Image description

মাদক কারবার এখন আর সীমান্ত বা গোপনে সীমাবদ্ধ নেই। প্রযুক্তির গোপন জগৎ ‘ডার্ক ওয়েব’ ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক চক্রগুলো সহজেই ভয়ংকর মাদক দেশে প্রবেশ করাচ্ছে। কুরিয়ার সার্ভিস, ক্রিপ্টোকারেন্সি ও এনক্রিপ্টেড যোগাযোগ ব্যবস্থাকে কাজে লাগিয়ে গড়ে উঠছে নতুন ধরনের সিনথেটিক মাদক নেটওয়ার্ক। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে এই চক্র দেশের তরুণ সমাজকে ঝুঁকির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

কেটামিন, এলএসডি ও ডিওবির মতো উচ্চমাত্রার সিনথেটিক মাদক এখন প্রযুক্তির আড়ালে আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বাংলাদেশে এসেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়িয়ে কুরিয়ার সার্ভিস ও এনক্রিপ্টেড যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে এসব মাদক দেশে আনা হচ্ছে বলে জানিয়েছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)।

সাম্প্রতিক একটি অভিযান এবং গ্রেপ্তারের প্রসঙ্গ তুলে ধরে ডিএনসির মহাপরিচালক হাসান মারুফ দেশ রূপান্তরকে বলেন, গ্রেপ্তারকৃতরা ডার্ক ওয়েব ব্যবহার করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে মাদকের অর্ডার নিত এবং একই মাধ্যমে সংগ্রহ করত। অর্থ লেনদেন হতো ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে, বিশেষ করে ‘টর নেটওয়ার্ক’ ব্যবহার করে। তিনি আরও বলেন, আসামিরা এনক্রিপ্টেড যোগাযোগ মাধ্যম, ভুয়া পরিচয়পত্র, ঘন ঘন মোবাইল ও সিম পরিবর্তন এবং নিয়মিত ডিজিটাল তথ্য মুছে ফেলার মতো কৌশল ব্যবহার করায় তদন্ত কার্যক্রম জটিল হয়ে পড়ে। তবে তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর বিশ্লেষণ ও ধারাবাহিক গোয়েন্দা তৎপরতায় ধীরে ধীরে এই নেটওয়ার্কের কার্যক্রম উন্মোচিত হচ্ছে।

ডার্ক ওয়েব হলো ইন্টারনেটের এমন একটি লুকায়িত অংশ, যা সাধারণ সার্চ ইঞ্জিন বা ব্রাউজার দিয়ে খুঁজে পাওয়া যায় না। এটি ব্যবহারের জন্য বিশেষ ব্রাউজার টর এবং প্রোটোকলের প্রয়োজন হয়। চরম গোপনীয়তা ও এনক্রিপশনের কারণে এখানে অবৈধ কেনা-বেচা, হ্যাকিং এগুলো হতে থাকে। নিষিদ্ধ মাদকের কারবারি, কম্পিউটার হ্যাকার, এমনকি ভাড়াটে গু-ারাও সেখানে তাদের কাজের বিজ্ঞাপন দেন, যা আইনের আড়ালে থেকে। এ বিষয়ে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমাদের সাইবার মনিটরিং টিম সব সময় কাজ করে যাচ্ছে। যখনই এই ধরনের অসঙ্গতি বা অন্যায় দেখতে পারছি তখনোই তথ্যপ্রযক্তির সহায়তা নিয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করছি। এই ওয়েবসাইটগুলো নজরদারিতে আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, এই সাইটগুলো নিয়ে তালিকাসহ আমাদের কাজ চলছে।

ডিএনসির তথ্য অনুযায়ী, গত ২৫ মার্চ ঢাকার একটি আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সার্ভিসের কার্যালয়ে সন্দেহজনক একটি পার্সেল জব্দ করা হয়। পরে তল্লাশিতে ব্লুটুথ সাউন্ড স্পিকারের ভেতরে বিশেষ কৌশলে লুকানো ৫০ গ্রাম কেটামিন উদ্ধার করা হয়। পার্সেলের তথ্য বিশ্লেষণ ও প্রযুক্তিগত অনুসন্ধানের মাধ্যমে উত্তরা এলাকায় একটি সংঘবদ্ধ চক্রের সন্ধান পাওয়া যায়। পরে অভিযান চালিয়ে তিন চীনা নাগরিককে আটক করে ডিএনসি।

অভিযানে একটি আবাসিক ফ্ল্যাটে স্থাপিত অস্থায়ী ল্যাব থেকে বিপুল পরিমাণ কেটামিন, রাসায়নিক দ্রব্য, ডিজিটাল স্কেল, প্যাকেটজাত যন্ত্রপাতি, মোবাইল ফোন এবং দেশি-বিদেশি মুদ্রা উদ্ধার করা হয়। তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানান, চক্রটি তরল কেটামিন সংগ্রহ করে সেটিকে পাউডারে রূপান্তর করত এবং পরে বিভিন্ন ইলেকট্রনিক পণ্যের ভেতরে লুকিয়ে বিদেশে পাচারের চেষ্টা চালাত।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) সহকারী পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব, জনসংযোগ শাখা) মো. আবদুল হালিম রাজ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ডার্ক ওয়েবভিত্তিক মাদক কারবার শনাক্তে এখন পর্যাপ্ত কারিগরি সক্ষমতা তৈরি হয়নি। ফলে গত পাঁচ বছরে মাত্র তিনটি বড় চক্রকে শনাক্ত করতে পেরেছে ডিএনসি। তবে সাম্প্রতিক অভিযানে রাজধানীর উত্তরায় একটি ফ্ল্যাটে গড়ে তোলা অস্থায়ী ল্যাব থেকে ৬ কেজি ৩০০ গ্রাম কেটামিন জব্দের ঘটনায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

ডিএনসি সূত্র জানায়, ২০২১ সাল থেকে এ পর্যন্ত কেটামিন, এলএসডি ও ডিওবির অন্তত তিনটি বড় চালান জব্দ করা হয়েছে। ২০২২ সালের জুলাইয়ে রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা থেকে এলএসডিসহ এক যুবককে গ্রেপ্তার করা হয়। তদন্তে জানা যায়, তিনি ডার্ক ওয়েবে অর্ডার দিয়ে বিদেশ থেকে মাদক আনতেন এবং ক্রিপ্টোকারেন্সিতে মূল্য পরিশোধ করতেন। এরও আগে ২০২১ সালে খুলনায় ডিওবি ও এলএসডির চালানসহ দুই যুবককে আটক করা হয়। তদন্তে উঠে আসে, পোল্যান্ড থেকে ডার্ক ওয়েবের মাধ্যমে মাদক আনা হয়েছিল এবং অর্থ পরিশোধ করা হয়েছিল বিটকয়েনের মাধ্যমে।

মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (মাভাবিপ্রবি) লাইফ সায়েন্স অনুষদের ডিন প্রফেসর ড. মুহাম্মদ উমর ফারুক দেশ রূপান্তরকে বলেন, আইসিটি মন্ত্রণালয়ে আবেদন করে এইসব ডার্ক ওয়েব পরিচালনা বন্ধ করতে হবে। এই গোপনীয় ওয়েব যারা ব্যবহার করছেন তাদের নজরদারিতে আনা জরুরি।

ডিএনসি ঢাকা বিভাগীয় গোয়েন্দা কার্যালয়ের উপপরিচালক মেহেদী হাসান বলেন, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সন্দেহজনক ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেন অনুসন্ধান করতে গিয়েই মাদকচক্রের সন্ধান পাওয়া যায়। পরে তদন্তে নিশ্চিত হওয়া যায়, চক্রটি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মাদক সরবরাহ ও পাচারের সঙ্গে জড়িত।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, প্রযুক্তিনির্ভর মাদকচক্র শনাক্তে দেশের সংস্থাগুলোর কারিগরি দক্ষতা এখনো সীমিত। এ জন্য আধুনিক ফরেনসিক ল্যাব ও দক্ষ জনবল অত্যন্ত জরুরি।

গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে তরুণদের মধ্যে মাদকাসক্তি উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। প্রায় ৩৩ শতাংশ ব্যবহারকারী ৮ থেকে ১৭ বছর বয়সে প্রথম মাদক গ্রহণ করে। আর ৫৯ শতাংশ তরুণ ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সে প্রথমবার মাদকের সংস্পর্শে আসে। সবচেয়ে বেশি মাদক ব্যবহারকারী রয়েছে ঢাকা বিভাগে, আর সবচেয়ে কম বরিশাল বিভাগে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বেকারত্ব, বন্ধুমহলের প্রভাব, পারিবারিক অস্থিরতা ও মানসিক চাপ তরুণদের মাদকের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। একইসঙ্গে প্রযুক্তির অপব্যবহার ও ক্রিপ্টোকারেন্সির গোপন লেনদেন মাদক কারবারকে আরও জটিল ও বিপজ্জনক করে তুলছে।