আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য রেকর্ড তিন লাখ কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) প্রাথমিকভাবে চূড়ান্ত করেছে পরিকল্পনা কমিশন। প্রস্তাবিত এডিপিতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবহন ও বিদ্যুৎ খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হলেও বড় অংশজুড়ে রয়েছে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিশেষ উন্নয়ন সহায়তা খাতে থোক বরাদ্দ। বিশেষ করে বাস্তবায়নে দুর্বল শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে অস্বাভাবিক থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
শনিবার (৯ মে) অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে পরিকল্পনা কমিশনের এক বর্ধিত সভায় এই উন্নয়ন বাজেট অনুমোদন দেওয়া হয়। তবে খাতভিত্তিক বরাদ্দ চূড়ান্ত করার আগে আগামী ১৬ মে কমিশনের আরেকটি বর্ধিত সভা আহ্বান করা হয়েছে। ওই সভার সুপারিশের ভিত্তিতে প্রস্তাবিত এই উন্নয়ন বাজেট আগামী ১৮ মে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সভায় চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে। ওই সভায় সভাপতিত্ব করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
পরিকল্পনা কমিশনের কার্যক্রম বিভাগের প্রস্তুত করা কার্যপত্র অনুযায়ী, আগামী অর্থবছরের এডিপির মোট আকার ধরা হয়েছে ৩ লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন বা জিওবি অংশ ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা। এ ছাড়া স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা ও করপোরেশনের নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়িত প্রকল্পের জন্য আরও ৮ হাজার ৯২৪ কোটি টাকা যুক্ত হলে মোট উন্নয়ন ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়াবে ৩ লাখ ৮ হাজার ৯২৪ কোটি টাকার বেশি।
বর্ধিত সভার কার্যপত্র অনুযায়ী, আগামী অর্থবছরের এডিপিতে মোট ১ হাজার ১২১টি প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে বিনিয়োগ প্রকল্প ৯৪৯টি, কারিগরি সহায়তা প্রকল্প ১০৭টি ও স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার নিজস্ব অর্থায়নে ৪৩টি প্রকল্প রয়েছে। এ ছাড়া ১ হাজার ২৭৭টি নতুন অননুমোদিত প্রকল্পও তালিকাভুক্ত করা হয়েছে, যেগুলো ধাপে ধাপে অনুমোদনের জন্য বিবেচনা করা হবে। একই সঙ্গে ২২৩টি প্রকল্প আগামী জুনের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এনইসি থেকে এসব প্রকল্প নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করার কঠোর নির্দেশনা দেওয়ারও সুপারিশ করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত এডিপির সবচেয়ে আলোচিত দিক হচ্ছে থোক বরাদ্দের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিশেষ উন্নয়ন সহায়তা এবং সামাজিক উন্নয়ন সহায়তা মিলিয়ে প্রায় ১ লাখ ১৮ হাজার ২৮৮ কোটি টাকা থোক বরাদ্দ হিসেবে রাখা হয়েছে। অন্যদিকে সরাসরি প্রকল্পভিত্তিক বরাদ্দ রাখা হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৮১ হাজার ৭১১ কোটি টাকা। অর্থাৎ মোট উন্নয়ন বাজেটের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি অংশ এখনও নির্দিষ্ট প্রকল্পের বাইরে রয়েছে।
৩ লাখ কোটি টাকার এডিপি চূড়ান্ত, থোক বরাদ্দের ছড়াছড়ি
পরিকল্পনা কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, বিশেষ প্রয়োজনে উন্নয়ন সহায়তা খাতে রাখা হয়েছে ৩৮ হাজার ২৭ কোটি টাকা এবং সামাজিক উন্নয়ন সহায়তা খাতে আরও ১৭ হাজার কোটি টাকা। এ ছাড়া বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের আওতায় ৫৯ হাজার ২৯৬ কোটি টাকা ও উন্নয়ন সহায়তা খাতে ৩ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকা রাখা হয়েছে, যা অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি।
আর বিপুল অংকের এই থোক বরাদ্দ রাখা হচ্ছে প্রকল্প বাস্তবায়নে সবচেয়ে দুর্বল খাত ও প্রতিষ্ঠানগুলোতেই। স্বাস্থ্যশিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগ, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ কয়েকটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের প্রস্তাবিত বরাদ্দের প্রায় ৮০ শতাংশই থোক বরাদ্দ হিসেবে রাখা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, অনেক মন্ত্রণালয় ও বিভাগ তাদের প্রকল্পভিত্তিক বরাদ্দই পুরোপুরি ব্যবহার করতে পারে না। ফলে থোক বরাদ্দও অব্যবহৃত থেকে যেতে পারে এবং এটি কেবল এডিপির আকার বাড়ানোর কৌশল হয়ে দাঁড়াতে পারে।
প্রকল্প বাস্তবায়নে দুর্বল খাত হিসেবে পরিচিত স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে মোট ২৬ হাজার ৮০৮ কোটি টাকার বরাদ্দের মধ্যে ২০ হাজার ৮০০ কোটি টাকাই রাখা হয়েছে থোক বরাদ্দ হিসেবে, যা মোট বরাদ্দের প্রায় ৭৮ শতাংশ। স্বাস্থ্যশিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগে থোক বরাদ্দের ওপর নির্ভরশীলতা সবচেয়ে বেশি। এ বিভাগের জন্য এডিপিতে বরাদ্দ রয়েছে ৮ হাজার ৪৪৪ কোটি টাকা। এরমধ্যে ৬ হাজার ৮০০ কোটি টাকা রাখা হয়েছে থোক হিসেবে। অর্থাৎ মোট বরাদ্দের ৮০ শতাংশের বেশি থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে। অথচ চলতি অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতের এই দুই বিভাগ কয়েক হাজার কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়নেই হিমশিম খাচ্ছে, ৯ মাসে তাদের জন্য বরাদ্দের পাঁচ ভাগের এক ভাগ বাস্তবায়ন করতে পেরেছে।
দেশের আরেক অদক্ষ খাত শিক্ষায় শুধু থোক বরাদ্দই থাকছে সাড়ে ৩১ হাজার কোটি টাকা। এর বাইরে এ খাতের অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর জন্য এডিপি বরাদ্দ রাখা হচ্ছে ১৭ হাজার ৪২৬ কোটি টাকা। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্য প্রস্তাবিত ২১ হাজার ৩৪৮ কোটি টাকার মধ্যে ১৬ হাজার ২৯৯ কোটি টাকা থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে। একইভাবে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগে ২০ হাজার ৮৩৫ কোটি টাকার মধ্যে থোক বরাদ্দ রয়েছে ১১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের জন্য এডিপিতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৬ হাজার ১২২ কোটি টাকা, এরমধ্যে থোক হিসেবে রাখা হয়েছে ৩ হাজার ৭৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ অর্ধেকেরও বেশি বরাদ্দই থোক।
খাতভিত্তিক বরাদ্দ বিশ্লেষণে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ পাচ্ছে পরিবহন ও যোগাযোগ খাত। এ খাতে মোট বরাদ্দ ধরা হয়েছে ৫০ হাজার ৯২ কোটি টাকা, যা মোট এডিপির ১৬ দশমিক ৭০ শতাংশ। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বরাদ্দ শিক্ষা খাতে ৪৭ হাজার ৫৯১ কোটি টাকা বা ১৫ দশমিক ৮৬ শতাংশ। স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩৫ হাজার ৫৩৫ কোটি টাকা। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বরাদ্দ ৩২ হাজার ৬৯১ কোটি টাকা এবং গৃহায়ন ও কমিউনিটি সুবিধা খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২০ হাজার ৩৬১ কোটি টাকা।
মন্ত্রণালয়ভিত্তিক বরাদ্দে সবচেয়ে বেশি পাচ্ছে স্থানীয় সরকার বিভাগ ৩৩ হাজার ৭৩৫ কোটি টাকা। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ, যার বরাদ্দ ৩০ হাজার ৭৪১ কোটি টাকা। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং বিদ্যুৎ বিভাগও বড় বরাদ্দ পাচ্ছে।
স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতকে সামনে রেখেই এবারের উন্নয়ন বাজেট সাজানো হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির মাধ্যমে সরকার মূলত মানবসম্পদ উন্নয়ন, দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং সামাজিক নিরাপত্তা জোরদারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। এর মাধ্যমে নির্বাচনি অঙ্গীকার বাস্তবায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি, জলবায়ু সহনশীল উন্নয়ন এবং সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতেই বড় আকারের এডিপি নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে গ্রিন ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্ট ডেভেলপমেন্ট (জিসিআরডি), জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা (এনএপি), এসডিজি এবং ডেল্টা প্লানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রকল্প বাছাইয়ের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
তবে প্রশ্ন উঠেছে বাস্তবায়ন সক্ষমতা নিয়ে। পরিকল্পনা কমিশনের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) সূত্রে জানা গেছে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত ৯ মাসে এডিপি বাস্তবায়ন হার দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩৬ দশমিক ১৯ শতাংশ। সরকারি অর্থায়নে বাস্তবায়ন হার ৩৩ শতাংশের সামান্য বেশি এবং বৈদেশিক ঋণ ও অনুদানের ব্যবহার হয়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ। অথচ এই বাস্তবতায় আগামী অর্থবছরে আরও বড় উন্নয়ন বাজেট নেওয়া হচ্ছে।
পরিকল্পনা বিভাগের সাবেক সচিব মামুন আল রশিদ বলেন, এডিপি প্রণয়নে একটি স্পষ্ট স্ববিরোধিতা দেখা যাচ্ছে। একদিকে চলতি অর্থবছরে সংশোধিত এডিপি কমিয়ে ২ লাখ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়েছে, অন্যদিকে আগামী অর্থবছরের জন্য প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকার বিশাল উন্নয়ন বাজেট প্রস্তাব করা হয়েছে।
তিনি বলেন, বাস্তব অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, বড় বাজেটের বড় অংশই বাস্তবায়ন করা যায় না। একই প্রশাসনিক সক্ষমতা ও জনবল দিয়ে এত বড় বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন হবে।
মামুন আল রশিদ বলেন, থোক বরাদ্দ রাখা কোনো ভালো চর্চা নয়। কারণ এসব অর্থ নির্দিষ্ট প্রকল্পভিত্তিক না হওয়ায় পরে বিভিন্ন অপ্রয়োজনীয় খাতে ব্যয়ের প্রবণতা তৈরি হয়। এতে আর্থিক শৃঙ্খলা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।