৫ আগস্টের আগে মহাখালীর সেতু ভবন, ঢাকা সড়ক বিভাগ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর ও বনানি এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের টোল প্লাজাসহ বিভিন্ন স্থাপনা আগুনে পুড়েছে। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে এমন অপকর্মের পরিকল্পনা নেন সে সময়ের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সড়ক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। তবে মাঠ পর্যায়ে দেশবিরোধী এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছেন সড়ক ও জনপথ- সওজের প্রধান প্রকৌশলী মঈনুল হাসান। ওবায়দুল কাদেরের নির্দেশে তিতুমীর কলেজ ছাত্রলীগ স্থাপনাগুলোতে ব্যাপক ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট চালায়। এতে অর্থায়নের দায়িত্ব পালন করেন সওজ’র প্রধান প্রকৌশলী মঈনুল হাসান। কিন্তু গণঅভ্যুত্থান বানচালে সরাসরি ভূমিকা এবং এমন নাশকতার ঘটনায় জড়িত থাকার পরও প্রকৌশলী মঈনুল হাসান গ্রেফতার হয়নি। এমনকি তার বিরুদ্ধে অন্য কোনো ব্যবস্থাও নেওয়া হয়নি। বরং গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তিনি আরো ক্ষমতাবান হয়ে ওঠেন। এই বিএনপি আমলেও মঈনুল হাসান আছেন বহাল তবিয়তে; সব কূল ম্যানেজ করে।
২০২৪ সালের ১৬ জুলাই মহাখালী ট্রাফিক পুলিশ বক্সের সামনে দুর্বৃত্তরা মোটরসাইকেলে আগুন দেয়। ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে মহাখালীর খাজা টাওয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যার ফলে দেশব্যাপী ইন্টারনেট সেবা ব্যাহত হয়। এসব ঘটনায় এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অফিসগামী কর্মকর্তা-কর্মচারীরা আটকা পড়েন। ১৮ ও ১৯ জুলাইয়ের দিকে পুরো মহাখালী এলাকাটি রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। ১৮ জুলাই ২০২৪ মহাখালীতে অবস্থিত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের ১০ তলা ভবনে হামলা ও ভাঙচুর চালানো হয়। আন্দোলনকারীদের মিছিলে থাকা ব্যক্তিরা প্রথমে ইটপাটকেল মারে, গাড়ি ভাঙচুর করে এবং পরে সিলিন্ডার বিস্ফোরণে ভবনে আগুন ধরে যায়। মহাখালীর বিভিন্ন স্থানে পুলিশ বক্স, রেললাইনের ওপর পুলিশের গাড়ি এবং এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের টোল প্লাজাতেও আগুন দেওয়া হয়। গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সেতু ভবন, ঢাকা সড়ক বিভাগ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর এবং বনানি এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে তিনদিন ধরে আগুনে পুড়েছে। এই ভয়াবহ নাশকতায় বিপুল পরিমাণে অর্থ ঢালা হয়। নাশকতাকারীদের পেছনে এসব অর্থের যোগান দেন প্রকৌশলী মঈনুল হাসান। তিনি এই কাজে সহযোগিতা নিয়েছেন সড়ক ভবনের ‘কাদের সিন্ডিকেট’ সদস্যদের। মহাখালী এলাকা জুড়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের আন্দোলনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতেই এমন কুকর্ম করেছিল সরকার ও আওয়ামীপন্থিরা। অথচ সেতু ভবনের ৫০ মিটার রেডিয়াসের মধ্যে অবস্থিত মঈনুল হাসানের সরকারি বাসভবন ছিলো সম্পূর্ণ সুরক্ষিত। পালা করেই ছাত্রলীগ-যুবলীগ পাহারা দিতো তার বাসভবন। গভীর রাতে প্রকৌশলী মঈনুল হাসান আসল খেলা শুরু করতেন। কোথায় কোন গ্রুপ নাশকতা চালাবে, কোন কাজে কত টাকা খরচ হবে, কারা কত টাকা পাবে- সব ঠিক করতেন মঈনুল হাসান। হাসিনার নির্দেশে এসব নাশকতা হচ্ছিল, ওপর থেকে নির্দেশনা দিতেন ওবায়দুল কাদের আর মাঠ পর্যায়ে নাশকতা বাস্তবায়নের দায়িত্বে ছিলেন প্রকৌশলী মঈনুল হাসান। পরবর্তীতে গণমাধ্যমেও এ নিয়ে একাধিকবার খবর প্রকাশিত হয়েছে।
গত বছরের জুনে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালে শুনানিতে তখনকার চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন চলাকালে আওয়ামী লীগের নাশকতামূলক কার্যক্রমের বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরেন। শুনানিতে বলা হয়, আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার ওপর দায় চাপানোর জন্য সেতু ভবন, বিটিভি, মেট্রোরেলসহ রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় অগ্নিসংযোগ করে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। আর দলীয় সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনীর মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হয় এসব ষড়যন্ত্রমূলক পরিকল্পনা। শেখ হাসিনার ফোনালাপ থেকে বিষয়গুলো জানা যায়। শেখ হাসিনাসহ তিন আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিলের সময় শুনানিতে এসব কথা বলেন সে সময়ের চিফ প্রসিকিউটর মুহাম্মদ তাজুল ইসলাম। পতিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং আইজিপি আব্দুল্লাহ আল মামুনকে অভিযুক্ত করে বক্তব্য দেন তাজুল ইসলাম। সে মামলায় অদৃশ্য ক্ষমতার ইশারায় একজনের নাম বাদ দেওয়া হয়। তিনি হলেন প্রকৌশলী মঈনুল, যিনি এই নাশকতায় বিপুল পরিমাণে অর্থ ব্যয় করেছেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকৌশলী মঈনুল বড় অংকের অর্থে উপদেষ্টাসহ ক্ষমতাবানদের ম্যানেজ করতে সক্ষম হন ইতিমধ্যে, যে কারণে মামলা থেকে বেঁচে যান।
শুনানিতে চিফ প্রসিকিউটর তিন আসামির সর্বোচ্চ সাজা চান। সেই সঙ্গে তাঁদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে জুলাই-আগস্টে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে বিতরণের নির্দেশনা চান। তিনজনের বিরুদ্ধে মোট ৮ হাজার ৭৪৭ পৃষ্ঠার অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে।
শুনানিতে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, গ্যাং অব ফোরের অন্যতম সদস্য ছিলেন এই মামলার আসামি তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। এই গ্যাংয়ের বাকি সদস্যরা হলেন সালমান এফ রহমান, ওবায়দুল কাদের ও আনিসুল হক। তাঁরা সরকারের কেবিনেটের বাইরে মিনি কেবিনেট তৈরি করেছিলেন। কোথায় আক্রমণ হবে, কাকে মারা হবে, কাকে ধরা হবে, তাঁরা এসব পরিকল্পনা করতেন। জুলাই-আগস্টে আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়ে যেসব অপরাধ করেছে, তাই দলটিকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে গণ্য করার শামিল বলে উল্লেখ করেন তিনি।
এদিকে, অভ্যুত্থানের পরও সওজে সক্রিয় আওয়ামী সিন্ডিকেট শক্তিশালীকরণ, নিজের পদায়ন নিয়ন্ত্রণ, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের অর্থপাচারে ভূমিকা রাখেন সড়ক ও জনপথ-সওজের প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ মঈনুল হাসান। ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলেও সড়কে নানা অনিয়মে সক্রিয় আওয়ামীপন্থী প্রকৌশলী সিন্ডিকেট। সরকারের অধিকাংশ দপ্তরে সংস্কার চললেও সড়ক বিভাগে পড়েনি এর ছিটেফোটা আঁচও। তিনস্তর বিশিষ্ট চক্রের আওয়ামী বলয়ে চলছে সীমাহীন অনিয়ম-দুর্নীতি। ৫ আগস্টের পর ৩০ জন কর্মকর্তাকে বিদেশ যাওয়ার অনুমতি দিয়ে পাচার করা হয় সাবেক মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ও তার পরিবারের কোটি কোটি টাকা, যারা গত সাড়ে পনের বছর সড়কে গড়ে তুলেছিল ‘কাদের চক্র’।
প্রকৌশলী মঈনুল কেন্দ্রীয় বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের সদস্য। আইইবি-২০২২-২৩এর নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের (সবুর-মঞ্জুর প্যানেল) শেখ হাসিনার মতই বিনাভোটে নির্বাচন করে নির্বাচিত হয়েছিলেন কাউন্সিল মেম্বার (আইইবি মেম্বার নং ১৪৫৫০)। শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনে গঠিত সড়ক কমিটির উপদেষ্ঠা পরিষদের সদস্য হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। বুয়েট ছাত্রলীগ নেতাও ছিলেন সওজের এই প্রধান প্রকৌশলী। কর্মকর্তাদের বহর নিয়ে বারবার মুজিবের মাজারে পুস্পত্ববক অর্পণ করে ব্যাপক সমালোচনায় পড়েন। তার পরিবারের অধিকাংশ সদস্যও ছিলেন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। অভিযোগ রয়েছে সড়ক নিয়ন্ত্রণের জন্যই মঈনুলের বিশেষ হস্তক্ষেপ আলোচিত মুনতাসীরের উত্থান হয়। মধ্যম সারির যেকোন কর্মকর্তার পদায়ন বা বদলিতে মঈনুলের ভাগ্নে মুনতাসিরের আর্শিবাদপুষ্ট হতে হতো। তাদের দৌরাত্বে ঢাকা সড়ক জোন পরিণত হয় ‘মামা-ভাগ্নে জোনে’। প্রধান প্রকৌশলী মঈনুলের তত্ত্বাবধানে ডিপ্লোমা সমিতির ব্যানারে চলতো লোক দেখানো দুস্থদের মাঝে খাদ্য ও ত্রাণসামগ্রী বিতরণের নামে দেশব্যাপী শেখ হাসিনা বন্দনা।
নিজের জন্য বরাদ্দকৃত সরকারি বাসভবনে কোনো প্রকার টেন্ডার ছাড়াই ঠিকাদার ও ঢাকা সড়ক বিভাগের সেসময়ের আওয়ামীপন্থি নির্বাহী প্রকৌশলী আহাদ উল্যার কাছ থেকে আড়াই কোটি টাকার আসবাবপত্র ও ইন্টেরিয়র কাজ করান তিনি। পুরস্কার হিসাবে নির্বাহী প্রকৌশলী আহাদ উল্যাহকে প্রধান প্রকৌশলী মঈনের একক হস্তক্ষেপে ২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর সুনামগঞ্জ সড়ক বিভাগে পদায়ন করা হয়। আর আহাদ উল্যাহ’র স্থানে স্থলাভিষিক্ত করা হয় রিতেশ বড়ুয়াকে। অথচ বিগত আওয়ামী সরকারের আমলে দীর্ঘদিন যাবত এই রিতেশ বড়ুয়া ছিলেন সাবেক প্রেসিডেন্ট আব্দুল হামিদের ছত্রছায়ায় কিশোরগঞ্জ সড়ক বিভাগে। তৎকালীন বিভিন্ন গণমাধ্যমে তার বিরুদ্ধে কিশোরগঞ্জের প্রায় সকল সেতুতেই লোহার পাতের পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহার করার প্রমাণসহ প্রতিবেদন এসেছিলো। সেতুতে লোহার পরির্বতে বাঁশ ব্যবহার করার প্রচলনের এ খবর দেশব্যাপী ব্যাপক চাঞ্চল্য ও সমালোচনার ঝড় উঠলেও সড়কের কথিত সজ্জন মঈনুল হাসানকে দেখা যায়নি তার বিরুদ্ধে কোনো প্রকার ব্যবস্থা নিতে। ২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের পর ট্রেনিং ও উচ্চশিক্ষার নামে বিভিন্ন মেয়াদে ৩০ কর্মকর্তার বিদেশ গমনের অনুমোদন ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। সড়ক সূত্রের তথ্যমতে, মূলত সরাসরি প্রধান প্রকৌশলী মঈনের তত্ত্বাবধানে এই ৩০ জন আওয়ামী সুবিধাভোগী কর্মকর্তার মাধ্যমেই শেখ পরিবার ও ওবায়দুল কাদেরের বিপুল অবৈধ অর্থ বিদেশে পাচার করা হয়। অর্থপাচারে সরাসরি যুক্ত ছিলেন মঈনুল হাসান।
শীর্ষনিউজ