চিকিৎসক বলেছিলেন, ২ মিনিটের জন্যও অক্সিজেন মাস্ক খোলা যাবে না সাত মাসের শিশুটির। অথচ সেই শিশুটিকেই মাস্ক ছাড়া ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের মধ্যে ঘোরানো হয়েছে অন্তত আধা ঘণ্টা। এরপর সেখানে সিট না থাকার কারণ দেখিয়ে বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়ার জন্য তোলা হয়েছে অ্যাম্বুলেন্সে। আর ততক্ষণে না ফেরার দেশে চলে গেছে মা-বাবার একমাত্র সন্তান হাসিব আহমেদ মিনহাজ।
মিনহাজকে অক্সিজেন মাস্ক ছাড়া রাখার দায় যার, তিনি ঢামেক হাসপাতালের কর্মচারী। শুরুতে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করলেও শেষ পর্যন্ত লিখিত কোনো অভিযোগ দেননি শিশুটির মা-বাবা। ফলে পুলিশও অভিযুক্ত এনায়েত করিমের (৪০) বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছে না।
ঘটনার বিস্তারিত জানতে হলে আমাদের একটু পেছনে যেতে হবে। রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার পার্বতীপুর গ্রামের হেলাল মিয়া আর মেঘলা খাতুনের সন্তান মিনহাজ। হেলাল আর মেঘলা— দুজনই কাজের সুবাদে থাকেন গাজীপুরের বাসন এলাকায়। একজন কাজ করেন সোনার দোকানে, অন্যজন পোশাক কারখানায়। তবে মা-বাবা চাকরি করায় মিনহাজ থাকত রংপুরে নানির সঙ্গে।
কথা হচ্ছিল হেলাল মিয়ার সঙ্গে। তিনি জানালেন, কিছু দিন আগে মিনহাজের ডায়রিয়া হয়। তখন তাকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানা যায় তার কিডনির সমস্যা। সেখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য আনা হয় ঢাকায়। শুরুতে শনির আখড়ার একটি হাসপাতালে নেওয়া হয় মিনহাজকে। সেখানে তার অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে অক্সিজেন মাস্ক পরানো হয়। চিকিৎসক বারবার সাবধান করে দেন, ২ মিনিটের জন্যও যেন মাস্কটি খোলা না হয়। এরপর তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য পাঠিয়ে দেওয়া হয় ঢাকার আগারগাঁওয়ের শিশু হাসপাতালে। সেখানে মেলেনি সিট। পরে এক দালালের মাধ্যমে ধানমন্ডির একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয় মিনহাজকে। কিন্তু তার কিডনির সমস্যার কথা শুনে সেই বেসরকারি হাসপাতালটিও তাকে ভর্তি করেনি। পাঠিয়ে দেয় শ্যামলীর ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজিতে। অবশ্য সেখানেও ঠাঁই হয়নি তার।
নানা ঘাট ঘুরে গত মঙ্গলবার (১২ মে) ঢামেক হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যান মিনহাজকে। বাবা হেলাল মিয়া বললেন, ‘জরুরি বিভাগের মেডিকেল অফিসার আমাদের পাশেই শিশু ডাক্তারের কাছে পাঠান। তবে শিশু ওয়ার্ডে সরাসরি ভর্তি না করে চিকিৎসকরা বলেছেন, ওয়ার্ডে গিয়ে খোঁজ নিয়ে আসতে— কোনো বেড খালি আছে কি না।’
আর তখনই হাসপাতালের কর্মচারী এনায়েতের সঙ্গে দেখা হয় তাদের। এনায়েত নিজেই তাদের সঙ্গে নিয়ে শিশু ওয়ার্ড ঘুরে এসে চিকিৎসককে জানিয়েছেন, বেড খালি নেই। এরপর মিনহাজের মা-বাবাকে কাঁটাবন এলাকার হোম কেয়ার নামের একটি হাসপাতালের কথা বলেন এবং জানান, সেখানে ভর্তি করা যাবে। তবে প্রতিদিন ২৫ হাজার টাকা খরচ হবে। সন্তানের কথা ভেবে রাজি হন মা-বাবা।
হেলাল মিয়া অভিযোগ করে বললেন, ২ মিনিটের জন্যও যে অক্সিজেন মাস্ক খোলা যাবে না, চিকিৎসকের এই সাবধানবাণী এনায়েতকে জানানোও হয়। কিন্তু এরপরও তিনি একটি অ্যাম্বুলেন্সে তুলে দেওয়ার কথা বলে মাস্ক খুলে মিনহাজকে নিয়ে ঢামেক হাসপাতালের ভেতর প্রায় আধা ঘণ্টা ঘোরাঘুরি করেন। এরপর হাসপাতালের দুই নম্বর ভবনের গেট দিয়ে একটি অ্যাম্বুলেন্সে তুলে দেন।
অ্যাম্বুলেন্সে ওঠার সময়ই পরিবারের সদস্যরা বুঝতে পারেন, মিনহাজ আর বেঁচে নেই। মা কাঁদতে শুরু করলে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করেন এনায়েত। সঙ্গে সঙ্গে তাকে ধরে ফেলেন পরিবারের সদস্যরা, তুলে দেন হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যদের হাতে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শিশুমৃত্যুর ঘটনায় এক ব্যক্তিকে পুলিশ ফাঁড়িতে আটকে রাখা হয়েছে বলে খবর যায় শাহবাগ থানায়। খবর পেয়ে সেখানে যান শাহবাগ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মন্মথ হালদারসহ অন্যরা।
আগামীর সময়কে মন্মথ বললেন, ‘ঢামেক হাসপাতালে এনায়েত নামের এক সরকারি কর্মচারীকে আটক অবস্থায় পাই। জানতে পারি, এক শিশু রোগীকে ফুসলিয়ে বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়ার পথে সে মারা গেছে। মৃত শিশুটির পরিবার ঘটনার পরপর হাসপাতালের পুলিশ ক্যাম্পের সামনে ব্যাপক অভিযোগ করে। কিন্তু এর কিছুক্ষণ পরই লিখিত অভিযোগের কথা বলা হলে তারা কোনো অভিযোগ করতে রাজি হননি।’
উল্টো শিশুটির পরিবারের পক্ষ থেকে একটি লিখিত বিবৃতি দেওয়া হয়। যেখানে বলা হয়, ‘শিশুর মৃত্যুর ব্যাপারে আমাদের কোনো অভিযোগ নেই।’ এ কারণে আটক কর্মচারী এনায়েতকে ছেড়ে দেয় পুলিশ।
কথা হয় মিনহাজের মামা মো. রিপনের সঙ্গে। তিনি আগামীর সময়কে বলছিলেন, ‘আমরা গ্রাম থেকে ঢাকায় আসছি। যে যেভাবে বলছে সেভাবেই কাজ করছি। তা-ও যদি আমার ভাগনে বেঁচে থাকত, মনকে সান্ত্বনা দিতাম। আমাদের সাত মাস বয়সী মিনহাজকে একপ্রকার হত্যা করা হয়েছে। আমরা এর কঠিন শাস্তি দাবি করি।’
‘সরকারের কাছে আমাদের আবেদন, এভাবে আর যেন কোনো মায়ের কোল খালি না হয়,’ যোগ করলেন রিপন।
কেন লিখিত অভিযোগ দেওয়া হলো না, তা জানতে চাওয়া হলে রিপন কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
তবে সেসময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন এমন সংবাদকর্মী ও হাসপাতালের কয়েকজন কর্মচারীর সঙ্গে কথা বলেছে আগামীর সময়। তারা বললেন, শিশুটির মৃত্যুর পর তার পরিবারের সদস্যদের নানাভাবে ভয় দেখানো হয়েছে। এনায়েত যেহেতু হাসপাতালের সরকারি কর্মচারী, তাই তার পক্ষে অনেকে হাজির হয়েছিলেন। তাদের মধ্যে কয়েকজন শিশুর মা-বাবাকে ময়নাতদন্তের ভয় দেখান। তারা বলেন, পুলিশে অভিযোগ করলে মরদেহ কাটাছেঁড়া করবে। এখন মরদেহ বুঝিয়েও দেবে না। উল্টো থানা-পুলিশ করতে হবে।
এসব শুনে ভয় পেয়ে যান মিনহাজের মা-বাবা। আর তখনই কোনো অভিযোগ নেই জানিয়ে লিখিত বিবৃতি দেন তারা। এরপর দ্রুত শিশুটিকে নিয়ে হাসপাতাল এলাকা ছাড়েন।