Image description

টেকসই জ্বালানির উন্নয়নে বিশ্ব যখন দ্রুত ঝুঁকছে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে, তখন বাংলাদেশ হাঁটছে উল্টো পথে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির বদলে বাংলাদেশে বাড়ছে জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভরতা, আকাশছোঁয়া হচ্ছে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়।

এরই মধ্যে ডলার সংকট, ক্যাপাসিটি পেমেন্ট ও এলএনজি আমদানির চাপ দেশের বিদ্যুৎ খাতকে ঠেলে দিচ্ছে গভীর আর্থিক ঝুঁকির দিকে। যার ভার শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ছে ভোক্তার ওপরই।

আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) এক প্রতিবেদন বলছে, চার বছর আগেও বাংলাদেশে জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানি হতো ৪৭ দশমিক ৭ শতাংশ। এখন তা ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়ে ৬২ দশমিক ৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

এর বিপরীতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার তেমন একটা বাড়েনি। বর্তমানে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় মাত্র ২ দশমিক ৩ শতাংশ। যেখানে বৈশ্বিক গড় প্রায় ৩৩ দশমিক ৮ শতাংশ।

বাংলাদেশের দীর্ঘস্থায়ী সমস্যার সমাধান আমাদের কাছেই রয়েছে। সেজন্য বৃহৎ পরিসরে নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণ এবং অতিরিক্ত সক্ষমতা নিয়ন্ত্রণে জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র সীমিত করতে হবে

বুধবার প্রকাশিত ওই গবেষণা প্রতিবেদন বলছে, আন্তর্জাতিক জীবাশ্ম জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার মুখে বাংলাদেশ হয়ে উঠেছে আরও ঝুঁকিপূর্ণ। সেখানে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় ৮৩ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাওয়ার কথাও বলা হয়েছে।

এই ব্যয় বৃদ্ধির কারণ, ব্যয়বহুল জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার এবং মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন। পাশাপাশি বিদ্যুৎকেন্দ্রে বড় অঙ্কের ক্যাপাসিটি পেমেন্টও রেখেছে বড় ভূমিকা।
গবেষণা প্রতিবেদনটি তৈরিতে ২০২০-২১ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের তথ্য বিশ্লেষণ করেছে আইইইএফএ। ওই বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২০-২১ থেকে ২০২২-২৩ অর্থবছরের মধ্যে কয়লার গড়মূল্য ২৯০ শতাংশ বেড়েছে। স্বল্প সময়ের জন্য তেলের উচ্চমূল্য এবং মুদ্রার তীব্র অবমূল্যায়ন বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় ব্যাপকভাবে বাড়িয়েছে। 

তবে ২০২২-২৩ অর্থবছরের তুলনায় কয়লার মূল্য ৫৯ দশমিক ৭ শতাংশ কমে যাওয়া এবং তেলের দাম নিম্নমুখী থাকার পরও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে উৎপাদন ব্যয় কমেনি।

প্রতিবেদনটির লেখক ও আইইইএফএর প্রধান জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলম বলছিলেন, ‘২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেসরকারি খাতের তেল ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোয় গড়ে যথাক্রমে প্রায় ৯ দশমিক ৫ টাকা এবং ৫ দশমিক ৯ টাকা করে ক্যাপাসিটি পেমেন্ট দিতে হয়েছে, যা প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়েছে।’

গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যয় আরও বেড়েছে উল্লেখ করে শফিকুল জানিয়েছেন, ২৫ শতাংশের কম লোড ফ্যাক্টরে চলা গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলোয় প্রতি ইউনিটের উৎপাদন খরচ হয়েছে ১৬ দশমিক ৮৫ টাকা। তবে প্রায় ৭৫ শতাংশ লোড ফ্যাক্টরে চলা কেন্দ্রগুলোয় উৎপাদন খরচ ৬ টাকা হয়েছে।

দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ায় বাংলাদেশকে ব্যয়বহুল তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি করতে হচ্ছে। চলতি বছরের এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত এলএনজি আমদানির জন্য প্রায় ১ দশমিক শূন্য ৭ বিলিয়ন ডলার (১৩১ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন টাকা) ভর্তুকি দিতে হবে বলে প্রতিবেদনে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

এই হিসাব ২০২৫ সালের একই সময়ের আমদানি প্রবণতা এবং প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট এলএনজি আমদানি মূল্য প্রায় ২০ ডলার বিবেচনায় নিয়ে করা হয়েছে। তবে এলএনজি আমদানির পর তা পুনরায় গ্যাসে পরিণত করার যে ব্যয়, তা যোগ করলে এই ব্যয় আরও বাড়বে।

‘অন্যদিকে, গ্রিডভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ মাত্র ২ দশমিক ৩ শতাংশ, যা বৈশ্বিক গড় ৩৩ দশমিক ৮ শতাংশের তুলনায় অনেক কম। ফলে আন্তর্জাতিক জীবাশ্ম জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং উচ্চমূল্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার সক্ষমতা আমাদের বিদ্যুৎ খাতের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সীমিত’— যোগ করেন শফিকুল।

প্রতিবেদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণে এ-সংক্রান্ত যন্ত্রাংশ আমদানির ওপর শুল্ক মওকুফের আহ্বান জানানো হয়েছে প্রতিবেদনটিতে। বলা হয়েছে, ১০০ মেগাওয়াট ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের মাধ্যমে এর জীবনচক্রে ফার্নেস অয়েল আমদানি কমিয়ে এককালীন আমদানি শুল্কের তুলনায় ৩০ গুণ বেশি সাশ্রয় সম্ভব।

শফিকুল আলম মনে করেছেন, ‘বাংলাদেশের দীর্ঘস্থায়ী সমস্যার সমাধান আমাদের কাছেই রয়েছে। সেজন্য বৃহৎ পরিসরে নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণ এবং অতিরিক্ত সক্ষমতা নিয়ন্ত্রণে জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র সীমিত করতে হবে। স্পিনিং রিজার্ভ ও গ্রিড ব্যালান্সিংয়ের প্রয়োজন বিবেচনায় সরকার চাইলে চুক্তির মেয়াদ শেষে কিছু তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে, যাতে উচ্চ ক্যাপাসিটি পেমেন্ট এড়ানো যায়।’

তার পরামর্শ, গ্যাসের চাহিদা কমাতে বাংলাদেশ বিবিআইএন (বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত ও নেপাল) কাঠামোর আওতায় নেপাল ও ভুটানের সাশ্রয়ী জলবিদ্যুৎ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারে।
মার্চ-সেপ্টেম্বরের উচ্চ চাহিদার সময়ে নেপাল ও ভুটান থেকে সম্মিলিত ছয় হাজার মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ পেলে ২০৩০ সালের পর বছরে ২৫৭ বিলিয়ন ঘনফুট পর্যন্ত গ্যাস সাশ্রয় সম্ভব বলেও মনে করেন শফিকুল আলম।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে পিডিবির রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৫৫ হাজার ৬৬০ কোটি টাকা। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের কারণে জ্বালানি খাতে আর্থিক চাপও বাড়াচ্ছে। তবে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের জ্বালানি রূপান্তরনির্ভর করছে বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নির্ধারণ ও সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করার মতো বিচক্ষণ নীতিগত সিদ্ধান্তের ওপর, যা আমদানি করা জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা ও উচ্চ ভর্তুকি কমাতে সহায়তা করবে— যোগ করেন শফিকুল আলম।