দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সামাজিক সুরক্ষা জোরদার করতে ‘ফ্যামিলি কার্ড নীতিমালা’ প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৪১ লাখ পরিবারকে এ কর্মসূচির আওতায় এনে মাসিক ২ হাজার ৫০০ টাকা ভাতা দেওয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার। প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকার এই বৃহৎ প্রকল্পকে সরকারের ‘ফ্ল্যাগশিপ’ কর্মসূচি হিসাবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এ লক্ষ্যে গৃহীত পাইলট প্রকল্প থেকে শিক্ষা নিয়ে এর সফল বাস্তবায়ন চায় সরকার। নীতিমালা তৈরিতে সঠিক উপকারভোগী নির্বাচন, নির্ভুল ডেটাবেজ ও কার্যকর ব্যবস্থাপনার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।
ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি সঠিকভাবে বাস্তবায়নের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা প্রণয়নের কাজ শুরু করতে যাচ্ছে সরকার। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে দ্রুত বৈঠক করে চূড়ান্ত দিকনির্দেশনা নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এত বড় আকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি কার্যকরভাবে পরিচালনা করতে হলে সুস্পষ্ট নীতিমালা অপরিহার্য।
অর্থ বিভাগ সূত্র জানায়, নীতিমালার মাধ্যমে উপকারভোগী নির্বাচন থেকে শুরু করে কার্ড ব্যবস্থাপনা, অর্থ বিতরণ, মনিটরিং এবং জবাবদিহি একটি কাঠামোর মধ্যে আনা হবে। এতে প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও দক্ষতা বাড়বে। প্রস্তাবিত নীতিমালার আওতায় আগামী অর্থবছরে দেশের ৪১ লাখ প্রান্তিক পরিবারকে অন্তর্ভুক্ত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হবে। প্রতিটি পরিবারকে মাসে আড়াই হাজার টাকা করে ভাতা দেওয়া হবে। এ কর্মসূচি বাস্তবায়নে আসন্ন বাজেটে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার কথা জানান সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের সরাসরি নগদ সহায়তা কর্মসূচি নিম্ন-আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়াবে, যা সামগ্রিকভাবে অভ্যন্তরীণ চাহিদা বৃদ্ধির মাধ্যমে অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। তবে কার্ড বিতরণে যাতে কোনোরকম অনিয়ম না হয়, সেদিকে বেশি নজর দিতে হবে। অতীতে টিসিবির কার্ড বিতরণ এবং করোনাকালীন নগদ অর্থ বিতরণে অনিয়ম হয়েছে। প্রকৃত উপকারভোগীরা না পেয়ে সহায়তা নিয়ে গেছেন সামর্থ্যবান কিংবা দলীয় লোকজন। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে অনিয়ম, ভুয়া ব্যক্তির অন্তর্ভুক্তি এবং প্রকৃত দরিদ্র লোক বাদ পড়ার অভিযোগ ছিল।
এদিকে বাজেট সামনে রেখে সোমবার সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ও ফ্যামিলি কার্ড নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে সমাজকল্যাণ মন্ত্রী এজেডএম জাহিদ হোসেন, সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন পুতুল, অর্থ সচিব খায়েরুজ্জামান মজুমদারসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অংশ নেন। নির্বাচনি ইশতেহার পূরণে বিএনপি সরকারের প্রধান এই কর্মসূচিটি বাস্তবায়নে সভায় নীতিমালা প্রণয়নের ওপর জোর দেন তারা।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, নীতিমালা ছাড়া সঠিক ডেটাবেজ তৈরি করা সম্ভব নয়। প্রকৃত উপকারভোগীরাই যেন এই সুবিধা পান, সেদিকেই সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে। তিনি বলেন, ফ্যামিলি কার্ড প্রকল্পকে কার্যকর করতে ডিজিটাল ডেটাবেজ তৈরির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এতে জাতীয় পরিচয়পত্র, আয়, সম্পদ ও সামাজিক অবস্থানের তথ্য ব্যবহার করে উপকারভোগীদের যাচাই করা হবে। অতীতের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, তাই এবার একটি নির্ভুল ডেটাবেজ তৈরির ওপর জোর দিচ্ছে সরকার।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, প্রযুক্তিনির্ভর যাচাই প্রক্রিয়া চালু করা গেলে দুর্নীতি ও অনিয়ম অনেকাংশে কমানো সম্ভব হবে। প্রকল্প বাস্তবায়নে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত জনবল চাওয়া হয়েছে। তবে সরকারের ভেতরে এ বিষয়ে ভিন্নমত রয়েছে। কেউ কেউ মনে করছেন, বিদ্যমান জনবল দিয়েই প্রকল্পটি পরিচালনা করা সম্ভব। এ কারণে বিষয়টি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা প্রয়োজন। শিগ্গিরই এ বিষয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ইতোমধ্যে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির পাইলট কার্যক্রম চালানো হয়েছে। এ পর্যায়ে ৩৭ হাজারের বেশি কার্ড বিতরণ করা হয়েছে। এই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে প্রকল্পের বিভিন্ন ত্রুটিবিচ্যুতি শনাক্ত করা হয়েছে।
কিছু সমস্যা শনাক্ত করা হয়েছে : সামাজিক নিরাপত্তা ও ফ্যামিলি কার্ডবিষয়ক বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন অর্থমন্ত্রী। তিনি জানান, এটি বিএনপি সরকারের ‘ফ্ল্যাগশিপ’ প্রকল্প বা প্রধান কর্মসূচি। প্রাথমিক পর্যায়ে ছোটখাটো ভুল হতে পারে। তবে ভুলের পরিমাণ এক শতাংশেরও কম। কোথাও কেউ বাদ পড়েছে কি না, আবার কেউ ভুলভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে কি না-এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। শুধু তাই নয়, ইতোমধ্যে কিছু সমস্যা শনাক্ত করা হয়েছে। সেগুলো দ্রুত সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে প্রকল্পটি আরও নির্ভুলভাবে পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে। ফ্যামিলি কার্ড প্রকল্পকে শুধু একটি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি হিসাবে নয়, বরং একটি মানবিক উদ্যোগ হিসাবেও উল্লেখ করেন অর্থমন্ত্রী। তার ভাষায়, এটি হবে নারীর ক্ষমতায়ন এবং সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দেওয়ার একটি কার্যকর মাধ্যম। অর্থমন্ত্রী স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, এই প্রকল্প বাস্তবায়নে বাজেট কোনো বাধা হবে না।