Mirza Galib (মির্জা গালিব)
এক, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে অবশেষে বিজেপি জয়লাভ করল।নির্বাচনে যদিও ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ আছে, কিন্তু বিজেপির মুসলিম বিরোধী সাম্প্রদায়িক রাজনীতি পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি হিন্দুদের মধ্যেও জনপ্রিয় হয়ে উঠতেছে, তাতে কোন সন্দেহ নাই।
দুই, ১৯৪৭ সালেই আমাদের রাজনৈতিক স্বার্থ আর পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক স্বার্থ আলাদা হয়ে গিয়েছিল। এরপর ১৯৭১ সালে আমাদের রাজনৈতিক স্বার্থ পাকিস্তানের রাজনৈতিক স্বার্থ থেকেও আলাদা হয়ে গেছে। আমাদের বর্তমান মানচিত্র মূলত পূর্ব পাকিস্তানের মানচিত্র, যেটা ১৯৪৭ থেকে পাওয়া। কিন্তু ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে ঢাকাকে কেন্দ্র করে বাঙালি মুসলমানদের যে রাষ্ট্র বাংলাদেশ গঠিত হলো—এইটাই আমাদের বর্তমান এবং ভবিষ্যতের রাজনৈতিক আইডেন্টিটি।
তিন, ১৯৪৭ নিয়ে আমাদের দেশের জনগোষ্ঠীর একটা অংশের মধ্যে বেশ রিজার্ভেশন আছে। এই একই গোষ্ঠীর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি হিন্দু জনগোষ্ঠীর প্রতি এক ধরনের মমত্ববোধও দেখা যায়। ধর্ম আলাদা হলেও “বাঙালি” হিসেবে একটা কমন গ্রাউন্ড খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা তাদের মধ্যে প্রবল। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ব্রিটিশ ভারতে যে মুসলমানরা এলিট হিন্দু জমিদারদের দ্বারা নিপীড়িত ছিল, আর ইতিহাসের পরিক্রমায় পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি হিন্দু আর বাংলাদেশের বাঙালি মুসলমানদের রাজনৈতিক স্বার্থ যে একেবারেই আলাদা হয়ে গেছে—এই সত্যটা মানতে তাদের মধ্যে দ্বিধা আছে। ফলে তারা বাংলাদেশের মুসলিম আইডেন্টিটিকে চাপা দিয়ে, ভারতের সাথে ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়ে, আওয়ামী লীগকে ভারতের “প্রক্সি” হিসাবে সমর্থন করে - এক ধরনের বাঙালি জাতীয়তাবাদী রাজনীতি করতে চায়।
চার, কিন্তু আইরনি হলো, যাদের সাথে তারা বাঙালি পরিচয় শেয়ার করতে চায়, সেই কাউন্টার পার্টরা এখন বাঙালি পরিচয়ের চাইতে সর্বভারতীয় হিন্দু জাতীয়তাবাদী আইডেন্টিটির দিকে চলে যাচ্ছে। তাদের রাজনৈতিক ন্যারেটিভ এখন মুসলিম বিরোধী এবং বাংলাদেশ বিরোধী। এই নতুন পরিস্থিতিতে বাঙালি জাতীয়তাবাদী রাজনীতি বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্বার্থ সংরক্ষণ করতে আসলে আর সক্ষম না।
পাঁচ, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো— ভারতের হিন্দু জাতীয়তাবাদী রাজনীতির প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশে আমরা কোন রাজনীতি করব? হিন্দু বিরোধী বা ভারত বিরোধী আইডেন্টিটি রাজনীতি? পাল্টা সাম্প্রদায়িক রাজনীতি? অবশ্যই না। ইসলাম আমাদের চিন্তা-চেতনা, কালচার এবং আইডেন্টিটির কেন্দ্রবিন্দু। কিন্তু ইসলাম নিজেই তো সাম্প্রদায়িক না। মানুষের বিশ্বাসের স্বাধীনতা, ধর্ম পালনের স্বাধীনতা—এগুলো আল্লাহই মানুষকে দিয়েছেন। রাসুল (সা.) রহমাতুল্লিল আলামিন, সমগ্র জগতের জন্য রহমত। তাই ইসলামের দিকে ফেরা মানে হলো সকল মানুষের ন্যায্য অধিকারের পক্ষে দাঁড়ানো, বিভিন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠীর মধ্যে চুক্তিভিত্তিক সহাবস্থান আর শান্তির পক্ষে থাকা, ইনসাফের পক্ষে থাকা।
ছয়, বাংলাদেশে আমাদের রাজনীতি তাই ভারতীয় আধিপত্যের বিপক্ষে, কিন্তু ভারতের জনগোষ্ঠী বা আমাদের দেশের হিন্দু জনগোষ্ঠীর অধিকারের বিপক্ষে কোনো সাম্প্রদায়িক রাজনীতি না। উপমহাদেশকে আবার ৪৭-পূর্ব সংঘাতের পথে ফিরিয়ে নেওয়ার রাজনীতিও না—বরং সামনে এগোনোর রাজনীতি। কিন্তু আমাদের সেই রাজনীতি শুরু হবে “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” বলে, গর্বিত মুসলমান হিসেবে। সব ধরনের আধিপত্যবাদের শিকলকে অস্বীকার করে সত্যিকারের স্বাধীন জনগোষ্ঠী হিসেবে আমাদের আজাদির মধ্য দিয়ে। সীমান্তের ওইপাশের ঘৃণার চাষাবাদের বিপরীতে পাল্টা ঘৃণার চাষাবাদ করব না বলেই তো আমরা ৪৭-এ আলাদা হয়ে নিজেদের রাষ্ট্র বানাইছিলাম।