নন।”

 

এসআই মাসুদুর রহমানের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি এ বিষয়ে কোনও কিছু বলতে রাজি হননি।

 

অন্যদিকে প্রাইম ব্যাংক শিবপুর শাখার নথি অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট হিসাবটি ‘মেসার্স পড়ন্ত বেলা পোল্ট্রি ফিড’-এর নামে খোলা, যার মালিক প্রকৃত মামুন মিয়া (পিতা সুরুজ মিয়া, মাতা যমুনা বেগম, ঠিকানা মুরগিবের, শিবপুর, নরসিংদী)।

 

গ্রেফতার হওয়া মামুন মিয়ার আইনজীবী সাদেকুল ইসলাম ভূঁইয়া জাদু বলেন, ব্যাংকের কেওয়াইসি তথ্যের সঙ্গে তার মক্কেলের পিতামাতার নামের কোনও মিল নেই। অথচ একই এলাকার নামের মিলের কারণে ভুল ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। তিনি আরও অভিযোগ করেন, বাদীপক্ষ ইচ্ছাকৃত বা চরম অবহেলায় প্রকৃত আসামিকে শনাক্ত না করে ভিন্ন ব্যক্তিকে হয়রানির শিকার করেছে।

 

তিনি জানান, মামলায় প্রতারণার অভিযোগ এনে আদালতে পিটিশন দাখিল করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা চাওয়া হয়েছে।

 

ভুক্তভোগী মামুনের ভাই নূর মোহাম্মদ বলেন, “ভুলের কারণে আমার ভাই জেল খেটেছে, এতে আমাদের পরিবার সামাজিক ও আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমরা এর বিচার চাই।”

 

আরেক ভাই মাসুম মিয়া জানান, নামের মিলের কারণে ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে এবং প্রকৃত আসামি ভিন্ন ব্যক্তি। শুনানিতে তদন্ত কর্মকর্তা, উভয় পক্ষের স্বজন ও সাক্ষীদের বক্তব্য শেষে আদালত মামুন মিয়াকে কারামুক্তির নির্দেশ দেন।