Image description

আনুষ্ঠানিকভাবে দেশে শুরু হলো পঞ্চম প্রজন্মের মোবাইল নেটওয়ার্ক বা ৫-জি। বেসরকারি মোবাইল অপারেটর গ্রামীণফোন ও রবি এবং সরকারি মোবাইল অপারেটর টেলিটক বাণিজ্যিকভাবে ও পরীক্ষামূলকভাবে চালু করেছে এই সেবা। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে ডিজিটাল যোগাযোগের ক্ষেত্রে দেশের এক বিশাল মাইলফলক অর্জিত হলো।

৫-জি আসলে কী?

৫-জি হলো মোবাইল যোগাযোগের পঞ্চম প্রজন্মের প্রযুক্তি। এটি বর্তমান ৪-জি এলটিই নেটওয়ার্কের পরবর্তী ধাপ। এটি মূলত উচ্চ গতির ডেটা ট্রান্সফার, অত্যন্ত কম লেটেন্সি (দেরি কম হওয়া) এবং একসঙ্গে লাখ লাখ ডিভাইস সংযুক্ত করার জন্য ডিজাইন করা হয়েছে।

এটি কীভাবে কাজ করে?

এটি প্রধানত কয়েকটি প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে কাজ করে। যথা- এক. সাব-৬ গিগাহার্টজ ব্যান্ড : এটি ৬ গিগাহার্টজের নিচের ফ্রিকোয়েন্সি (যেমন ৩.৫ গিগাহার্টজ) ব্যবহার করে শহর ও গ্রামে দূরবর্তী অঞ্চলে ভালো কভারেজ দেয়।

দুই. মিলিমিটার ওয়েভ : ২৪ থেকে ৩০০ গিগাহার্টজের উচ্চ ফ্রিকোয়েন্সি ব্যবহার করে বিশাল পরিমাণ ডেটা আদান-প্রদান করতে পারে এটি।

তিন. ম্যাসিভ এমআইএমও : একাধিক অ্যানটেনা ব্যবহারের মাধ্যমে একই সময়ে অনেক ডিভাইসে দ্রুত গতিতে ডেটা পাঠানো সম্ভব হয় এর মাধ্যমে।

চার. নেটওয়ার্ক স্লাইসিং : একই নেটওয়ার্ককে ভার্চুয়ালি ভাগ করে গেমিং, ভিডিও বা অটোমেশনের জন্য আলাদা গতি ও সক্ষমতা নিশ্চিত করা যায়।

গতি ও কর্মক্ষমতা 
৪-জি বনাম ৫-জি প্রযুক্তিগত দিক থেকে ৫-জি নেটওয়ার্ক ৪-জির চেয়ে কয়েক গুণ বেশি গতিসম্পন্ন।

এর প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো 

ডাউনলোড স্পিড : ৫-জি নেটওয়ার্কে সর্বোচ্চ ডাউনলোড গতি প্রতি সেকেন্ডে ২০ গিগাবিট বা ২০ জিবিপিএস পর্যন্ত হতে পারে। এটি বর্তমান ৪-জি নেটওয়ার্কের (সর্বোচ্চ ১ জিবিপিএস) তুলনায় প্রায় ১০ থেকে ২০ গুণ বেশি দ্রুত।

বাস্তব ক্ষেত্রে গতি : বর্তমানে বাংলাদেশে অপারেটর ও এলাকাভেদে গ্রাহকরা গড়ে ১০০ থেকে ২২০ এমবিপিএস গতি পাবেন, যা ক্ষেত্রবিশেষে ৫৫০ থেকে ৬০০ এমবিপিএস বা তার চেয়েও বেশি (১ জিবিপিএস+) উঠতে পারে। যেখানে, ৪-জিতে সাধারণত মাত্র ১০ থেকে ৩০ এমবিপিএস গতি পাওয়া যায়।

আপলোড স্পিড : ৫-জিতে সর্বোচ্চ আপলোড স্পিড হতে পারে ১০ জিবিপিএস পর্যন্ত। ৪-জি নেটওয়ার্কের সর্বোচ্চ আপলোড গতি যেখানে মাত্র ১০০ এমবিপিএস, সেখানে ৫-জি অনেক কম সময়ে বড় ফাইল ইন্টারনেটে আপলোড করতে সাহায্য করবে।

লেটেন্সি (রেসপন্স টাইম) : ইন্টারনেটে কোনো কিছুতে ক্লিক করার পর সার্ভার থেকে সাড়া আসতে যে সময় লাগে, তাকে লেটেন্সি বলে। ৪-জি নেটওয়ার্কে এই সময় কিছুটা বেশি হলেও, ৫-জিতে লেটেন্সি কমে ১ থেকে ১০ মিলিসেকেন্ডের (১ সেকেন্ডের ১০০০ ভাগের ১ ভাগ) নিচে নেমে আসবে। এর ফলে ইন্টারনেট ব্যবহার করার সময় কোনো ‘ল্যাগ’ বা দেরি অনুভূত হবে না।

কানেক্টিভিটি বা সংযোগের ঘনত্ব (সক্ষমতা) : ৪-জি নেটওয়ার্কে একই সময়ে একই জায়গায় অনেক মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করলে গতি কমে যায়। কিন্তু ৫-জি নেটওয়ার্কের সক্ষমতা এতটাই বেশি যে এটি প্রতি বর্গকিলোমিটারে প্রায় ১০ লাখ ডিভাইসকে একসঙ্গে কোনো রকম গতি না কমিয়ে যুক্ত রাখতে পারে। এই গতি ও সক্ষমতার কারণে ৪-কে বা ৮-কে কোয়ালিটির বড় কোনো সিনেমা বা ফাইল ডাউনলোড করা যাবে মাত্র কয়েক সেকেন্ডে। একই সাথে এটি চালকবিহীন গাড়ি, রোবট এবং হাসপাতালের জটিল রিমোট সার্জারির (দূর থেকে অপারেশন) মতো কাজে সাড়া দেবে নিখুঁতভাবে।

অপারেটরদের প্রস্তুতি ও বর্তমান অবস্থা

১. টেলিটক ও হুয়াওয়ে অংশীদারত্ব টেলিটকের পরীক্ষামূলক ৫-জি চালুর পেছনে মূল কারিগরি সহযোগী হিসেবে কাজ করছে বিশ্বের শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান হুয়াওয়ে। হুয়াওয়ে বাংলাদেশের প্রধান কারিগরি কর্মকর্তা (সিটিও) কেভিন স্যু জানান, ২০০৯ সাল থেকে তারা ৫-জি গবেষণায় ৬০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছেন এবং এই প্রযুক্তির প্রায় ৪০ শতাংশ পেটেন্ট তাদের দখলে।

তরঙ্গের সীমাবদ্ধতা : আন্তর্জাতিক মানের ফাইভ-জি সেবার জন্য ১০০ মেগাহার্টজ ফ্রিকোয়েন্সি আদর্শ হলেও বাংলাদেশে বর্তমানে ৬০ মেগাহার্টজ দিয়ে কাজ শুরু হয়েছে। ফ্রিকোয়েন্সি বাড়লে গতি আরো বাড়বে ভবিষ্যতে।

২. দেশের শীর্ষ দুই অপারেটর গ্রামীণফোন ও রবি ইতিমধ্যেই দেশের প্রধান প্রধান শহরগুলোতে চালু করেছে বাণিজ্যিক সেবা।

গ্রামীণফোন : দেশের ৮টি বিভাগীয় শহরে একযোগে ৫-জি সেবা চালু করেছে। পরীক্ষাগারে ৫৫১ এমবিপিএস পর্যন্ত ডাউনলোড স্পিড পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

রবি : ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটের ৭টি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় (যেমন মগবাজার, তেজগাঁও, খুলশী) সেবা চালু করেছে। রবি তাদের নেটওয়ার্কে সর্বোচ্চ ৬২২ এমবিপিএস পর্যন্ত গতি রেকর্ড করেছে এবং আগামী নভেম্বরের মধ্যে ২০০টিরও বেশি সাইটে এই সেবা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নিয়েছে।

খরচ বাড়ছে না : সাধারণ গ্রাহকদের জন্য সবচেয়ে বড় স্বস্তির খবর হলো, ৫-জি ব্যবহারের জন্য বাড়তি কোনো টাকা দিতে হবে না। ৪-জির সাধারণ প্যাকেজ বা ইন্টারনেটের দামেই উপভোগ করা যাবে এই সুপার-ফাস্ট গতি।

৫-জি সেবা পাওয়ার শর্তাবলী 

১. গ্রাহককে অবশ্যই ৫-জি কভারেজ বা নেটওয়ার্ক এলাকার ভেতরে থাকতে হবে।

২. অবশ্যই ৫-জি সমর্থিত হতে হবে গ্রাহকের মোবাইল হ্যান্ডসেটটি। তবে মনে রাখতে হবে, ইন্টারনেটের গতি অনেক বেশি হওয়ায় আগের চেয়ে দ্রুত শেষ হতে পারে ডেটা বা এমবি।