দেশে গোয়েন্দা তালিকায় থাকা ১৬১১ জঙ্গি বর্তমানে আবার মাঠ দাবড়িয়ে বেড়াতে শুরু করেছে। এই জঙ্গিদের গ্রেপ্তারে কঠোর নজরদারি শুরু করেছেন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা। এর মধ্যে জঙ্গি হামলার আশঙ্কায় দেশের আটটি বিমানবন্দরসহ ১২টি কেপিআইভুক্ত স্থাপনায় সতর্কতা জারির পাশাপাশি বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। গতকাল সোমবার বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক এই বিশেষ নিরাপত্তা সতর্কতার বিষয়টি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন।
ওই তালিকার তথ্য বলছে, ২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এক হাজার ২৩১ জন জঙ্গি জামিনে কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছে।
তাদের কেউ কেউ জামিনে থেকে হাজিরা দিলেও বেশির ভাগের হদিস মিলছে না। এর মধ্যে ১১৪ জন জামিন পাওয়ার পর থেকে আর কখনো আদালতে হাজিরা দেননি।
২০২৪-এর আগস্টে ১৮ জন, সেপ্টেম্বরে ৩৮ জন, অক্টোবরে ১৩ জন, নভেম্বরে ১৫ জন ও ডিসেম্বরে ১২ জন জামিন পান। এ ছাড়া ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ২৬ জন, ফেব্রুয়ারিতে ১৯ জন, মার্চে ৫১ জন, এপ্রিলে ৩১ জন, মে মাসে ৪০ জন, জুনে ৬১ জন এবং জুলাইতে ৫৬ জন জামিন পান। এর মধ্যে জেএমবির ৬৮ জন, জামাতুল আনসার ফিল হিন্দালের ১৫ জন, হুজিবির চারজন, ইমাম মাহমুদ কাফেলার চারজন, হিযবুত তাহরীর ছয়জন, নব্য-জেএমবির ছয়জন, এবিটির চারজন, আনসার আল ইসলামের সাতজন ও নামবিহীন সংগঠনের ২৬৫ জন রয়েছেন।
আবার সন্ত্রাসবিরোধী আইনে করা মামলায় অভিযুক্ত অন্তত ৩৭০ জন জঙ্গি এখনো গ্রেপ্তার হয়নি।
পলাতকদের ধরন অনুযায়ী মামলার শুরুতে ১৩০ জন, জামিনে গিয়ে তদন্তাধীন অবস্থায় ৬১ জন, জামিনে গিয়ে বিচারাধীন অবস্থায় ৮৩ জনসহ মোট ২৭৪ জন পলাতক রয়েছেন। এর মধ্যে জেএমবির ১৬৪ জন, হিযবুত তাহরীরের ৫৮ জন, এবিটির ২৪ জন, নব্য-জেএমবির আটজন, আনসার আল ইসলামের ১৩ জন, হুজিবির একজন, আল্লাহর দলের চারজন, স্বারকীয়ার একজন ও ইমাম মাহমুদের কাফেলার একজন সদস্য রয়েছেন।
গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, জামিনে থাকা জঙ্গিদের পাশাপাশি গ্রেপ্তার না হওয়া জঙ্গিরা এখন নতুন করে নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জানতে চাইলে র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সন্ত্রাসবিরোধী আইনে করা মামলায় পলাতক জঙ্গিদের গ্রেপ্তারে নিয়মিত অভিযান অব্যাহত আছে।’
গোয়েন্দা সূত্রে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণে জানা গেছে, নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গিসংগঠনগুলোর কাছে অনেক গ্রেনেড ও ভারী অস্ত্র রয়েছে। এসব অস্ত্র ব্যবহার করে এর আগেও তারা দেশে অনেক ধরনের নাশকতা চালিয়েছে। এতে বিভিন্ন সময়ে অনেক প্রাণহানি ঘটেছে।
এর মধ্যেই হঠাৎ করে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার পাশাপাশি বিমানবন্দরে জঙ্গি হামলার হুমকি পেয়ে নড়েচড়ে বসেছেন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যরা। এসব প্রতিষ্ঠান ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যদের ওপর বোমা হামলার পাশাপাশি ধারালো অস্ত্র ব্যবহারের হুমকি দেওয়া হয়েছে।
অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, পলাতক জঙ্গিরা আইন-শৃঙ্খলার জন্য গুরুতর হুমকি। তাঁরা পুনরায় সংগঠিত হয়ে উগ্রবাদী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়লে ঝুঁকি আরো বাড়বে, যা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর জন্য উদ্বেগের কারণ এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে অনিরাপত্তা তৈরি করবে।
পুলিশের গোয়েন্দা তথ্যে পলাতক ৩৭০ জঙ্গির মধ্যে ১৮৫ জন জামায়াতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি), ১৬ জন হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী (হুজিবি), ১৬ জন নব্য-জেএমবি, ৫৯ জন হিযবুত তাহরীর, ২৫ জন আনসার আল ইসলাম, ৫৮ জন আনসারুল্লাহ বাংলা টিম (এবিটি), ৯ জন আল্লাহর দল, একজন জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বিয়া (জেএএফএইচএস) এবং একজন ইমাম মাহমুদের কাফেলা থেকে রয়েছেন।
এর মধ্যে ১৩০ জনকে কখনোই গ্রেপ্তার করা যায়নি, ৬১ জন তদন্ত চলাকালে জামিন নিয়ে আত্মগোপনে গেছেন, ৮৩ জন বিচারপ্রক্রিয়ার সময় পালিয়ে গেছেন এবং ৯৬ জনের অবস্থান সম্পর্কে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
দেশের ১৬টি কারাগারে বন্দি রয়েছেন যেসব জঙ্গি : গোয়েন্দা তালিকা অনুযায়ী, গত বছরের জুন পর্যন্ত দেশের ১৬টি কারাগারে ১৬২ জন জঙ্গি বন্দি রয়েছেন। এর মধ্যে বিচারাধীন আছেন ৩২ জন, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ৫৯ জন, যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত ৪৬ জন ও অন্যান্য ২৫ জন।
টাঙ্গাইলের মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. উমর ফারুক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কারাগার থেকে ঢালাওভাবে জামিন দেওয়াসহ অন্তর্বর্তী সরকারে কিছু ঘাটতি ছিল। এর আগে জেল পলাতক ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করা গেল না। যেহেতু জঙ্গি সংগঠনের সদস্যরা চিহ্নিত ছিল, ফলে তাদের ঢালাওভাবে ছেড়ে দেওয়ায় নিজেদের মতাদর্শ নিয়ে আবারও সংগঠিত হচ্ছে তারা। এর মধ্যে সরকার পরিচালনায় যাঁরা ছিলেন তাঁরা এ বিষয়গুলোতে দৃষ্টিপাত করেননি। যার ফলে উগ্রবাদীরা সুসংগঠিত হয়ে বিভিন্ন জায়গায় হামলা চালানোর পরিকল্পনা করে সংগঠিত হচ্ছে। তারা বিভিন্ন পর্যায়ের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং জনগণের মাঝে আতঙ্ক ও উৎকণ্ঠা তৈরি করতে এরই মধ্যে নিজেদের সংগঠিত করতে শুরু করেছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘এরই মধ্যে সরকারের কাছে সংবাদ আছে, বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় স্থাপনার ব্যাপারে হুমকি রয়েছে। সরকার এ ব্যাপারে কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করছে। বিষয়টি হচ্ছে, যদি অঙ্কুরেই এসব নির্মূল করা না যায়, তাহলে পরে তা মোকাবেলা কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। আমি মনে করি, এ সরকারের যেহেতু দুই মাস হয়েছে, তারা যদি এটা নিয়ে দৃঢ়ভাবে অবস্থান নেয়, তাহলে উত্তরণের সুযোগ আছে। নাহলে সামনের দিনগুলোতে এরা সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।’