রাজধানীতে আইন ভঙ্গ করে চলছে তামাকজাত পণ্যের প্রচার। দোকানে দোকানে সাঁটা হচ্ছে লিফলেট। সিগারেট কোম্পানিগুলো বিক্রেতাকে বাড়তি ‘সুবিধা’ দিয়ে এসব করলেও নির্বিকার প্রশাসন।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ফরিদুল ইসলাম জানান, ২০০৫ সালের ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইনে বলা আছে– প্রিন্ট বা ইলেকট্রনিক মিডিয়ায়, বাংলাদেশে প্রকাশিত কোনো বই, লিফলেট, হ্যান্ডবিল, পোস্টার, ছাপানো কাগজ, বিলবোর্ড বা সাইনবোর্ডে বা অন্য কোনোভাবে তামাকজাত দ্রব্যের বিজ্ঞাপন প্রচার করা যাবে না। বিক্রয়স্থলেও যেকোনো উপায়ে তামাকজাত দ্রব্যের বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ। আইন ভঙ্গকারী অনূর্ধ্ব তিন মাস বিনাশ্রম কারাদণ্ড, অনধিক এক লাখ টাকা কিংবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
রাজধানীর বসুন্ধরা সিটি শপিং কমপ্লেক্সের বিপরীতে বাবার সঙ্গে চায়ের দোকান চালান সাব্বির হোসেন। সিগারেট কোম্পানির বিজ্ঞাপনের বিষয়ে স্ট্রিমকে তিনি বলেন, ‘প্রথমে এসে আমাদের অফার দেন প্রতি তিন প্যাকেট সিগারেটে একটি টি-শার্ট পাবেন। খালি প্যাকেট রিটার্নে প্রতিটিতে পাবেন ৫-১০ টাকা। বিভিন্ন উপহার ছাড়াও কমিশন বাড়িয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।’
সিগারেটের বিজ্ঞাপন। স্ট্রিম ছবি
সাব্বিরের অকপট স্বীকার, এত সুবিধা পেলে কে না কাজ করে? নতুন সিগারেটের বিষয়ে ক্রেতাকে একটু বেশিই অনুরোধ করি। পরিচিতদের ফ্রি সিগারেট দিই। তারা স্বাদ নিয়ে প্রতিক্রিয়া দেন। পরে কোম্পানির লোকদের তা বলি। কমবেশি সব কোম্পানিই এই বিজ্ঞাপন করিয়ে নেয়। তবে এখন বিএটি, জেটিআই বেশি করছে।
বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন মধ্যাহ্নভোজের পরে কারওয়ানবাজারে নির্দিষ্ট একটি দোকান থেকে সিগারেট কেনেন। নতুন কোম্পানির সিগারেট ধরার পেছনে তিনি স্ট্রিমকে বলেন, একদিন নিচে নেমে দোকানের সামনে যেতেই ছেলেটি বলল– স্যার, নতুন ব্র্যান্ডের সিগারেট, একটি টেস্ট করেন। এমনভাবে বলল, আগ্রহ না থাকলেও নিয়ে ধরালাম। ভালোই, নতুনত্ব মনে হলো। এরপর থেকে সেই ব্র্যান্ডেই আটকে গেলাম।
আলমগীর হোসেন বলেন, একদিন কথা প্রসঙ্গে ছেলেটির কাছে জানতে চেয়েছিলাম– আমি তো পরিচিত ব্র্যান্ডের সিগারেটে অভ্যস্ত। তুমি কেন নতুনটি নিতে বললে? সে বলল, স্যার, কোম্পানির প্রতিনিধিরা আমাদের এই কৌশল শিখিয়েছেন। স্যাম্পল সিগারেট ভালো মানের দেন। সুযোগ-সুবিধাও বেশি।
কারওয়ানবাজারে দোকানি মিজানুর রহমান বলেন, আমার দোকানের সামনে যত সিগারেটের প্যাকেট দেখছেন, সবই কোম্পানির সাজিয়ে দেওয়া। সবে এসেছে রেড অ্যাডভান্স। বেশি বিক্রি করতে পারলে দারুণ সব পুরস্কার দিচ্ছেন।

বিশ্বজুড়ে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় কঠোর আইন থাকা সত্ত্বেও তামাকজাত পণ্য বিক্রির হার কমছে না। এর পেছনে প্রধান কারণ কোম্পানিগুলোর সুক্ষ্ম প্রচার। জনস্বাস্থ্যবিষয়ক আইনজীবী সৈয়দ মাহবুবুল আলম তাহিন স্ট্রিমকে জানান, সরকারি সংস্থার তদারকির অভাবে তামাক কোম্পানিগুলো কৌশলে বিজ্ঞাপন দিচ্ছে। এতে তরুণরা ধূমপানে আসক্ত হওয়ায় জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি বাড়ছে। রাজস্ব আদায়ের জন্য এনবিআর পর্যন্ত জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এড়িয়ে যাচ্ছে। সিগারেটের ওপর নতুন করে কর না বাড়াতে এনবিআর চেয়ারম্যানের পরিকল্পনায় তামাক নিয়ন্ত্রণ প্রচেষ্টা আরও বাধাগ্রস্ত হবে বলে জানান তিনি।
তামাকজাত পণ্য বিক্রি বাড়ার বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক রুমানা হক স্ট্রিমকে বলেন, ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন টোব্যাকো কন্ট্রোল অনুযায়ী– তামাকজাত পণ্যের প্রচার-প্রচারণা নিষিদ্ধ। কিন্তু কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে নানা কৌশলে প্রচার চালাচ্ছে। যেমন– দোকানে সাজিয়ে রাখা, পয়েন্ট অফ সেল ভেন্ডর, সাইনবোর্ড লাগানো, টি-শার্টসহ বিভিন্ন পণ্য উপহার। অনলাইনেও প্রচার চালাচ্ছে। নাটক-সিনেমায় তো অহরহ ধূমপান দৃশ্য। এতে তরুণরা বেশি আকৃষ্ট হচ্ছে। প্রচার বন্ধে সরকার ও সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার কঠোর অবস্থান দরকার।
তিনি আরও বলেন, তরুণ প্রজন্মকে টার্গেট করার জন্য ই-সিগারেট বা ভ্যাপিংকে এখন ‘নিরাপদ বিকল্প’ বলে প্রচার চলছে। কোনো অনুমোদন ছাড়াই এসব পণ্য বাজারে দেওয়া হচ্ছে। সামাজিক মাধ্যমেও ধূমপানকে গৌরবান্বিত করতে ইনফ্লুয়েন্সার বা মডেলদের ভিডিওতে ব্যবহার করা হচ্ছে। তরুণদের ক্ষতি করেও তামাক কোম্পানিগুলো বৃক্ষরোপণ, ত্রাণ বিতরণ বা উন্নয়নমূলক কাজের মাধ্যমে নিজেদের ‘মানবিক’ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। এসব বন্ধে স্বাস্থ্যসহ মন্ত্রণালয়গুলোর সমন্বয়ে শক্তিশালী টাস্কফোর্স গঠন এবং বিদ্যমান আইনের কঠোর প্রয়োগ জরুরি।
সম্প্রতি এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, আগামী বাজেটে সিগারেটের ওপর বিদ্যমান ৮৩ শতাংশ ভ্যাট, সম্পূরক শুল্ক ও স্বাস্থ্য উন্নয়ন সারচার্জ বাড়ানো হচ্ছে না। তবে মূল্য সমন্বয়ের মাধ্যমে সিগারেটের দাম বাড়ানো হতে পারে।
ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০০৫ (সংশোধিত ২০১৩ ও ২০১৫) এবং এ-সংক্রান্ত বিধিমালার অধীনে বাংলাদেশে কোম্পানিগুলো কঠোর নিয়ম মেনে চলতে বাধ্য। প্যাকেজিংয়ে স্বাস্থ্য সতর্কবার্তা, প্যাকেটের মূল উপরিভাগের ৫০ শতাংশ জুড়ে ছবিসহ স্বাস্থ্য সতর্কবার্তা দেওয়ার মতো নিয়ম তারা মানছে।
প্যাকেটের গায়ে লাইট, লোটার বা মাইল্ডের মতো বিভ্রান্তিকর শব্দ ব্যবহার করা যাবে না– এটি মেনে চললেও, কোনটি ‘লাইট’ বা ‘গোল্ড’ তা বোঝানোর জন্য প্রতীক ব্যবহার করছে। এছাড়া পাবলিক প্লেসে বা জনসমাগমস্থলে (অফিস, লাইব্রেরি, সিনেমা হল, পাবলিক পরিবহন) ধূমপান নিষিদ্ধ। কেউ ধূমপান করলে জরিমানার বিধান রয়েছে। কিন্তু আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার লোক থেকে, সাধারণ মানুষ– কেউই এটি মানছেন না।
এ ব্যাপারে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (যুগ্ম সচিব) মোহাম্মদ গোলাম আজম স্ট্রিমকে বলেন, ‘মাদক আইনে ধূমপান নিয়ে আমাদের কিছু করার নেই। ধূমপান মাদকের মধ্যে পড়েও না।’