Image description

প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে প্রশ্ন রেখে এনসিপি মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেন, আমি আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে প্রশ্ন করতে চাই, আপনার বিরুদ্ধে যদি কিছু লেখা না যায় তাহলে আপনি সংসদে দাঁড়িয়ে বলে দেন যে, আমার বিরুদ্ধে কিছু লেখা যাবে না লিখলে গ্রেপ্তার করা হবে। অথবা একটা আইন করে দেন, কোন সমালোচনা করা যাবে না কোন কথা বলা যাবে না, রসিকতাও করা যাবে না।

 

বুধবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে অনুষ্ঠিত ’অধ্যাদেশ বাতিল এবং গণভোট অস্বীকারের রাজনীতি: সংসদীয় স্বৈরতন্ত্রের যুগে বাংলাদেশ’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় তিনি এসব কথা বলেন। এনসিপি সংস্কার বাস্তবায়ন কমিটি এ আলোচনা সভার আয়োজন করে।

এনসিপি মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেন, বিএনপি সরকার গঠনের মাত্র দুই মাসের মধ্যেই দমনমূলক প্রবণতার স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। আওয়ামী লীগকে আমরা দেখেছি, ধীরে ধীরে এই পর্যায়ে উপনীত হয়েছিল। কিন্তু বিএনপি খুব দ্রুতই, তাদের সাফল্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ২৮ জন বিচারককে শোকজ দেওয়া হয়েছে। বিচারকগণ তাদের একটা হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে কিছু ডিসকাশন করছিলেন যেটা স্ক্রিনশট সরকারের পছন্দ হয়নি। ফলে সরকার তাদেরকে ওই স্ক্রিনশটের ভিতরে শোকজ দিয়ে বোঝালেন যে, রায় তো আমাদের পছন্দের বাইরে দিতেই পারবেন না। আপনারা নিজেদের মধ্যে কোনো আলোচনা বা টেক্সটিংও করতে পারবেন না, যেটা সরকারের পছন্দ হবে না। এটা একটা ইন্ডিকেশন যে আগামীতে বাংলাদেশের বিচার বিভাগ কিভাবে চলতে যাচ্ছে। ফেসবুকে পোস্ট করার জন্য আবার গ্রেপ্তার শুরু হয়ে গেছে। বেশিরভাগ ঘটনাই ঘটছে প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে লেখালেখি করার ফলে।

আসিফ বলেন, বিএনপি যত খারাপ কাজ করবে, যত জনবিরোধী কাজ করবে সেটা দ্রুতই করে ফেলুক। কারণ আমরা আবারও ১৫-২০ বছর অপেক্ষা করতে চাই না। সংসদের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, দুই তৃতীয়াংশ আসন পাওয়ার ফলে এই সংসদ একটা অকার্যকর সংসদ হয়ে গেছে। সংসদ সদস্যরা কথা বললেও তার কোনো বাস্তবায়ন নেই। বিরোধী দল হিসেবে আমাদের রাজপথে নামতে হচ্ছে।

জুলাই সনদ ও গণভোট নিয়ে খোঁড়া যুক্তি দেওয়া হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার। তিনি বলেন, জুলাই জাতীয় সনদ এবং তার থেকে যে অংশ নিয়ে গণভোট হলো যেটা জনগণ অনুমোদন করেছে, সেটা শেষ কথা হওয়ার কথা। যেটা অক্ষরে অক্ষরে পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করার কথা বলা হয়েছে। সেটা নিয়ে গড়মসি করা হচ্ছে এবং কতগুলো খোঁড় যুক্তি দেওয়া হচ্ছে। যেমন- একটা যুক্তি দিচ্ছে যে এটা সংবিধানে নাই।

সংবিধানে না থাকলেও অতীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করে নির্বাচন হয়েছিল বলে উল্লেখ করে বদিউল আলম বলেন, ১৯৯০ সালের দিকে বিচারপতি শাহাবুদ্দিন সাহেব যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হয়েছিলেন সেটা কোনো সংবিধানে ছিল? তিনি যে আবার ফেরত গেলেন ওটাই বা কোনো সংবিধানে ছিল? বিগত ঐক্যমত্য কমিশনের এই সদস্য বলেন, আরেকটা যুক্তি দেওয়া হচ্ছে, ’নোট অব ডিসেন্ট’ নিয়ে। ’নোট অব ডিসেন্ট’ মাইনরিটি ভিউ (সংখ্যালঘিষ্ঠের দৃষ্টিভঙ্গি) বা মতামত। এই যে বিশেষ সংসদীয় কমিটি হয়েছে ১৪ জনের। তার মধ্যে ১১ জন সরকারদলীয় আর তিনজন বিরোধীদলীয়। যারা সংখ্যায় বেশি তারা সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। আমরা মানি আর না মানি। আমাদের ঐকমত্য কমিশনে যেই সিদ্ধান্ত হয়েছে সেটাও সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামত। আর যেগুলো ’ডিসেন্ট’ (আপত্তি) দেওয়া হয়েছে ওগুলো হলো সংখ্যালঘিষ্ঠের মতামত। সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতই গ্রহণযোগ্য।

বদিউল আলম মজুমদার বলেন, আমরা সংকটের মুখোমুখি। একটি হলো বহির্বিশ্বের সৃষ্ট সংকট, যার ভয়াবহ প্রভাব আমাদের ওপর পড়ছে এবং পড়বে। এছাড়া আমরা নিজেরাও সংকট সৃষ্টি করছি, গণভোটের রায় নাকচ করে দেওয়ার মাধ্যমে কিংবা এটা নিয়ে টালবাহানা করে। যে অধ্যাদেশগুলো সরকারের স্বচ্ছতা জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবে এবং মানুষের কল্যাণ বয়ে আনবে সেগুলো বাতিল করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এগুলো সংকটকে আরও গভীর করবে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে ঐক্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন বলে মনে করেন বদিউল আলম।

তিনি বলেন, আজকে আমাদের সবচেয়ে বেশি দরকার ঐক্য। তরুণদের নেতৃত্বে যে ঐক্য গড়ে উঠেছিল সেই ঐক্যের মাধ্যমে আমরা স্বৈরাচারী ব্যবস্থার পতন ঘটিয়েছিলাম। একটা নতুন ভবিষ্যতের কথা আমরা সেদিন চিন্তা করেছিলাম, স্বপ্ন দেখেছিলাম। আজ এটা ভন্ডুল হতে যাচ্ছে। আমাদের মধ্যে অহেতুক অনৈক্য আমরা নিজেরা সৃষ্টি করছি। গণভোট নিয়ে গড়িমসি এবং একই সঙ্গে অধ্যাদেশগুলো বাতিল করার মাধ্যমে।

বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ফরিদা আখতার বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার যে পরিস্থিতিতে গঠিত হয়েছিল, যে গণঅভ্যুথথান হয়েছিল, সেটা কোনও সংবিধান মেনে হয়নি। আমরাই নির্বাচন দিলাম। আমরা যদি সংবিধানে না থাকি তাহলে নির্বাচনটা কী করে সাংবিধানিক হলো? এগুলো সব এলোমেলো ব্যাপার নিয়ে বর্তমান সরকার এখন ক্ষমতায় আছে। তারা যদি এখন প্রশ্ন তোলে যে সংবিধানের সবকিছু তারা মানছে, তাহলে তারা কিন্তু মিথ্যাচার করছে বা অসত্য বলছে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দিলারা চৌধুরী বলেন, জুলাইয়ের গণভোট যদি বাতিল হয়, তাহলে গণভোট বাতিলের সঙ্গে সঙ্গে এই সরকারও বাতিল। এটাই সাফকথা।

আলোচনায় অংশ নিয়ে এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও সংস্কার বাস্তবায়ন কমিটির উপপ্রধান সারোয়ার তুষার বলেন, আমরা ভাবতে পারি নাই যে এত দ্রুত আমাদের যে অর্জন নিয়ে আবার কথা বলতে হবে। এবং আবার দাবি জানাতে হবে। কিন্তু আমাদের করতে হচ্ছে।

বিএনপিকে কটাক্ষ করে এনসিপির এই নেতা বলেন, বিএনপি সংশ্লিষ্ট লোকদের সঙ্গে যখন দেখা হচ্ছে, দেখতে পাচ্ছি তাদের সবার হাতে হাতে জুলাই সনদ। কি এক বাংলাদেশে আসলাম, এখন বিএনপি সবচেয়ে বেশি জুলাই সনদের ’আপহোল্ডার’ (ধ্বজাধারী) হয়ে গেছে। এর কারণ তারা আসলে গণভোট বাস্তবায়ন করবে না, তারা আসলে অধ্যাদেশ বাতিল করে দেবে। এজন্য তারা জুলাই সনদের এটা দেখায়। কিন্তু গণভোট যদি আপনি বাস্তবায়ন করেন, জুলাই সনদ অটোমেটিক্যালি (স্বয়ংক্রিয়ভাবে) বাস্তবায়ন হয়ে যায়।

আলোচনায় আরও অংশ নেন ব্যারিস্টার আবু হেনা রাজ্জাকী, ভয়েস ফর রিফর্মের সহ–আহ্বায়ক ফাহিম মাশরুর, এনসিপির মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম, যুগ্ম আহ্বায়ক জাবেদ রাসিন, মনিরা শারমিন প্রমুখ।