পাবনার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতি ও লুটপাটের তথ্য পেয়েছে মহা হিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের (সিএজি) কার্যালয়। এই লুটপাটে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিয়ে অতিরিক্ত যে টাকা নেওয়া হয়েছে, সেগুলো আদায় করা আবশ্যক বলে অভিমত দেওয়া হয়েছে সিএজির প্রতিবেদনে।
সিএজির তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রূপপুর প্রকল্পে ২০টি ভবন তৈরিতে নানা অনিয়মের মাধ্যমে লুটপাট করা হয়েছে প্রায় ২৯৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে এই প্রকল্পে ৪ হাজার ৭০২টি বালিশের প্রকৃত মূল ছিল ১ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। অথচ কেনা হয়েছিল প্রায় ৫ কোটি ৪১ লাখ টাকায়। অতিরিক্ত দামে বালিশ কিনতে গিয়ে সরকারের আর্থিক ক্ষতি করা হয়েছে ৩ কোটি ৯২ লাখ টাকা।
সিএজি সূত্র জানিয়েছে, এ প্রকল্পে বালিশ কেনা হয়েছিল মোট ৪ হাজার ৭০২টি। যার মধ্যে সর্বোচ্চ ৮৯ হাজার ৯০০ টাকা দরে কেনা হয়েছিল ৬০টি বালিশ। এছাড়া ২৯ হাজার ৮৪৭ টাকা দরে বালিশ কেনা হয়েছিল ৭২টি। ২০ হাজার টাকা করে বালিশ কেনা হয়েছিল ৬৬০টি। আর ১০ হাজার টাকা দরে বালিশ কেনা হয় ১২০টি।
এর আগে ২০১৯ সালে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের আবাসন ভবন ‘গ্রিন সিটি’ নির্মাণকাজে বিভিন্ন সামগ্রী কেনাকাটায় অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়টি আবার নতুন করে আলোচনায় এসেছে। গত বুধবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে পেশ করা সরকারি বিভিন্ন দপ্তর ও সংস্থার ৩৮টি প্রতিবেদনের মধ্যে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সেই আলোচিত ‘বালিশ-কাণ্ডের’ দুর্নীতির প্রতিবেদন রয়েছে।
২০১৯ সালেই রূপপুরে কেনাকাটায় অনিয়মের খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। তখন খবরে বলা হয়, ৫ হাজার ৯৫৭ টাকা দিয়ে প্রতিটি বালিশ কেনা হয়। এই খবর তখন ব্যাপক আলোচনা তৈরি করে। বাস্তবে বালিশ কেনা হয়েছিল আরও বেশি দামে, যা সিএজির কার্যালয়ের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী গতকাল সাংবাদিকদের বলছিলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী প্রতিবেদনে প্রতিটি বালিশের এ রকম অবিশ্বাস্য দাম শুনে সিএজিকে বলেছেন, এই দামি বালিশের একটি জাদুঘরে রাখা উচিত।’
সিএজির তদন্ত প্রতিবেদনে দেখা যায়, প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বালিশ, কাভার, মালামাল ওঠানামা এবং বিভিন্ন ফ্লোরে পৌঁছানোসহ প্রতিটি বালিশের জন্য ব্যয় প্রস্তাব করেছিলেন ৯ হাজার ৩০৭ টাকা। যার প্রকৃত বাজারমূল্য ও খরচ ছিল ৩ হাজার ১৫৪ টাকা। অর্থাৎ প্রতিটি বালিশের জন্য ৬ হাজার ১৫৩ টাকা বেশি ধরা হয়েছিল। পরে এই বালিশ কেনায় আরও বড় অনিয়মের ঘটনা ঘটে।
ঠিকাদারকে সুবিধা দিতেই যোগসাজশ করে অতিরিক্ত দামে বালিশ কেনা হয়েছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, নিরীক্ষার সময় এসব বিষয়ে জবাব চাওয়া হলে কোনো উত্তর দেননি সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা। সাজিন কনস্ট্রাকশন লিমিটেড ও মজিদ সন্স কনস্ট্রাকশন লিমিটেড নামের দুটি প্রতিষ্ঠান বালিশসহ বিভিন্ন আসবাব অতিরিক্ত দামে কেনাকাটা করে হাতিয়ে নেয়।
এই টাকা লুটপাটে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিয়ে অতিরিক্ত যে টাকা নেওয়া হয়েছে, সেগুলো আদায় করা আবশ্যক বলে অভিমত দেওয়া হয়েছে সিএজির প্রতিবেদনে।