Image description

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা খাতে দীর্ঘদিন ধরে চলা আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির একটি বিস্তৃত চিত্র উঠে এসেছে সাম্প্রতিক অভ্যন্তরীণ অডিটে। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা (ডিআরআরও) এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাদের (পিআইও) বিরুদ্ধে অব্যয়িত সরকারি অর্থ কোষাগারে জমা না দিয়ে আত্মসাতের অভিযোগ পাওয়া গেছে। ইতোমধ্যে প্রায় ১৫ কোটি টাকার অনিয়ম শনাক্ত করে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়।

মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এসব দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ডিপার্টমেন্টাল প্রসেস (ডিপি), বিভাগীয় মামলা রুজু করা এবং দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) দিয়ে অধিকতর তদন্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে মন্ত্রণালয়।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু আমার দেশকে বলেন, এগুলো আমার কাজ নয়। বিষয়গুলো সচিব দেখেন। তার সঙ্গে যোগাযোগ করুন।

এ প্রসঙ্গে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব সাইদুর রহমান খান আমার দেশকে বলেন, যারা অব্যয়িত টাকা জমা দেয় না, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে ২৯ কর্মকর্তাকে শোকজ করা হয়েছে এবং পর্যায়ক্রমে সবার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হবে। প্রয়োজনে বিষয়গুলো দুদকে পাঠিয়ে তদন্ত করা হবে বলেও জানান তিনি।

সরকারি বিধি অনুযায়ী কোনো প্রকল্পের বরাদ্দকৃত অর্থ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ব্যয় না হলে তা ৩০ জুনের পর সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, অনেক ডিআরআরও এবং পিআইও এ নিয়ম মানছেন না। বরং বছরের পর বছর অব্যয়িত অর্থ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে দিচ্ছেন, যা সরাসরি আর্থিক অনিয়মের শামিল। এসব অর্থের মধ্যে রয়েছে সাধারণ রিলিফ (জিআর), টেস্ট রিলিফ (টিআর), কাজের বিনিময়ে খাদ্য (কাবিখা), কাজের বিনিময়ে টাকা (কাবিটা) এবং হতদরিদ্রদের গৃহ নির্মাণ প্রকল্পের বরাদ্দ। এর ফলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা খাতে অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও আর্থিক বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে।

অডিট প্রতিবেদনে দেখা গেছে, মন্ত্রণালয়ে বর্তমানে তিন হাজার ২৪টি অডিট আপত্তি জমা রয়েছে, যার মধ্যে ৯৩০টি অত্যন্ত গুরুতর। সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, সারা দেশে ৩০০ থেকে ৪০০ জন পিআইও এবং ডিআরআরও এ অনিয়মের সঙ্গে জড়িত। ইতোমধ্যে ২৯ কর্মকর্তাকে শোকজ করা হয়েছে। বাকিদের ক্ষেত্রে অনুরূপ ব্যবস্থা নিতে কঠোর অবস্থানে মন্ত্রণালয়।

অডিট রিপোর্ট অনুযায়ী, ৮২৮টি আপত্তির বিপরীতে প্রায় ১২ কোটি ৯৮ লাখ টাকা এবং আরো ১৩২টি আপত্তির বিপরীতে প্রায় তিন কোটিসহ মোট ১৬ কোটি টাকার অডিট আপত্তি ঝুলে আছে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, নির্দিষ্ট কিছু এলাকা এ অনিয়মের শীর্ষে রয়েছে, যার মধ্যে হবিগঞ্জের মাধবপুরে সর্বোচ্চ তিন কোটি ৬৭ লাখ টাকার গরমিল পাওয়া গেছে। এছাড়া চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলায় ৪০ লাখ টাকা, বাগেরহাটের মোড়েলগঞ্জে ৩৩ লাখ টাকা, বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জে ২৩ লাখ টাকা, মাগুরা জেলায় সাড়ে চার লাখ টাকা, বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়িতে এক লাখ টাকা এবং ফেনীর পরশুরামে আট লাখ ও সদরে দেড় লাখ টাকা।

অডিটসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে আমার দেশকে বলেন, জিআর, টিআর ও দরিদ্রের গৃহ নির্মাণ প্রকল্পের টাকা ডিসির মাধ্যমে ইউএনও ও পিআইও অথবা ডিআরআরওদের অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করা হয়। সমুদয় অর্থ যৌথ হিসাবে জমা থাকে। কিন্তু পিআইওরা নিয়মনীতি মানেন না। অনেক ক্ষেত্রে আয়কর ও ভ্যাট কম দেখানো হয় এবং অব্যয়িত অর্থ সরকারি কোডে জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে গড়িমসি করা হয়। এসব কর্মকাণ্ড স্পষ্টত দুর্নীতির পর্যায়ে পড়ে।

অডিট শাখার যুগ্ম সচিব ড. জিল্লুর রহমানের কাছে এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি মন্তব্য করতে অপরগতা প্রকাশ করেন। আমার দেশকে তিনি জানান, এসব বিষয়ে কথা বলা তার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এগুলো প্রশাসনিক জটিলতা, সমন্বয়হীনতা এবং দায়িত্ব এড়ানোর সংস্কৃতি।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, অনেক সময় ফাইলের সিদ্ধান্তকে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়। ছোটখাটো বিষয়ে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেওয়ার নীতি থাকার ফলে বড় অনিয়মগুলোও ধামাচাপা পড়ে যায়।

এদিকে মাঠ প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা দাবি করেছেন, বরাদ্দ দেরিতে আসায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা সম্ভব হয় না, ফলে হিসাব জটিল হয়ে পড়ে।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার এ ঘটনাকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। আমার দেশকে তিনি বলেন, বরাদ্দ ব্যবস্থাপনা, মনিটরিং ও জবাবদিহিতাÑএ তিন জায়গায় বড় ঘাটতি রয়েছে। সময়মতো বরাদ্দ না দেওয়া এবং পরে তার যথাযথ অডিট না হওয়াই এ ধরনের দুর্নীতির মূল কারণ। তিনি আরো বলেন, যদি ডিজিটাল ট্র্যাকিং ও রিয়েল-টাইম অডিট ব্যবস্থা চালু করা না হয়, তাহলে এ সমস্যা ভবিষ্যতেও চলতে থাকবে।