কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার মানিকপুর হাওরের কৃষক জহিরুল ইসলাম এক সপ্তাহ আগে ৩৫০ মণ ধান মাড়াই শেষে রোদে শুকানোর জন্য জমির পাড়ের খলায় স্তূপ করে রেখেছিলেন। সাত দিন ধরে টানা বৃষ্টির কারণে ধান সেভাবেই রয়েছে। এরই মধ্যে স্তূপ করে রাখা ধান থেকে চারা গজিয়েছে। শুক্রবার ধান পচে দুর্গন্ধ ছড়ায়। কোনো উপায় না দেখে আজ তিনি সেসব ধান হাওরের বৃষ্টির পানিতে ভাসিয়ে দিয়েছেন।
মানিকপুর হাওরের আরেক কৃষক তমিজ উদ্দিনও একই দুঃখের কথা জানান। তিনি বলেন, মাড়াই শেষে ৭০ বস্তা ধান তিনি খলায় রেখেছিলেন। শুকাতে না পেরে ধান পচে নষ্ট হয়ে গেছে। বস্তাসহ সেসব ধান ভাসিয়ে দিয়েছেন হাওরের পানিতে।
জানা যায়, কিশোরগঞ্জে টানা বৃষ্টিপাত ও উজানের ঢলের কারণে নদ-নদীর পানি বৃদ্ধিসহ ৯ হাজার ৪৫ হেক্টর বোরো ধানের জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে হাওরাঞ্চলের অন্তত ৩০ হাজারের বেশি কৃষক বিপাকে পড়েছেন। এ ছাড়া টানা এক সপ্তাহ বৃষ্টির কারণে কৃষকের কাটা ধান ও শুকানোর জন্য মাড়াই করা যেসব ধান স্তূপ করে রাখা হয়েছিল, সেগুলোও পচে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। অনেক কৃষক এখন সেসব চারা গজানো ধান হাওরের পানিতে ফেলে দিচ্ছেন। অন্যদিকে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা রোজের শ্রমিক দিয়ে জমি থেকে কেটে আনা যেসব ধান খলায় বা অন্য জায়গায় স্তূপ করে রাখা ছিল, সেগুলোও নষ্ট হয়ে গেছে। অনেক কৃষক শ্রমিক ও হারভেস্টার মেশিনের উচ্চমূল্য দিতে না পেরে নয়ন ভাগা (যত দূর দেখা যায়, এর মধ্যে যার যেমন খুশি ধান কেটে নেওয়া) দিয়ে দিচ্ছেন।
নিকলীর মজলিশপুর এলাকার কৃষক কালা মিয়ার ১০ কানি (৩১ শতাংশে ১ কানি) জমির ধান বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে গেছে। তবে আধা পাকা ছয় কানি জমির ধান তিনি শ্রমিক দিয়ে গত রোববার তাড়াহুড়ো করে কেটে এনেছিলেন। সেই ধান স্তূপ করে রেখেছিলেন। বৃহস্পতিবার কিছুটা রোদ পেলেও ধানমাড়াইয়ের মেশিন না পাওয়ায় ধান সেভাবেই ছিল। ভাবছিলেন, হয়তো আবার রোদ উঠবে। পরে মাড়াই করে রোদে শুকাবেন। কিন্তু শুক্রবার সারা দিন রোদের দেখা মেলেনি। আজ শনিবার ভোর থেকে ভারী বৃষ্টি হচ্ছে। কৃষক কালা মিয়া সেই ধান দেখিয়ে বলেন, ‘কেটে এনে ধান রক্ষা করতে পারলাম না। স্তূপ করে রাখা ধান নষ্ট হয়ে কালো হয়ে গেছে। আরও কিছু ভেসে থাকা ধান ভেবেছিলাম আজকে কাটাব, কিন্তু ১ হাজার ২০০ টাকা করেও শ্রমিক মেলানো যাচ্ছে না। ধান নিয়ে এবার বড় বিপদে পড়েছি আমরা।’

করিমগঞ্জের মানিকপুর এলাকার কৃষক জহির মিয়া বলেন, ‘এক একরের বেশি জমির ধান ১ হাজার ৩০০ টাকা রোজ কামলা আর বাড়ির ছোট–বড় সবাই মিলে কোমরপানি থেকে অনেক কষ্টে কেটে এনেছিলাম। মাড়াই শেষে শুকানোর জন্য জমির পাড়ে রেখেছিলাম সেই ধান। এক সপ্তাহ ধরে রাখা সেসব ধান এখন পচে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। অনেক ধানে চারা গজিয়ে গেছে। এসব ধান এখন গলার কাঁটা হয়ে গেছে। কষ্ট হলেও ধানগুলো হাওরের পানিতে ভাসিয়ে দিতে হচ্ছে।
মিঠামইনের ঢাকি এলাকার কৃষক কামাল হোসেন বলেন, ‘গত সাত দিনের বৃষ্টি আর ঢলের পানিতে আমার পাঁচ একরের বেশি জমির ধান তলিয়ে গেছে। এখনো আধা ফুটের মতো ভেসে আছে। কিন্তু তীব্র শ্রমিকসংকটের কারণে সেসব ধানও কাটা সম্ভব হচ্ছে না। পাকা ধান চোখের সামনে ডুবে যাচ্ছে। তাই ঘোষণা দিয়েছি, যার ইচ্ছা নয়ন ভাগায় সে ধান যেন কেটে নিয়ে যায়।’
কিশোরগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাজ্জাদ হোসেন বলেন, জেলায় নদ–নদীর পানি কিছুটা বেড়েছে। তবে বিপৎসীমার নিচে রয়েছে। ইটনার ধনু-বৌলাই নদ, করিমগঞ্জের চামড়া বন্দর এলাকার মগড়া নদী, অষ্টগ্রামের কালনী নদী ও ভৈরবের মেঘনা নদীতে গতকালের তুলনায় আজ ৫ থেকে ১৫ সেন্টিমিটার পানি বেড়েছে। কিছু এলাকায় জমে থাকা বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের জন্য কৃষকেরা নিজেদের উদ্যোগে বাঁধ কেটে দিচ্ছেন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ সাদিকুর রহমান বলেন, শনিবার ভোর থেকেই বৃষ্টি হচ্ছে। যে কারণে নদ–নদী ও ঢলের পানি বাড়ছে। আজ শনিবার বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত মাঠ পর্যায়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জেলার হাওরাঞ্চল ইটনা, মিঠামইন, অষ্টগ্রাম, নিকলীসহ কয়েকটি অঞ্চলের ৯ হাজার ৪৫ হেক্টর জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে আনুমানিক ৩০ হাজার কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন।