সাভারের রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির এক যুগেরও বেশি সময় পার হলেও ঢাকার শ্রম আদালতে করা মামলাগুলোর কোনো সুরাহা হয়নি। মামলার বাদী কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের (ডাইফ) পরিদর্শকদের কোনো খোঁজ নেই, অন্যদিকে আসামিরাও পলাতক।
মর্মান্তিক এই ধসের পর শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও আইনি অধিকার লঙ্ঘিত হওয়ায় সরকারের পক্ষ থেকে ডাইফ বাদী হয়ে ভবনমালিক ও কারখানামালিকদের বিরুদ্ধে ১১টি ফৌজদারি মামলা করে।
আদালতের নথিপত্র অনুযায়ী, রানা প্লাজায় অবস্থিত ৫টি পোশাক কারখানা ও ভবনমালিকদের এসব মামলায় বিবাদী বা অভিযুক্ত করা হয়েছে।
মামলার কাগজপত্রে উল্লেখিত বিবাদীরা হলেন নিউ ওয়েভ বটমস লিমিটেডের বজলুস সামাদ, দেলোয়ার আহমেদ ও আব্দুস সামাদ; ফ্যান্টম এপারেলস লিমিটেডের আমিনুল ইসলাম, জাফর আহমেদ, ডেভিড মায়ের রিকো, এ বি এম সিদ্দিক ও সুরাইয়া বেগম; ফ্যান্টম ট্যাক লিমিটেডের আমিনুল ইসলাম, ডেভিড মায়ের রিকো, এ বি এম সিদ্দিক ও সুরাইয়া বেগম; নিউ ওয়েভ স্টাইল লিমিটেডের মনির হোসেন, বজলুস সামাদ, আমিনুল ইসলাম, এ আর আয়ুব হোসেন ও দেলোয়ার আহমেদ; ইথার টেক্স লিমিটেডের আনিসুর রহমান, জান্নাতুল ফেরদৌস ও মো. নজরুল ইসলাম এবং রানা প্লাজার ভবনমালিক আব্দুল খালেক ও সোহেল রানা। এই আসামিদের মধ্যে শুধু ভবনমালিক সোহেল রানা গ্রেপ্তার আছেন।
এদিকে মামলাগুলো দীর্ঘ সময় ঢাকার প্রথম শ্রম আদালতে বিচারাধীন থাকার পর ২০২৪ সালের ১৯ নভেম্বর ঢাকার দ্বিতীয় শ্রম আদালতে বদলি করা হয়। বদলিজনিত কারণে মামলায় নতুন নাম্বার সংযোজিত হয়েছে।
আদালতের সর্বশেষ নথি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৩৪০, ৩৪১, ৩৩৩, ৩৪২, ৩২৭, ২৯৯, ২৯৭ নম্বর মামলাগুলো বর্তমানে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা তামিলের অপেক্ষায় রয়েছে। এই ৭টি মামলায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা আছে এবং আগামী ২৫ আগস্ট ২০২৬ পরবর্তী শুনানির তারিখ ধার্য করা হয়েছে।
এছাড়া ২০২৪ সালের ৩২৬ নম্বর মামলাটি বর্তমানে অভিযোগ গঠনের শুনানির পর্যায়ে রয়েছে এবং এর পরবর্তী তারিখও ২৫ আগস্ট ২০২৬ ধার্য করা হয়েছে।
অন্যদিকে ২০১৩ সালে দায়ের করা ১৩৬, ১৪৭, ১৪৯ নম্বর মামলা দ্বিতীয় শ্রম আদালতে বদলি হলেও, কোর্ট রেজিস্টারে এগুলোর পরবর্তী তারিখ বা নতুন মামলা নম্বর সম্পর্কে কোনো তথ্য দিতে পারেনি।
মামলার জট ও বিচার না পাওয়ার পেছনে ডাইফের অনুপস্থিতিকেই মূল কারণ হিসেবে দেখছেন ঢাকার দ্বিতীয় শ্রম আদালতের অ্যাকাউন্ট্যান্ট এবং বর্তমানে অতিরিক্ত বেঞ্চ অফিসারের দায়িত্বপ্রাপ্ত শেখ নূর ইমাম তাপস। রানা প্লাজার মামলাগুলোর প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘মামলাগুলো ওয়ারেন্ট তামিলের জন্য পড়ে আছে। উল্লেখযোগ্য কোন স্টেপ (পদক্ষেপ) নাই। কেউ স্টেপও নেয় না মামলার, কোনো উকিলও আসে না। বাদী (ডায়েফ) যখন নিজে তদ্বির করবে না, তখন কোর্ট তো আর নিজে থেকে কিছু করতে পারবে না।’
আদালতের বর্তমান অবস্থা এবং জনবলসংকটের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে এই কর্মকর্তা বলেন, ‘আমি তো অ্যাকাউন্টেন্ট ছিলাম, আমি তো মামলার কিছুই বুঝি না। আমাকে দিয়ে এখন হাতুড়ে ডাক্তার দিয়ে অপারেশন করানোর মতো অবস্থা তৈরি হয়েছে। মামলার ব্যাপারে তো আমার কোনো ধারণাই নেই।’
তিনি জানান, বর্তমানে এই একটি আদালতেই ইসলামী ব্যাংক, গ্রামীণফোন, শেভরনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৭ হাজার মামলা ঝুলছে। তিনি হিসাব কষে দেখান, মাসে ২৪ কর্মদিবস ধরলে প্রতিদিন গড়ে ২৯০টির ওপরে মামলা আদালতে তুলতে হয়। প্রতিটি মামলায় বিচারক অন্তত ২ মিনিট করে সময় দিলেও প্রতিদিন প্রায় ১০ ঘণ্টা টানা এজলাসে বসে থাকতে হবে, যা বাস্তবে অসম্ভব।
রানা প্লাজার আটকে থাকা মামলাগুলো কীভাবে সচল করা যায়—এমন প্রশ্নের জবাবে অতিরিক্ত বেঞ্চ অফিসার তাপস বলেন, ‘মামলাগুলোতে যারা জামিন নিয়েছিল, তারা তো আর উপস্থিত হয় না। তাদের উপস্থিতির জন্য ওয়ারেন্ট করা আছে, কিন্তু তা তামিল হয়নি। এখন আমরা নেক্সট ডেটে মামলাটা উঠিয়ে ফ্রেশ ওয়ারেন্ট দেওয়ার ব্যবস্থা করব অথবা সংশ্লিষ্ট ওসিকে তাগিদপত্র দেব। তবে তাগিদ দেওয়ার চেয়ে ফ্রেশ ওয়ারেন্ট দিলেই ভালো হবে। এক্ষেত্রে ডাইফের ইন্সপেক্টরদের কিছু করার নেই, তারা শুধু খোঁজ নিতে পারেন।’
রানা প্লাজা ধসের ভয়াবহ স্মৃতিচারণা করে এই কর্মকর্তা বলেন, ‘বিচার খুব কঠিন জিনিস। যতক্ষণ চোখের সামনে থাকবেন, ততক্ষণই ভালোবাসা, তারপরে আর থাকে না। আমাদের তো ওই জায়গায় দড়ি দিয়ে পা বাঁধা। আমরা সময় বিক্রি করে দিয়েছি সরকারের কাছে, নয়টা-পাঁচটা ডিউটি। এর বাইরে কিছু করার ক্ষমতা আমাদের নেই।’
শ্রম আদালতে দায়ের করা ১১টি মামলার তদারকি ও অগ্রগতি প্রসঙ্গে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের আইন কর্মকর্তা মো. মাছুম বিল্লাহ স্ট্রিমকে বলেন, ‘মামলাগুলোতে ঢাকার ডিআইজি ও সংশ্লিষ্ট ইন্সপেক্টরদের হাজির থাকার নির্দেশনা দেওয়া আছে। অনেক সময় তারা উপস্থিত না থাকলে দপ্তর থেকে ফোন করে তাদের উপস্থিত থাকার বিষয় জানিয়ে দেয়া হয়।’
তবে ১১টির মধ্যে ৩টি মামলার নথির কোনো হদিস না পাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘আদালত স্থানান্তর (কোর্ট চেঞ্জ) হওয়ার কারণে এই নথিগুলো পাওয়া যাচ্ছে না বলে কোর্টের রেজিস্ট্রার মহোদয়ের কাছ থেকে জেনেছি; এগুলো এখন আমাদের খুঁজতে হবে।’
নিজস্ব আইনজীবীর অনুপস্থিতি ও মামলার বিচারিক কার্যক্রম প্রসঙ্গে তিনি জানান, ফৌজদারি মামলাগুলোতে অধিদপ্তরের পরিদর্শকরাই (ইন্সপেক্টর) হাজির থেকে আইনি লড়াই করেন। কিছু মামলার আসামি পলাতক থাকায় আদালতের নির্দেশে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেও তাদের পাওয়া যায়নি।