প্রধানমন্ত্রী পদে যদিও আছেন তারেক রহমান, তবে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকাণ্ডে ও নীতিনির্ধারনী সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব খাটাচ্ছেন অন্যরা। নানা কায়দায় এরাই মূলতঃ সরকারকে চালাচ্ছেন। ভুল তথ্য উপস্থাপনের মাধ্যমে কৌশলে নিজেদের উদ্দেশ্য হাসিল করে নিচ্ছেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই চক্রটি যা চাইছেন তা-ই হচ্ছে। এদের ব্যাপক প্রভাবের কথা ছড়িয়ে পড়েছে সরকারের ভেতরে বাইরে অনেকের মধ্যেই। এরা যাদেরকে যা ‘করে দেওয়ার’ প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, তা হয়েও যাচ্ছে। বর্তমান সরকারের আমলে এর কিছু প্রমাণও পাওয়া গেছে ইতিমধ্যে। গোপনে নয়, এখন অনেকটা প্রকাশ্যেই এই চক্রটি ঘুষের তদবিরের কাজ খুঁজছে। অবাক ব্যাপার হলো, ঘুষের তদবিরের কাজের জন্য বিজ্ঞাপনও দেওয়া হচ্ছে। সরকারের বড় বড় গুরুত্বপূর্ণ পদ এবং কাজ চায় এমন আগ্রহী ব্যক্তিদের যোগাযোগ করতে বলা হচ্ছে। অতীতে কখনো এমনকি আওয়ামী লীগ আমলেও দেখা যায়নি রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ কাজকর্ম অবৈধ কেনা-বেচার এমন ভয়াবহ তৎপরতা। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেই প্রথম এটি চালু হয়েছিল। ড. ইউনূসের ভাবমূর্তি ভয়াবহভাবে ক্ষুণ্ন এবং ক্ষমতা থেকে তার দ্রুত প্রস্থানের এটিই ছিল অন্যতম কারণ। কিন্তু বর্তমান বিএনপি সরকারের এখন পর্যন্ত সবেমাত্র দুই মাস অতিক্রান্ত হয়েছে। এখনই এ রকমের ভয়াবহ অপতৎপরতা চলছে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার।
এই প্রভাবশালী গ্রুপটির গুরুতর অপকর্ম হাতেনাতে ধরা পড়ে সম্প্রতি এলজিইডির (স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর) প্রধান প্রকৌশলী পদে নিয়োগকে কেন্দ্র করে। কিন্তু তাতে তাদের অপতৎপরতা মোটেও থামেনি। যেহেতু হাতেনাতে ধরা পড়ার পরও তাদের কারো বিরুদ্ধেই দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এরা ইতিমধ্যে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে তদবির বাণিজ্যের দোকানও খুলে বসেছে। সর্বশেষ, শীর্ষকাগজ ও শীর্ষনিউজ ডটকম কর্তৃপক্ষের হাতে এসেছে প্রভাবশালী এই সিন্ডিকেটের ‘ক্ষমতার দৌড়’ ও ভয়াবহ অপকর্মের একটি জাজ্জ্বল্য প্রমাণ। গত ২৭ মার্চ মোবাইল ফোনের হোয়াটসঅ্যাপ এসএমএস-এ আসে তদবিরের এক বিজ্ঞাপন। তাতে মাদক ও অস্ত্র মামলার আসামির থানায় জামিন খালাস, দুদকের আওয়ামী লীগ আমলের নথি দায়মুক্তি, ব্যাংক ঋণের সুদ মওকুফ প্রভৃতি কাজের পাশাপাশি খাদ্য সচিব পদে নতুন লোক চাওয়া হয়। ভূমিমন্ত্রীর পিএস পদেও নিয়োগ দেওয়া হবে বলে বিজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়। এসএমএস’র স্ক্রিন শর্ট-এ দেখা যাচ্ছে, এমন বিজ্ঞাপনের জবাবে ঞধঢ়ড় চৎড়শধংয কড়ষশধঃধ নামে কোনো একজন জানতে চেয়েছেন (খাদ্য সচিব পদে নতুন লোক খোঁজার উত্তরে), “খাদ্য সচিবকে কি ওএসডি করা হবে, নাম ফিরোজ সরকার, খুলনার বিভাগীয় কমিশনার ছিলেন। অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে তিনি সচিব হয়েছেন। ১৭ ব্যাচের অফিসার।” এর উত্তরে বিজ্ঞাপনদাতা নিশ্চিত করে বললেন, “হ্যাঁ সরিয়ে দেবে অথবা ওএসডি করবে।”
প্রভাবশালী চক্রের ক্ষমতার দৌড় এতটা? এরাই রাষ্ট্রের পরিচালক?
গত ২৭ মার্চ, ২০২৬ শীর্ষনিউজ ডটকম এবং সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজ কর্তৃপক্ষের হোয়াটসঅ্যাপ ম্যাসেজে এই স্ক্রিন শর্টটি আসে। সচিবালয়েরই একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছ থেকে স্ক্রিন শর্টটি পাওয়া যায়। দেখা যাচ্ছে, এর এক মাসেরও কম সময়ে খাদ্য সচিব পদে পরিবর্তন হলো। গত ২১ এপ্রিল খাদ্য সচিব ফিরোজ সরকারকে সচিবালয়ের বাইরে পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব পদে ডাম্পিং পদায়ন করা হয়। ফিরোজ সরকারের কী অপরাধ, কেন তাকে এভাবে ডাম্পিং পদে বদলি করা হলো, এর হেতু বের করতে পারছেন না খাদ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারাও। এরা প্রজ্ঞাপন জারির আগ পর্যন্ত ঘুর্ণাক্ষরেও জানতেন না, সচিবকে বদলি করা হচ্ছে। তবে ভেতরে ভেতরে কিছু একটা যে ঘটেছে, এটা বুঝা গেছে বদলির আদেশ জারির পরদিন। যদিও এ বদলিগুলোতে স্ট্যান্ড রিলিজের মতো কোনো ঘটনা ছিল না, তারপরও খাদ্য সচিব ফিরোজ সরকারকে পরদিন অফিস আওয়ারের শুরুতে তাৎক্ষণিকভাবে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিতে বলা হয়। এবং নতুন খাদ্য সচিব আবু তাহের মো. মাসুদ রানাকেও দায়িত্ব বুঝে নিতে বলা হয়। অথচ এ দিন ছিল ধান-চাল সংগ্রহ সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ কমিটির (এফপিএমসি) সভা। নতুন সচিব এ সম্পর্কে কিছুই জানেন না, তারপরও তাকে দায়িত্ব বুঝে নিয়ে সভা পরিচালনা করতে হলো।
এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, বিএনপি বলে চিহ্নিত সচিবালয়ে হাতে গোনা যে তিন/চারজন সচিব আছেন তারমধ্যে র্ফিরোজ সরকার অন্যতম। গত বছরের অক্টোবরে লন্ডন থেকে তারেক রহমানের সুপারিশে অন্তর্বর্তী সরকার জনপ্রশাসন সচিব ড. মোখলেস উর রহমান এবং অতিরিক্ত সচিব (এপিডি) মো. এরফানুল হককে অন্যত্র বদলি করে। এরফানুল হকের পরিবর্তে অতিরিক্ত সচিব (এপিডি) পদে পদায়ন করা হয় তখনকার খুলনার বিভাগীয় কমিশনার মো. ফিরোজ সরকারকে। কিন্তু তখন জামায়াতের প্রচণ্ড বিরোধিতার কারণে ফিরোজ সরকার অতিরিক্ত সচিব (এপিডি) পদে যোগ দিতে পারেননি। জামায়াত তখন কৌশলে এই পদটি শূন্য রেখে যুগ্মসচিব মিঞা মুহাম্মদ আশরাফ রেজা ফরিদীকে (বর্তমানে যিনি প্রধানমন্ত্রীর পিএস পদে আছেন) দিয়ে মাঠ প্রশাসন সাজানোর এজেন্ডা বাস্তাবায়ন করে নেয়।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, খাদ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী পদে মো. আব্দুল বারী থাকলেও এ মন্ত্রণালয়টি চলছে মূলতঃ স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের হাতের ইশারায়। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন ইতিপূর্বে মোহাম্মদ আমিন উর রশীদ। গত ২৫ মার্চ তাকে সরিয়ে এ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয় মো. আব্দুল বারীর হাতে, যিনি জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী পদেও আছেন। জনপ্রশাসন নিঃসন্দেহেই একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়, তার উপর এখন তাকে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হলো।
মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, মোহাম্মদ আমিন উর রশীদ এ মন্ত্রণালয়ে থাকাকালে তিনি স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের নানা রকমের অবৈধ তদবির রাখতে পারেননি বা রাখেননি। এ নিয়ে মীর শাহে আলম তার ওপর ক্ষুব্ধ ছিলেন। আর এ কারণেই ‘ক্লিন ইমেজ’র আমিন উর রশীদকে এ মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রী পরিবর্তনের প্রজ্ঞাপনটি জারি হয় ২৫ মার্চ রাতে। তিন দিন বন্ধের পরে অফিস চালু হয় ২৯ মার্চ। এদিন সকালে মীর শাহে আলমই নিজের গাড়িতে করে আব্দুল বারীকে খাদ্য মন্ত্রণালয়ে নিয়ে আসেন। আব্দুল বারী যতক্ষণ খাদ্য মন্ত্রণালয়ে অফিস করেছেন, মীর শাহে আলম সঙ্গেই ছিলেন। আবার দুপুরের দিকে দুজন একসঙ্গে এক গাড়িতেই বের হয়ে যান। মীর শাহে আলমকে বর্তমান বিএনপি সরকারের আমলে অনেকে ‘সুপার পাওয়ার’ হিসেবেই দেখে থাকেন। মন্ত্রী-সচিব পরিবর্তনসহ তিনি যখন যেটা চাইবেন সেটিই কার্যকর হবে, এটা সবাই জানেন। মোহাম্মদ আমিন উর রশীদের খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সহকর্মীরা বলছেন, মন্ত্রী ‘ক্লিন ইমেজ’র আমিন উর রশীদ খাদ্য সচিব হিসেবে ফিরোজ সরকারের প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলেন। তার ইতিবাচক কাজকর্মে অত্যন্ত সন্তুষ্ট ছিলেন মন্ত্রী। এও বলেছিলেন যে, তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছে ফিরোজ সরকার সম্পর্কে ইতিবাচক মন্তব্য করবেন। কিন্তু সেটি আদৌ সম্ভব হয়েছে কি না জানা যায়নি। তবে বর্তমান প্রতিমন্ত্রী আবদুল বারীও যে সচিবের ওপর অসন্তুষ্ট ছিলেন তা নয়।
স্ক্রিন শর্টের সঙ্গে বাস্তবতা মিলে যাওয়া- ভয়াবহ ঘটনা!
ফিরোজ সরকারকে এ মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে দেওয়ার সুনির্দিষ্ট কারণ যদিও এখন পর্যন্ত জানা যায়নি, তবে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, এটা নিশ্চিত যে, এর নেপথ্য একমাত্র কারণ হতে পারে স্থানীয় সরকারের ‘সুপার পাওয়ার’ প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের বিরাগভাজন হওয়া। কিন্তু এরমধ্যে গুরুতর প্রশ্ন হলো, খাদ্য সচিব ফিরোজ সরকারকে ওএসডি করা হবে অথবা সরিয়ে দেওয়া হবে- এ খবরটা তদবিরের বিজ্ঞাপনে আসলো কীভাবে, তদবিরকারীরা এতোটা আগাম জানলো কীভাবে? একে রাষ্ট্রের জন্য ‘ভয়াবহ ঘটনা’ বলেই উল্লেখ করছেন জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা।
সূত্রমতে, মাঝের এই তদবিরকারীরা মূলতঃ এজেন্ট বা দালাল। এদের সঙ্গে প্রভাবশালী ওই সিন্ডিকেটের সরাসরি যোগসাজশ রয়েছে এবং তাদের এজেন্ট হিসেবে কাজ করছেন এরা। সিন্ডিকেটের সদস্যরা যেহেতু রাষ্ট্রের হাইপ্রোফাইলের, তারা নিজেরা মাঠ পর্যায় থেকে পার্টি খুঁজে নেওয়া বা দরকষাকষি করা সম্ভব নয়। পার্টির সঙ্গে সরাসরি কথা বলাও তাদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। তাই এসব মধ্যসত্ত্বভোগী ‘এজেন্ট’ নিয়োগ করা হয়েছে। এই মধ্যসত্ত্বভোগীরা বিভিন্ন পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে আকর্ষণীয় পদগুলোর জন্য লোক খোঁজে। এবং বিভিন্ন অবৈধ কাজও ‘সম্পন্ন করে দেওয়ার’ নিশ্চয়তা দেয়। তদবিরের কাজ পাওয়ার সুবিধার্থে হোয়াটসঅ্যাপ ম্যাসেজে বিজ্ঞাপনও দেওয়া হয়। নিরাপত্তা বাহিনী বা গোয়েন্দা সংস্থার হাতে ধরা পড়ার আশংকা নেই তাদের। কারণ, তাদের পেছনে রয়েছেন প্রভাবশালী ব্যক্তিরা, যারা রাষ্ট্রকে পরিচালনা করছেন। ধরা পড়ে গেলেও কোনো সমস্যা নেই।
এরমধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, পদগুলো এভাবে নিলামে তোলার ঘটনার সঙ্গে পরবর্তী ঘটনা বা বাস্তবতার পুরোপুরি মিল হয়ে যাচ্ছে। এতে বুঝা যাচ্ছে, রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে যদিও রয়েছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান, কিন্তু নানা কৌশলে রাষ্ট্র চালাচ্ছেন অন্যরা। আলোচ্য এই স্ক্রিন শর্ট এবং পরবর্তী ঘটনাই এর জাজ্জ্বল্য প্রমাণ। এসব ঘটনা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান হয়তো জানেনই না। জানলে বা তিনি বুঝতে পারলে, নিজের বা দলের বা সরকারের জনপ্রিয়তা ক্ষুণ্ন করতে চাইতেন না নিশ্চয়ই। এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী পদে আব্দুর রশীদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ নিয়ে দুর্নীতির ঘটনা প্রধানমন্ত্রীর নজরে আসার সঙ্গে সঙ্গে তিনি বাতিলের সিদ্ধান্ত দেন। এতে বরং প্রধানমন্ত্রীর ভাবমূর্তি বেড়েছেই। কিন্তু অন্য আরো যেসব ভয়াবহ অনিয়মের অসংখ্য ঘটনা ঘটছে এগুলো তার নজরে আসছে না বা আসলেও ভিন্নভাবে আসছে, এমন কথা বলছেন বিশ্লেষকরা।
এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী পদে নিয়োগে ওই দুর্নীতির ঘটনাটিও এভাবে ধরা পড়তো না যদি বিএনপির মহাসচিব, স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এ বিষয়ে চ্যালেঞ্জ না জানাতেন। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, সরকারের বেশিরভাগ মন্ত্রীরই এই প্রভাবশালী চক্রটির সামনে, এমনকি পেছনেও নেতিবাচক কিছু বলার সাহস নেই। কারণ, তাতে তাদের মন্ত্রীত্বের চাকরিই চলে যাওয়ার আশংকা রয়েছে। আবার কারো কারো নিজেদেরও এতে ব্যক্তিগত স্বার্থ রয়েছে। কেউ কেউ বলছেন, গোটা সরকার এখন এদের বলয়ে আটকা পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বিএনপি সরকারের শুভাকাক্সক্ষীরা হতাশা ব্যক্ত করছেন। বিএনপির নেতা-কর্মীদের মধ্যেও এখন এ কথাগুলো চাউর হয়ে গেছে।
এসএমএস’র স্ক্রিন শর্টে যা লেখা ছিল
হোয়াটসঅ্যাপ ম্যাসেজের স্ক্রিন শর্টে বলা হয়েছে, “মাদক, অস্ত্র মামলা, মার্ডার মামলার আসামির জামিন-খালাস এর কাজ দরকার” “আর দুদকের আওয়ামী লীগের সময়ের ফাইল দরকার” “সুদ মওকুফ এর আলাদা বড় ফাইল হলেও ৮০%-১০০% মওকুফ করা যাবে”।
এরপরে আলাদভাবে লেখা হয়, “খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব নিয়োগ হবে। ভূমি মন্ত্রীর পিএস নিয়োগ হবে।”
এমন বিজ্ঞাপনের জবাবে ঞধঢ়ড় চৎড়শধংয কড়ষশধঃধ নামে কোনো একজন জানতে চেয়েছেন (খাদ্য সচিব পদে নতুন লোক খোঁজার উত্তরে), “খাদ্য সচিবকে কি ওএসডি করা হবে, নাম ফিরোজ সরকার, খুলনার বিভাগীয় কমিশনার ছিলেন। অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে তিনি সচিব হয়েছেন। ১৭ ব্যাচের অফিসার।” এর উত্তরে বিজ্ঞাপনদাতা নিশ্চিত করে বললেন, “হ্যাঁ সরিয়ে দেবে অথবা ওএসডি করবে।”
এমন অপকর্মের আমদানিকারক ড. ইউনূস সরকার
শেখ হাসিনার ফ্যাসিস্ট ও লুটেরা সরকারের দীর্ঘ অপশাসনের পর ৫ আগস্ট, ২০২৪ এর পরের ড. মুহাম্মদ ইউনূস সরকারের ওপর দেশের মানুষের প্রত্যাশা ছিল আকাশচুম্বি। নোবেল বিজয়ী, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভাবমূর্তি প্রভৃতি কারণে মানুষের প্রত্যাশাও ছিল সে রকমেরই। কিন্তু দেখা গেলো, জনপ্রত্যাশা পূরণের কোনো চেষ্টাই তিনি করেননি। বরং নিজের আখের গোছানোর ধান্দা এবং বিভিন্ন গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত স্বার্থ রক্ষার কাজেই ব্যস্ত ছিলেন। এসব করতে গিয়ে তিনি এমন অপকর্মের প্রচলন করেছেন, যা অতীতের সকল নজিরকে ছাড়িয়ে গেছে। এর বড় নজির হলো, তদবিরের দোকান। হোয়াটসঅ্যাপ ম্যাসেজে বিজ্ঞাপন দিয়ে তদবিরের কাজ নেওয়ার প্রচলন চালু করেছে ড. ইউনূস সরকারই। খোদ প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ই এসব ঘটনার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিল। সরকারি স্ট্যাম্পে লিখিত ঘুষের চুক্তি এবং ‘ব্যাংক চেক’ বিনিময়েরও প্রচলন চালু হয়েছিল এসব কাজে। এ ধরনের ঘুষ লেনদেনের প্রমাণ ফাঁস হওয়ার পরও ড. ইউনূস সরকার বা ড. মোমেন নেতৃত্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন এ ব্যাপারে কোনোই ব্যবস্থা নেয়নি। সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজ এবং শীর্ষনিউজ ডটকমে তখন এ ব্যাপারে দু’জন সচিবের সুনির্দিষ্ট তথ্যসহ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। প্রতিবেদন প্রকাশের পর দুদক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেন শীর্ষকাগজ সম্পাদককে জানিয়েছিলেন, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে তার কাছে নির্দেশনা এসেছে এর ওপর তদন্ত করার জন্য। তিনি ওই দুই সচিবকে তলব করবেন বলেও জানিয়েছিলেন। যা পরে আর হয়নি। এই ‘না হওয়ার’ পেছনেও কাজ করেছে এখনকার সরকারের প্রভাবশালী এক সিনিয়র কর্মকর্তার ‘প্রভাব’, যিনি বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের শীর্ষ গুরুত্বপূর্ণ পদে আছেন। ওইসব তদবিরের টাকার যে ভাগবাটোয়ারা হতো তাতে এই কর্মকর্তারও একটি অংশ থাকতো। যে কারণে আলোচিত ওই দুই সচিবের কোনো সমস্যা হয়নি বর্তমান বিএনপি সরকারের আমলেও। একজন ইতিমধ্যে ইন্তেকাল করেছেন। আরেকজন এখনো বহাল-তবিয়তেই রয়েছেন। স্ট্যাম্পে লিখিত চুক্তি এবং বড় অংকের ঘুষের চেক বিনিময়ের তথ্য ফাঁস হয়েছিল এই দুই সচিবের।
‘এরা সরকারকে ডোবাবে’
ড. মুহাম্মদ ইউনূস রাষ্ট্রের ক্ষমতা হাতে পেয়েছেন অনেকটা অপ্রত্যাশিতভাবে। তাই রাষ্ট্র পরিচালনার কোনো পরিকল্পনাও তার হাতে ছিল না। কিন্তু অনেক চড়াই-উৎরাইয়ের পর দীর্ঘ দুই দশক পরে বিএনপি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ফিরে পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বাবা-মা দু’জনই রাষ্ট্রের সফল কর্ণধার ছিলেন। জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন আকাশচুম্বি। তারেক রহমান বিদেশে থাকলেও দল পরিচালনার মূল দায়িত্বে ছিলেন তিনি। গত ডিসেম্বরে দেশে ফিরেই তিনি বলেছেন, “আই হ্যাভ অ্যা প্ল্যান”। অর্থাৎ দেশ পরিচালনায় তাঁর দীর্ঘ একটি পরিকল্পনা আছে। এবং থাকাটাই স্বাভাবিক।
কিন্তু দেখা যাচ্ছে, এখন পর্যন্ত সরকার মাত্র দুই মাস অতিক্রম করেছে। এই সামান্য সময়ে প্রভাবশালী চক্রটি নতুন সরকারকে একের পর এক বিতর্কের মধ্যে ফেলেছে। বিএনপির শুভাকাক্ষী, এমনকি নেতাকর্মীদেরও অনেকের এ বিষয়ে মন্তব্য হলো- এখনই এদের থামাতে হবে। অন্যথায় এরা সরকারকে ডোবাবে। সরকারের ভাবমূর্তি শূন্যের কোঠায় নিয়ে যেতে এদের বেশি সময় লাগবে না।
শীর্ষনিউজ