Image description

ছাত্রশিবিরকে উদ্দেশ করে ‘গুপ্ত’ শব্দ ব্যবহার ও ক্যাম্পাসে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কয়েকদিন ধরে মুখোমুখি ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির। চট্টগ্রাম সিটি কলেজের সংঘর্ষের রেশ কাটতে না কাটতেই গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর শাহবাগ, পাবনার ঈশ্বরদী সরকারি কলেজ ও কুমিল্লা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে দুই পক্ষের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়েছে। শাহবাগের ঘটনার পর ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাল্টাপাল্টি বিক্ষোভ ও শোডাউন করেছে ছাত্রদল-ছাত্রশিবির।

এ নিয়ে বিরোধে জড়িয়েছে তাদের অভিভাবক সংগঠন বিএনপি ও জামায়াত। বিষয়টি গড়িয়েছে জাতীয় সংসদেও। গত বুধবার এ নিয়ে সংসদে বাগবিতণ্ডায় জড়ান দুই দলের নেতারা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও উত্তপ্ত বিষয়টি ঘিরে। গুপ্ত রাজনীতি নিষিদ্ধের পাশাপাশি ছাত্রশিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিও তুলছেন ছাত্রদলের অনেকে। টানা উত্তেজনা ও পাল্টাপাল্টি অনড় অবস্থানের কারণে পরিস্থিতি আরও অবনতির আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে যে কোনো সময় বড় ধরনের সংঘাতে রূপ নিতে পারে বলেও ধারণা তাদের। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে যে বৈরী সম্পর্ক তৈরি হয়েছে, তা সহজে মিটবে না। বরং দিন যত গড়াবে সম্পর্কের আরও অবনতি হবে। এতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অস্থিতিশীল হওয়ার পাশাপাশি সরকারকেও চাপে ফেলবে।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় ছাত্রদল-ছাত্রশিবিরসহ অন্যরা একসঙ্গে আন্দোলন করে আওয়ামী লীগ সরকারকে বিতাড়িত করলেও সেই পথচলা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচন ও জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেন্দ্র করে রিপরীতমুখী অবস্থানে চলে যায় দল দুটি। তুচ্ছ ঘটনা কেন্দ্র করে নানা সময় হামলা-পাল্টা হামলা হয়। তবে সর্বশেষ চট্টগ্রাম সিটি কলেজে দেয়ালে ‘গুপ্ত’ গ্রাফিতি লেখাকে কেন্দ্র করে ছাত্রদলের সঙ্গে ছাত্রশিবিরের দফায় দফায় সংঘর্ষের রেশ ছড়িয়ে পড়েছে সারা দেশে। এরপর ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, কুমিল্লা, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বড় বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজগুলোতে ছাত্রদল দেয়ালে দেয়ালে ‘গুপ্ত’ গ্রাফিতি আঁকে। ক্যাম্পাসের বাইরেও জেলা-উপজেলায় ছাত্রদল-শিবির পাল্টাপাল্টি হামলার অভিযোগ এনে বিক্ষোভের পাশাপাশি বুধবার জাতীয় সংসদে এ বিষয় নিয়ে সরকারি দল ও বিরোধী দলের নেতাদের মধ্যে বাগবিতণ্ডা হয়।

এ ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে গতকাল পাবনার ঈশ্বরদী সরকারি কলেজে ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে উভয়পক্ষের বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সকাল থেকেই ক্যাম্পাস এলাকায় উভয়পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছিল। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ছাত্রশিবিরের একটি মিছিল কলেজ গেটের সামনে পৌঁছালে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়।

ঈশ্বরদী উপজেলা ছাত্রশিবিরের সভাপতি সজীব হাসান বলেন, আমাদের পূর্বনির্ধারিত বিক্ষোভ কর্মসূচির জন্য কলেজ কর্তৃপক্ষ ও পুলিশ প্রশাসনের অনুমতি নেওয়া ছিল। মিছিল নিয়ে কলেজ গেটের সামনে পৌঁছামাত্র ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা আমাদের ওপর অতর্কিত ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে।

অন্যদিকে ঈশ্বরদী সরকারি কলেজ ছাত্রদলের সহসভাপতি ইমরান হোসেন খান পাল্টা অভিযোগ করে বলেন, আমরা শান্তিপূর্ণভাবে ক্যাম্পাসে অবস্থান করছিলাম। হঠাৎ শতাধিক শিবিরকর্মী বহিরাগতদের নিয়ে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ক্যাম্পাসে ঢুকে আমাদের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা চালায়। তারা কলেজ গেটের সামনে আমাদের একটি অস্থায়ী কার্যালয়ও ভাঙচুর করেছে।

এদিকে প্রধানমন্ত্রীর মেয়ে জাইমা রহমানকে কটূক্তির প্রতিবাদে গতকাল সন্ধ্যার পর শাহবাগে অবস্থান নেন ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। এ সময় তারা শিবিরের বিরুদ্ধে নানা স্লোগান দেন। এক পর্যায়ে ডাকসু নেতা এ বি জুবায়ের ও মুসাদ্দিকের নেতৃত্বে ছাত্রশিবিরের কর্মীরা শাহবাগ থানায় যাওয়ার পথে তাদের মারধর করা হয়। হামলার মুখে থানার ভেতরে আশ্রয় নেন ডাকসু নেতা মুসাদ্দিক ও জুবায়ের। অভিযোগ রয়েছে, ঢাবি শিবির নেতা আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ প্রধানমন্ত্রীর মেয়ে জাইমা রহমানকে কটূক্তি করে একটি ফটোকার্ড ফেসবুকে শেয়ার দিয়েছেন। তবে অভিযুক্ত ঢাবি শিবির নেতা বলছে, সেটি ভুয়া। সেজন্য তিনি থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে এসেছেন।

এর বাইরে গত কয়েকদিনে রাজশাহী, কুড়িগ্রাম, নরসিংদীসহ বিভিন্ন জায়গায় সংগঠন দুটির মধ্যকার বিরোধে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। ঢাবির বেশ কয়েকটি হলে ‘গুপ্ত’ দেয়াললিখন ঘিরে ছাত্রশিবির ও ছাত্রদলের মধ্যে বুধবার উত্তেজনা সৃষ্টি হয়।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে (জবি) ছাত্রদলের আহ্বায়ক মেহেদী হাসান হিমেল বলেন, আজ যারা শিবির পরিচয়ে ঘুরছে তারা আসলে ছাত্রলীগ ছিল। এরা মূলত হল বাণিজ্য, শ্লীলতাহানি ও সব অপকর্মের সঙ্গে জড়িত। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে এসব গুপ্ত রাজনীতির বিচারের দাবি জানাচ্ছি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি সাদিক কায়েম বলেন, সুশীল কথা বলে ক্যাম্পাসগুলোতে সন্ত্রাসীদের লেলিয়ে দিচ্ছে সরকার। দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সরকার নব্বইয়ের পুরোনো কালচার ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করলে শিবির তা মোকাবিলা করবে।

সার্বিক বিষয়ে ছাত্রশিবিরের সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম হোসেন অভিযোগ করেন, ‘জাতীয় নির্বাচনের পর তাদের (ছাত্রদল) রাজনৈতিক কোনো এজেন্ডা নেই। অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের কমিটি নেই। আবার কেন্দ্রীয় কমিটিসহ প্রায় সব কমিটির মেয়াদ উত্তীর্ণ। তাই ক্যাম্পাসে আগে সরকারি দল যেভাবে ক্ষমতা প্রয়োগ করত, এখন ছাত্রদল তা করছে। তারা তাদের ক্ষমতার প্রভাব দেখানোর জন্য ছাত্রদল এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করছে। ছাত্রদল নিজেরা হামলা করে আবার প্রতিবাদে বিক্ষোভ করছে। ছাত্রলীগের মতো ছাত্রদলেরও চরিত্র ফ্যাসিবাদী হয়ে উঠছে।’

দলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির বলেন, ‘ভবিষ্যতে আমাদের দিক থেকে কোনো সংঘাত হবে না। তারা আমাদের গ্রাফিতি কর্মসূচির পরিবর্তে অন্য কোনো কর্মসূচি দিতে পারত। কিন্তু তা না করে একের পর এক উসকানিমূলক কাজ করে যাচ্ছে। আজকেও (গতকাল) পাবনার ঈশ্বরদীতে তারা ঝামেলা করেছে। চট্টগ্রামের সিটি কলেজেও তারা সংঘাতে জড়িয়েছে। ছাত্রদল এই জায়গায় সহনশীল ভূমিকা পালন করছে। আমাদের সংগঠন থেকেও সহনশীল ভূমিকা পালন করার নির্দেশনা রয়েছে।’

এই পরিস্থিতি চলমান থাকলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অস্থিতিশীল হয়ে উঠবে বলে ধারণা কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিনির্ধারকদের। তারা বলেন, আওয়ামী লীগের শেষদিকে ক্যাম্পাসগুলোতে ছাত্রলীগের একক আধিপত্য থাকায় বিরোধী দলগুলো ক্যাম্পাসে খুব একটা সুবিধা করতে পারেনি। ওই সময় ছাত্রলীগের নিজেদের মধ্যে সংঘাতের পাশাপাশি বিরোধী দলের সঙ্গে খুব একটা সংঘাত হয়নি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ছাত্রদল এবং শিবির দুই সংগঠনই শক্তিশালী অবস্থানে থাকায় কেউ কাউকে ছাড় দিচ্ছে না।

একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য কালবেলাকে বলেন, ‘ছাত্র সংসদগুলোতে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পর মূলত শিবির ব্যাপক শক্তিশালী ও আত্মবিশ্বাসী হয়েছে। তারা ছাত্রদলকে কোনো কিছুতে ছাড় দিতে চায় না। এই অবস্থা চললে আগামীতে ক্যাম্পাসগুলো অস্থিতিশীল হওয়ার পাশাপাশি বড় সংঘাতের আশঙ্কা রয়েছে। এতে শিক্ষার পরিবেশ ব্যাঘাত ঘটবে।’

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাহাবুল হক বলেন, ‘‘ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে এই বিরোধের কারণ হিসেবে ‘গুপ্ত’ শব্দ ব্যবহারকে বলা হচ্ছে, আসলে এটা কোনো বিষয় নয়। মূলত আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করেই এই সংঘাত হচ্ছে। সবাই তার ক্ষমতা প্রকাশ করতে চচ্ছে। এটা দুঃখজনক। এই সংকট দূর করতে বিএনপি-জামায়াতকে এগিয়ে আসতে হবে। শিক্ষার্থীরা যাতে নির্ভয়ে তাদের শিক্ষাজীবন শেষ করতে পারে সেই বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।’’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান কালবেলাকে বলেন, ‘ছাত্রদল ও শিবিরের মধ্যে যে অস্থিরতা আছে তা কিন্তু প্রকাশ্য। এভাবে চলতে থাকলে ক্যাম্পাসগুলো অস্থিতিশীল হয়ে পড়বে। তাদের এই অস্থিরতা দেশ-জাতির জন্য ভালো নয়।’

ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি ও জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, ‘ছাত্রদল ও ছাত্র শিবিরের এই সংঘাতের শেষ কোথায় তা বলা মুশকিল। তবে শুরু যে হয়ে গেল, এটা অনাকাঙ্ক্ষিত। সরকারি দলের ছাত্র সংগঠনের সংযত আচরণ করার কথা, কিন্তু তা না করে তারা ছাত্রলীগ স্টাইলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দখল করতে উন্মুখ হয়ে আছে। আধিপত্য, দখলদারত্ব বাদ দিয়ে তাদের রাজনীততে গুণগত পরিবর্তন আনতে হবে।’

এ বিষয়ে ছাত্রদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি ও বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি বলেছেন, জুলাই অভ্যুত্থানের পর জাতি আর আগের মতো আক্রমণাত্মক ছাত্র রাজনীতি দেখতে চায় না, যা ফ্যাসিবাদী শাসন ব্যবস্থার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। উভয়পক্ষের মধ্যে ঐকমত্য গড়ে তোলা প্রয়োজন যে, দেশের স্বার্থে এমন আক্রমণাত্মক ছাত্র রাজনীতি আর গ্রহণযোগ্য নয়। রাজনৈতিক মতাদর্শ ভিন্ন হতে পারে, তবে সব রাজনৈতিক নেতার লক্ষ্য হওয়া উচিত দেশের বৃহত্তর স্বার্থে কাজ করা।