Image description

দরকষাকষির পর দুটি সংরক্ষিত নারী আসন ভাগে পেয়েছিল এনসিপি, কিন্তু আইনের মারপ্যাঁচে তার একটি হাত থেকে ফসকাতে চলেছে। আসন বাঁচাতে তাই আইনকেই চ্যালেঞ্জ করতে চায় দলটি, নামতে চায় আইনি লড়াইয়ে।

জোটের শরিক হিসেবে এনসিপিকে একটি আসন ছেড়েছে জামায়াত। সেটির জন্য মনোনয়ন পেয়েছেন এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের যুগ্ম মুখ্য সংগঠক ডা. মাহমুদা মিতু।

আর আসন সংখ্যার অনুপাতে জাতীয় সংসদের যে সংরক্ষিত নারী আসন পেয়েছিল এনসিপি, তার বিপরীতে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছিলেন মনিরা শারমিন ও নুসরাত তাবাসসুম। কিন্তু যাচাই-বাছাইয়ে কারোটিই পায়নি বৈধতা।

ফলে ওই আসনটি হারানোর শঙ্কা তৈরি হয়েছে জোটের। আর যদি হারিয়েই যায়, তাহলে সংরক্ষিত নারী আসনে থাকবেন এনসিপির সেই একজন প্রতিনিধিই। জোটের সঙ্গে বৈঠকের পর আলোচনা করে পাওয়া আরেকটি আসন হয়ে যাবে হাতছাড়া। তাই যেভাবেই হোক লড়াই করে আসনটি বাঁচানোই এখন এনসিপির একমাত্র লক্ষ্য।

বৃহস্পতিবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের মনোনয়নপত্র বাছাই শেষে নির্বাচন কমিশন বাতিল করে এনসিপির প্রার্থী মনিরা শারমিনের মনোনয়ন। রাষ্ট্রায়ত্ত বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের চাকরি ছাড়ার পর জনপ্রতিনিধি হওয়ার দৌড়ের মাঝখানে তিন বছর পূর্ণ না হওয়ায় তাকে করা হয় অযোগ্য ঘোষণা।

রিটার্নিং কর্মকর্তা এবং নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের যুগ্ম সচিব মো. মঈন উদ্দিন খান বলছিলেন এ বিষয়ে বিস্তারিত।

যাচাই-বাছাইয়ের সময়ই মনিরা শারমিনের নথিতে কিছু ঘাটতি দেখা গিয়েছিল জানিয়ে তিনি বললেন, ‘নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সেগুলো জমা দেওয়া হলেও আইনি বাধা কাটেনি। কারণ গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২-এর ১২(১)(চ) ধারা অনুযায়ী, কোনো সংবিধিবদ্ধ সরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তি চাকরি ছাড়ার পর কমপক্ষে তিন বছর পার না হলে তিনি নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারেন না। মনিরা শারমিনের ক্ষেত্রে এই সময়সীমা পূর্ণ হয়নি।’

২০২৫ সালের মার্চে এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়কের দায়িত্ব পান মনিরা শারমিন। যখন তিনি এই দায়িত্ব পালন শুরু করেন, তখন তিনি সরকারি চাকরি করছিলেন। ২০২৩ সালের নভেম্বরে মনিরা যোগ দিয়েছিলেন বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের অফিসার (জেনারেল) পদে। দুই বছর পর গত ডিসেম্বরে চাকরি ছাড়েন তিনি।

অথচ সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালা অনুযায়ী, কেউ একই সঙ্গে করতে পারেন না সরকারি চাকরি ও রাজনীতি। এটি শৃঙ্খলাপরিপন্থি অপরাধ। একই নিষেধাজ্ঞা রয়েছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের নিজস্ব চাকরি প্রবিধানমালাতেও।

সেখানে স্পষ্ট উল্লেখ আছে, ব্যাংকের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে পারবেন না, নির্বাচনে অংশগ্রহণ বা প্রচারে যুক্ত হতে পারবেন না। অথচ মনিরা এর সবই করেছেন। ডিসেম্বরে চাকরি ছেড়ে পরের বছর এপ্রিলেই সংরক্ষিত নারী আসনে এমপি হওয়ার জন্যও করেছেন দৌড়ঝাঁপ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা আটকে গেছে।

 

মনোনয়ন বাতিলের প্রতিক্রিয়ায় মনিরা শারমিন জানালেন, তিনি আইনজীবীর পরামর্শ নিয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে করবেন আপিল। তার আইনজীবী নাজমুস সাকিবও রবিবার নির্বাচন কমিশনে আপিল করার কথা করলেন নিশ্চিত।

প্রার্থিতা ফিরে পাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদ তাদের দুজনেরই।

 

অন্যদিকে, এনসিপির আরেক প্রার্থী নুসরাত তাবাসসুমের মনোনয়নও জটিলতায় পড়েছে। গত ২১ এপ্রিল নির্ধারিত সময় বিকেল ৪টা ১৯ মিনিটের পর জমা দেওয়া হয় তার মনোনয়নপত্র। কিন্তু সেটি গ্রহণ করেনি নির্বাচন কমিশন। কারণ বিধি অনুযায়ী নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলে গ্রহণযোগ্য হয় না আবেদন।

এতসব বিধিবহির্ভূত কাজের পরও হাল ছাড়ছেন না এনসিপির নেতারা। দুই প্রার্থীকেই দলের পক্ষ থেকে সব ধরনের আইনি সহায়তা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তারা।

এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব (দপ্তর) সালেহ উদ্দিন সিফাত আগামীর সময়কে বললেন, ‘মনিরার জন্য নির্বাচন কমিশনের আপিল করা হবে ট্রাইব্যুনালে। তবে নুসরাতের ক্ষেত্রে ট্রাইব্যুনালে আপিলের সুযোগ না থাকায় তাকে রিট করতে হবে সরাসরি হাইকোর্টে। আদালত নির্দেশ দিলে তার মনোনয়ন যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেবে কমিশন। এই আসনটি থাকবে এনসিপিরই। আমরা প্রস্তুত আইনি লড়াইয়ের জন্য।’

এই সিদ্ধান্তের ফলে জামায়াত জোটের সংরক্ষিত নারী আসন একটি কমে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। আর এই আসনের জন্য নতুন করে ভোট হলে লাভবান হতে পারে ক্ষমতাসীন বিএনপি জোট।

এই আসনটি শূন্য হলে কী হবে— এমন প্রশ্ন ছিল সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা ও ইসির উপসচিব মো. মনির হোসেনের কাছে।

তিনি বললেন, ‘যদি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোনো আসন শূন্য থাকে তাহলে পরে তা উন্মুক্ত হয়ে যাবে। জাতীয় সংসদ (সংরক্ষিত মহিলা আসন) নির্বাচন আইন, ২০০৪ অনুযায়ী তখন সেই আসনের নির্বাচনে সব জোট প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ পাবে।

নির্বাচন কমিশনের তফসিল অনুযায়ী, সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে আগামী ১২ মে। যাচাই-বাছাই শেষ হবে ২৩ এপ্রিল এবং ২৯ এপ্রিল পর্যন্ত থাকবে মনোনয়ন প্রত্যাহারের সুযোগ। আপিলের তারিখ ২৬ এপ্রিল, যা নিষ্পত্তি হবে ২৭ ও ২৮ এপ্রিল।