Tanzil Rahman(তানজিল রহমান)
দুই দিন আগে আমাকে বুয়েটের এক ভাই বলছিলেন যে, শিবিরের যে কেন্দ্রীয় সভাপতিদের বিভিন্ন ঘরোয়া বৈঠক, টিসি, টিএসে, জনসভায় দারুণ বক্তব্য দিতে দেখতাম, সংসদে তাদেরকে এমন নিস্প্রভ লাগে কেন?
এই প্রশ্নের গভীরে যেতে হলে আমাদের একটা সিম্পল কনসেপ্ট আগে পরিস্কার করতে হবে।
ধরেন কোন এলাকায় একটা কালভার্ট দরকার। একজন নেতা হিসেবে এই সমস্যা/চাহিদা বুঝার পরে আপনি ঐ এলাকাবাসী এবং ঐ এলাকার প্রবাসীদের কাছ থেকে ডোনেশন কালেক্ট করে কালভার্ট বানিয়ে দিলেন- এটা হচ্ছে চ্যারিটি।
আর এলাকাসীকে সাথে নিয়ে এলাকার চেয়ারম্যান/এমপির সাথে দেনদরবার করে কালভার্টটা আদায় করে নিলেন, এটা হচ্ছে রাজনীতি।
দুই উপায়েই কালভার্টটা তৈরি হবে এবং এলাকাবাসীও উপকৃত হবে, কিন্তু শতভাগ চ্যারিটির মাধ্যমে এটা করলে নেতা হিসেবে রাজনীতিতে আপনার স্টেক তৈরি হবে না। শতভাগ চ্যারিটির মাধ্যমে করলে কালভার্ট বানানোর এই প্রোসেসে যুক্ত থাকার পরেও আপনার মধ্যে ক্ষমতাকে প্রশ্ন করার এবং স্টেকহোল্ডারদের সাথে নেগোসিয়েশনের ক্যাপাসিটি তৈরি হবে না।
এই স্কিল অর্জন না করেই যদি শুধু চ্যারিটি করে ক্ষমতায় চলে যান তাহলে রাজনীতির বুঝাপড়ায় ঘাটতি থেকে যাবে। আবার শুধু চ্যারিটি করলে চেয়ারম্যানও তার দায়িত্ব পালন না করে পার পেয়ে যাবে, হয়তো বাজেটটাও নিজের পকেটে ঢুকাবে।
উন্নয়নশীল দেশগুলোতে রিসোর্স কম থাকায় রাজনীতিতে চ্যারিটি অনেকক্ষেত্রেই দরকারি হয়ে পড়ে। কিছু ক্ষেত্রে নিজের পরিচিতি তৈরির জন্য এটা জরুরিও। কিন্তু এই একই কালভার্ট আপনি যদি শুরুতে এলাকাবাসীকে সাথে নিয়ে স্ট্যাবলিশমেন্টকে চ্যালেঞ্জ করে আদায়ের চেষ্টা করতেন তাহলে রাজনীতিতে আপনার স্টেক তৈরি হতো, ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ ও নেগোসিয়েশন করা শিখতেন।
আবার চেয়ারম্যান/এমপিকে জবাবদিহির সম্মুখীন করে তার ব্যর্থতা এলাকাবাসীকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে এর পরে আপনি চ্যারিটি করে কালভার্টটা করতে পারতেন। এতে চ্যারিটি এবং রাজনীতি দুটোই হতো। বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে আমার মতে এইটাই বেস্ট মডেল।
জামায়াত বা শিবিরের প্রশিক্ষণ এবং প্রাক্টিসে চ্যারিটি উপস্থিত কিন্তু রাজনীতির উপস্থিতি কম। আপনি যদি জামায়াত করে থাকেন তাহলে নিজের কাছে প্রশ্ন করলেই এই উত্তর পাবেন। যে কোন সমস্যা সমাধানে আপনার প্রথমেই কি স্ট্যাবলিশমেন্টকে চ্যালেঞ্জের কথা মাথায় আসে নাকি সুধীদের কাছে কালেকশন করে নিজেরাই সমাধান করে ফেলা?
দীর্ঘদিন এক ধরনের প্রশিক্ষণ এবং প্রাক্টিস করে চাইলেও আপনার ব্রেইন হুট করে অন্যভাবে চিন্তা করতে পারবে না। এর সাথে জামায়াতের প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা মওদূদির একটা উপমাও মেলাতে পারেন। পাকিস্তান প্রকৃত ইসলামী রাষ্ট্র হতে পারবে কিনা এই প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন এক ধরনের গাছ লাগিয়ে সেই গাছ থেকে অন্য ফল আশা করা অবান্তর।
ফলে কম্ফোর্ট জোনের বাইরে গিয়ে যখন রাজনীতি করতে হয় তখন জামায়াতের নেতাদের পার্ফর্মেন্সে ঘাটতি চোখে পড়ে। এটা আমরা স্বীকার করি, বা না করি- বাস্তবতা বদলাবে না।
এখন এর জন্য কি জামায়াতকে রাজনীতি ছেড়ে দিতে হবে?
রাজনৈতিক যোগ্যতার প্রশ্নে জামায়াতের ঘাটতি চোখে পড়লেও নৈতিকতা আর মূল্যবোধের যে চর্চা জামায়াতে আছে সেটা অমূল্য। অন্য দলগুলোকে সততা এবং কমিটমেন্টে বিশ পেলে জামায়াত অন্তত সত্তুর পাবে। সৎ লোকের শাসন প্রতিষ্ঠার যে মোটিভেশন জামায়াত দেয় সেটা অন্য কোন দলেই নেই। ফলে জামায়াতকে রাজনীতি ছেড়ে দিতে বলা কোন সমাধান না। বরং জুলুমে জীর্ণ বাংলাদেশের ভবিষ্যতের জন্য জামায়াতই এখন পর্যন্ত একমাত্র ভরসার যায়গা।
স্বাধীনতার পর থেকে জামায়াত কখনোই সুষ্ঠু রাজনৈতিক স্পেস পায় নি, গত সতেরো বছরে তো ফ্যাসিসবাদে পিষ্ট দেশে রাজনীতিই অনুপস্থিত ছিলো। এর ফলে স্বাভাবিক উপায়ে জামায়াতের মধ্যে যে রাজনৈতিক ইভোলিউশন হতো, সেই সুযোগ হয় নি। জামায়াতের শীর্ষ দশ জন নেতাকে হত্যা করায় নিজের কর্মসূচি, এচিভমেন্ট এবং ফিউচার ম্যাপিং নিয়ে যে এনালাইসিস জামায়াত করবে, সেই ক্যাপাসিটিও সেভাবে গড়ে ওঠে নি।
থিওরেটিকালি জামায়াতে রাজনীতি নিয়ে দফা ও কর্মসূচি থাকলেও জামায়াতের শুরুর দিকে সেই সময়ের চাহিদা অনুযায়ী দাওয়াত এবং প্রশিক্ষণ সংক্রান্ত কর্মসূচিগুলোর যেভাবে বিকাশ ঘটেছে, পরবর্তীতে সময়ের চাহিদা অনুযায়ী অন্য দফাগুলোর কর্মসূচি সেভাবে বিস্তৃত হয় নি।
এই পথ পরিক্রমায় জামায়াতের ঘাটতিগুলো ধরিয়ে দেওয়ার মতো যে অল্প কিছু মানুষ এসেছে, তারাও জামায়াতকে অতিদ্রুত পালটে ফেলতে চেয়েছে। না পেরে অতি প্রতিক্রিয়াশীল আচরণ করেছে। এর কারণে তাদের পরামর্শ নিয়ে চিন্তা করার চেয়ে জামায়াত নিজেকে ডিফেন্ড করতেই বেশি ব্যস্ত হয়ে গিয়েছে।
একটা ক্যাডারভিত্তিক দলের মধ্যে পরিবর্তন আনার জন্য যে সময় এবং ধৈর্য দরকার, তার খুব সামান্যই তারা দেখিয়েছে। আবার মীর কাসিম আলী বা কামারুজ্জামানের মতো যাদের পক্ষে এই পরিবর্তন সম্ভব ছিলো তাদেরকেও বিরোধীরা টার্গেট করে মেরে ফেলেছে।
এই ঘাটতিগুলো পূরণের জন্য তাই আমাদেরকেও জামায়াতকে কিছুটা সময় দিতে হবে। চ্যারিটি এবং রাজনীতির সমন্বয়ের মতো হিযব (দল) এবং হারাকার (আন্দোলন) মধ্যে ভারসাম্যও অসম্ভব কিছু নয়। আবার জামায়াতকেও তার ঘাটতিগুলো পূরণ ও বাস্তবসম্মত প্রশিক্ষণ পদ্ধতি হাতে নিতে আরও আন্তরিক হতে হবে।