চট্টগ্রামে একের পর এক টার্গেট কিলিং চলছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নানা পদক্ষেপের পরও দমানো যাচ্ছে না সন্ত্রাসীদের। এই জেলার ১৫ উপজেলায় গত দেড় বছরে ১২৪টির মতো হত্যাকাণ্ড হয়েছে। এর মধ্যে বেশির ভাগই ‘টার্গেট কিলিং।’ সবচেয়ে বেশি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে রাউজান উপজেলায়। রোববার রাতে দুটি টার্গেট কিলিংয়ের ঘটনা ঘটে। রাউজানে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে নাসির উদ্দিন নামে এক যুবদল কর্মীকে। আর সাতকানিয়ায় শাহাদাত হোসেন নামে এক ব্যবসায়ীকে মুখোশধারী সন্ত্রাসীরা কুপিয়ে হত্যা করেছে।
আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, দখল-বেদখলকে কেন্দ্র করে সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো খুনাখুনিতে লিপ্ত। টার্গেট কিলিংয়ে একটি গ্রুপের নেতৃত্ব দিচ্ছে এইট মার্ডার মামলার দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি সাজ্জাদ আলী খান। বিদেশে বসে এই সন্ত্রাসী তার অনুসারীদের দিয়ে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করাচ্ছে।
শুক্রবার গভীর রাতে কাউসার জামান বাবলু নামে এক যুবদল কর্মী টার্গেট কিলিংয়ের শিকার হন। এর রেশ কাটতে না কাটতে রোববার রাতে নাছির উদ্দীন নামের যুবদল কর্মীকে গুলি করে হত্যা করা হয়। রাউজান উপজেলার কদলপুর ইউনিয়নের লেংগা বাইল্যার ঘাটা এলাকায় নিজ বাড়ির কাছে এ ঘটনা ঘটে। নিহত নাছির উপজেলার ৮ নম্বর কদলপুর ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের দক্ষিণ শমসের পাড়ার বাসিন্দা। পরপর দুই হত্যাকাণ্ডে রাউজানজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। নাসির যুবদলের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। স্থানীয়ভাবে তিনি বিএনপি নেতা ও রাউজানের সংসদ-সদস্য গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর অনুসারী হিসাবেও পরিচিত ছিলেন। পুলিশ ও স্থানীয়রা জানান, যুবদল কর্মী নাছির স্থানীয় একটি দোকানে আড্ডা শেষে বের হয়ে যাওয়ার পথে অজ্ঞাতনামা একদল সন্ত্রাসী হঠাৎ তার ওপর এলোপাতাড়ি গুলি ছোড়ে। এতে তার নাড়িভুঁড়ি বের হয়ে যায়। পরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। জানা যায়, গাছ, বালু, মাটির ব্যবসা ও আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দেড় বছর ধরে কদলপুর ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় দুটি সন্ত্রাসী গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে। তাদের মধ্যে প্রায়ই গোলাগুলি চলে।
স্থানীয়রা জানান, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা বাড়লে সন্ত্রাসীরা পাহাড়ে আত্মগোপন করে। নাছিরের সঙ্গেও একটি সন্ত্রাসী গ্রুপের যোগাযোগ ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের ধারণা, নাছিরের প্রতিপক্ষ গ্রুপ তাকে গুলি করে হত্যা করেছে। এ নিয়ে গত ২১ মাসে ২৩টি খুনের ঘটনা ঘটল শুধু রাউজানেই। এর বেশির ভাগ রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড। সর্বশেষ নিহত নাছির উদ্দিনের কোনো পদপদবি না থাকলেও তিনি এলাকায় যুবদল কর্মী হিসাবে পরিচিত। সোমবার বিকাল পর্যন্ত এ ঘটনায় মামলা হয়নি বলে পুলিশ জানিয়েছে।
টার্গেট কিলিংয়ের শিকার সাতকানিয়ার শাহাদাত : রোববার রাত ১১টার দিকে টার্গেট কিলিংয়ের শিকার হন সাতকানিয়ার বাসিন্দা শাহাদাত হোসেন। স্থানীয়রা জানান, রোববার দিনগত রাতে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের পাশে সাতকানিয়া মডেল মসজিদের সামনে নিজের দোকানে বসে ছিলেন শাহাদাত। এ সময় দুটি মোটরসাইকেল ও একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে ১০ থেকে ১৫ জন মুখোশধারী সন্ত্রাসী রাম দা, লাঠি, হাতুড়িসহ দেশীয় অস্ত্র নিয়ে অতর্কিতভাবে শাহাদাতের ওপর হামলা চালায়। এতে গুরুতর আহত হন তিনি। সোমবার ভোরে চট্টগ্রাম নগরীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। শাহাদাত একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। কোনো পদপদবি না থাকলেও জামায়াত কর্মী হিসাবে তিনি পরিচিত। তবে এই হত্যাকাণ্ড রাজনৈতিক কারণে না ব্যবসায়িক বিরোধে হয়েছে, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিক কিছু জানাতে পারেনি পুলিশ।
সাতকানিয়া সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আরিফুল ইসলাম সিদ্দিকী যুগান্তরকে জানান, মুখোশধারীর হামলায় শাহাদাত নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় জড়িতদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে।
২০২৪ সালের ২৯ আগস্ট নগরের বায়েজিদ বোস্তামি থানার অক্সিজেন কুয়াইশ সড়কে প্রকাশ্যে গুলি করে মাসুদ কায়সার ও মোহাম্মদ আনিস নামে দুজনকে হত্যা করে সাজ্জাদ ও তার লোকজন। এ সময় তাদের প্রত্যেকের হাতে ভারী অস্ত্র দেখা যায়। ২০২৫ সালের মে মাসে পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে শত শত মানুষের সামনে প্রকাশ্যে গুলি করা হয় ঢাকাইয়া আকবরকে। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। একই বছরের ২১ অক্টোবর চান্দগাঁও থানার অদুরপাড়া এলাকায় মাইক্রোবাসে এসে সন্ত্রাসীরা প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি করে আফতাব উদ্দিন তাহসীন নামে এক ব্যবসায়ীকে। ২০২৫ সালের ২৪ জানুয়ারি উপজেলার নোয়াপাড়া এলাকায় গ্রামের বাড়িতে জুমার নামাজ পড়তে মসজিদে যাওয়ার সময় সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হন নগরীর খাতুনগঞ্জের আড়তদার জাহাঙ্গীর আলম (৫৫)। তিনি শহর থেকে মোটরসাইকেলে বাড়িতে গিয়েছিলেন। ওই বছরের ১৯ ফেব্রুয়ারি মুহাম্মদ হাসান (৩৫) নামে এক যুবলীগ কর্মীকে ঘর থেকে তুলে নিয়ে পিটিয়ে হত্যা করে মুখোশধারী সন্ত্রাসীরা। এছাড়া ২১ মার্চ পূর্ব গুজরা ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের হোয়ারাপাড়া এলাকার মোবারক খালের পূর্ব পাশে খোলা জমি থেকে রক্তাক্ত অবস্থায় মো. রুবেল (৩৫) নামে এক তরুণের লাশ উদ্ধার করা হয়। ১৯ এপ্রিল রাতে খুন হন যুবদল কর্মী মানিক আবদুল্লাহ (৩৬)। গত বছরের ২২ এপ্রিল রাউজান উপজেলা সদরের কাছে ৮ নম্বর ওয়ার্ডের গাজিপাড়া গ্রামে খুন হন ইব্রাহিম (২৮) নামের এক যুবদল কর্মী।
জেলা পুলিশের অতিরিক্ত সুপার (শিল্প ও ডিবি) রাসেল জানান, রাউজানে ভৌগোলিক কারণে সন্ত্রাসী বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বেড়েছে। পুলিশও তৎপর রয়েছে। পুলিশ প্রতিনিয়তই সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার করছে, অস্ত্র উদ্ধার করছে। আসলে সন্ত্রাসীরা কে কোথায় কখন অপরাধ করবে আগে থেকে বলা যায় না। তিনি বলেন, এখন থেকে রাউজানে দেড়শ পুলিশ সদস্য ২০টি স্পটে চেকপোস্ট করবে। সন্ত্রাসীদের গ্রেফতারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।