Image description

রাজধানীর আশুলিয়ার একটি পোশাক কারখানায় প্রায় ১৬ বছর ধরে চাকরি করছেন আলতাফ হোসেন। কারখানার পাশেরই একটি ভাড়া বাসায় থাকেন স্ত্রী ও এক ছেলে নিয়ে। কিন্তু জিনিসত্রের দাম যে হারে বেড়েছে সে হারে বেতন-ভাতা না বাড়ায় পড়েছেন চাপে। এর মধ্যে জ্বালানির দাম বাড়ায় আলতাফের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার অবস্থা। আসন্ন ‘উচ্চ মূল্যস্ফীতির’শঙ্কায় নিয়েছেন ‘কঠিন’সিদ্ধান্ত। চিন্তা করছেন স্ত্রী-সন্তানকে পাঠিয়ে দেবেন গ্রামের বাড়িতে। এখন শুধু ছেলের এসএসসি পরীক্ষা শেষ হওয়ার অপেক্ষা।

আলতাফের স্ত্রী-সন্তান বাড়ি পাঠানোর পরিকল্পনা মনে করিয়ে দেয় করোনা মহামারীকালের স্মৃতি। লকডাউন উঠে যাওয়ার পর ঢাকাসহ বড় শহরগুলো থেকে নেমেছিল গ্রামমুখী মানুষের ঢল। সে সময়ও জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়, নিরাপত্তাহীনতা ও চাকরির অভাবে বহু মানুষ ফিরে গিয়েছিলেন নিজেদের গ্রামে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবেই ২০২৩ সালে গ্রামে ফিরেছিলেন প্রতি এক হাজার জনের মধ্যে ১৩ দশমিক ৮ জন।

আলতাফ অবশ্য টিকে গিয়েছিলেন সে সময়। খেয়ে-না খেয়ে ছেলের ভবিষ্যতের কথা ভেবে গ্রামে পাঠাননি স্ত্রী-সন্তান। কিন্তু এবার পারছেন না আর। তার শঙ্কা, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রভাব নিত্যদিনের জীবনযাত্রায় পড়তে শুরু করলে টিকে থাকাই কঠিন হবে পরিবার-পরিজন নিয়ে।

আলতাফের আশঙ্কা যে অমূলক নয় তার সমর্থন মিলল অর্থনীতিবিদদের কণ্ঠেও। মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষ কষ্ট পাবে সেটাও বললেন তারা। অবশ্য এ কষ্টকে বৈশ্বিক পরিস্থিতি কারণে সৃষ্ট উল্লেখ করে দিলেন সহ্য করার পরামর্শ। পাশাপাশি সরকারকে বললেন, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর কর্মসূচিগুলো সচল রাখতে।

গত ৮ এপ্রিল বিশ্বব্যাংক তাদের বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট প্রতিবেদনে বলেছে, টানা তিন বছর মন্থর প্রবৃদ্ধি, ক্রমবর্ধমান দারিদ্র্য এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে দিশেহারা বাংলাদেশের অর্থনীতি। এর ওপর মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আরও জটিল করে তুলেছে পরিস্থিতি।

গেল ফ্রেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া ওই সংকটের কারণে শুধু মার্চ মাসেই জ্বালানি তেল আমদানিতে সরকারকে ভর্তুকি দিতে হয়েছে ৫ হাজার কোটি টাকা। চলতি মাসের প্রথমার্ধেও ছিল সে প্রবণতা। এতে চাপ পড়েছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভেও। আর শনিবার দাম বাড়ানোর ঘোষণায় প্রত্যক্ষ চাপ সৃষ্টি হয়েছে সাধারণ মানুষের ওপর। জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বেড়ে দেখা দিয়েছে উচ্চ মূল্যস্ফীতির শঙ্কা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বালানির দাম বাড়লে প্রথমেই খরচ বাড়ে পরিবহনে। এরপর ব্যয় বাড়ে শিল্প উৎপাদন, কৃষি সেচ এবং সরবরাহ ব্যবস্থায়। ফলে বাড়তে শুরু করে পণ্য ও সেবার দাম। বাড়ে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি, যার সবচেয়ে বড় শিকার হন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির লোকজন। জীবনযাত্রার ব্যয় হু হু করে বাড়লেও আয় থমকে থাকে একই জায়গায়।

রবিবার আলতাফ আগামীর সময়কে শোনাচ্ছিলেন তার চাকরিজীবনের আয়-ব্যয়ের হিসাব, ‘৮ হাজার টাকায় চাকরিতে ঢুকেছিলাম। প্রতি বছর ইনক্রিমেন্ট এবং পাঁচ বছর পরপর একবার সরকারি গেজেট অনুযায়ী বাড়তি কিছু টাকা এবং ওভারটাইম মিলে আয় করি মাসিক ৩২ হাজার টাকা। কিন্তু আগে ১০ হাজার টাকায় যা কিনতে পারতান, এখন ৩২ হাজার টাকাও সে পরিমাণ জিনিসপত্র মিলছে না।’ আলতাফের এ হিসাবের মধ্যেই উঠে আসে মূল্যস্ফীতির রূঢ় বাস্তবতা। নতুন করে মূল্যস্ফীতি বাড়লে আলতাফদের মতো মানুষ পড়বেন আরও চাপে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য বলছে, মার্চ মাসে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ; এর মধ্যে খাদ্যে ৮ দশমিক ২৪ এবং খাদ্যবহির্ভূত পণ্যে মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ০৯ শতাংশে।

আরেক সরকারি প্রতিষ্ঠান পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি) তাদের সাম্প্রতিক সময়ের এক প্রতিবেদনে শাকসবজি ও ফলের দাম বাড়ায় মূল্যস্ফীতির চাপ তীব্র হচ্ছে বলে উল্লেখ করেছে। জিইডির ভাষ্য, ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি মজুরি বৃদ্ধির হারকে ছাড়িয়ে যাওয়ায় চাপ পড়েছে প্রকৃত আয়ের ওপর।

এমন পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞদের শঙ্কা, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি মূল্যস্ফীতিকে আরেক ধাপ উসকে দেবে। তবে বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় জনসাধারণকে বিষয়টি মেনে নেওয়ার পরামর্শও দিলেন তারা।

জিইডির সদস্য (সচিব) ড. মঞ্জুর হোসেন আগামীর সময়কে জানালেন, জ্বালানি তেলে প্রচুর ভর্তুকি দিতে হচ্ছে সরকারকে। তাই দামের সামান্য সমন্বয় করেছে সরকার।
তার দাবি, সরকার এতদিন প্রায় ২০০ টাকা দরে তেল কিনে বিক্রি করেছে ১৩০ টাকায়। তার মানে প্রচুর ভর্তুকি দিতে হয়েছে সরকারকে। অবশ্য যে কারণে বা যেভাবেই দাম বাড়ুক তার সরাসরি প্রভাব বাজারে পড়বে, মানুষ কষ্ট পাবে বলেও স্বীকার করলেন ড. মঞ্জুর।
বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন জ্বালানির দাম বাড়ানোকে যৌক্তিক বললেও তার আশঙ্কা এরই মধ্যে মজুদদারের কবজায় যাওয়া জ্বালানি। তার ভাষ্য, সরকার বেশি দামে কিনে কম দামে বিক্রি করায় মজুদদাররা প্রচুর মজুদ করেছে। কালোবাজার থেকে মানুষ উচ্চ দামে জ্বালানি কেনায় মূল্যস্ফীতি বেড়েছে, বাড়বে আরও।
জাহিদ হোসেন মনে করেন, সরকারের হাতে বেদনাবিহীন বিকল্প কিছু নেই। সরকার যাই করুক বেদনা আছেই। বর্তমান আন্তর্জাতিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে সেটা মেনে নিতে হবে মানুষকে।
অবশ্য জাহিদ হোসেনের পরামর্শ, ‘সরকারের উচিত, যাদের জ্বালানির দাম বৃদ্ধির অভিঘাত সহ্য করার সক্ষমতা নেই তাদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতা বাড়ানোসহ টিসিবির মাধ্যমে পণ্য বিক্রির মতো কর্মসূচিগুলো সচল রাখা। শুধু তা-ই নয়, প্রয়োজনে এমন তৎপরতা আরও বাড়ানোর কথা বললেন জাহিদ হোসেন।