সংস্কার প্রক্রিয়া নিয়ে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর সমালোচনা করে তাদের অবস্থানকে ‘নীতিগতভাবে সংস্কারবিরোধী’ বলে দাবি করেছেন জাস্টিস অ্যান্ড ডেমোক্রেসি পার্টির (জেডিপি) আহ্বায়ক নাঈম আহমাদ। তিনি বলেছেন, দেশে চলমান সংকট থেকে দৃষ্টি সরাতেই অপ্রয়োজনীয় রাজনৈতিক বিতর্ক সৃষ্টি করা হচ্ছে।
আজ বুধবার (৮ এপ্রিল) রাজধানীর মধুর ক্যান্টিনে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। সংবাদ সম্মেলনে জ্বালানি, কৃষি ও হকার উচ্ছেদ ইস্যুতেও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে দলটি।
জেডিপি আহ্বায়ক বলেন, বিএনপি ২০০১ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে ৩২ দফা সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিলেও ক্ষমতায় গিয়ে তার বেশিরভাগই বাস্তবায়ন করেনি। প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের সম্পদের হিসাব প্রকাশ কিংবা বিচার বিভাগের পৃথকীকরণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও উপেক্ষিত ছিল। তার মতে, এসব প্রতিশ্রুতি মূলত ক্ষমতায় যাওয়ার রাজনৈতিক কৌশল ছিল।
বর্তমান সরকারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, গণঅভ্যুত্থানের ধারাবাহিকতায় ক্ষমতায় আসা সরকারও গণভোট, গণপরিষদ ও ঘোষিত ৩১ দফা কর্মসূচি নিয়ে স্পষ্ট অবস্থান দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে। জনগণের রায়ের প্রতি সম্মান দেখিয়ে গণভোটের ভিত্তিতে গণপরিষদ গঠন করা উচিত ছিল বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বিরোধীদল জামায়াতে ইসলামীর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আগে সংস্কার ইস্যুতে দলটির সক্রিয়তা খুব কম ছিল। বরং পতিত আওয়ামী লীগ আমলে তারা নিজেদের দলীয় সংবিধানে পরিবর্তন এনে ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থার পরিবর্তে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার কথা বলেছিল; যদিও মানুষের কাছে ইসলাম প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়েই ভোট চেয়েছে। এখন তারা নিজেদের সবচেয়ে বড় সংস্কারপন্থী দল হিসেবে উপস্থাপন করছে, যা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, সরকার ও বিরোধী—উভয় পক্ষের সংস্কারবিরোধী প্রবণতা দেশের জন্য ‘দুর্ভাগ্যজনক’। মীমাংসিত বিষয়গুলো নিয়ে সংসদে অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক সৃষ্টি করে জ্বালানি সংকট ও কৃষি খাতের সম্ভাব্য বিপর্যয় থেকে জনগণের দৃষ্টি সরানোর চেষ্টা হচ্ছে। একই সঙ্গে জনদৃষ্টি ভিন্ন খাতে নিতে হকার উচ্ছেদের মতো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করা হয়।
এ পরিস্থিতিতে গণপ্রতিরোধের মাধ্যমেই কাঙ্ক্ষিত সংস্কার আদায় সম্ভব বলে মনে করে জেডিপি। দলটির মতে, বিএনপি-জামায়াত ভোটের রাজনীতিতে সংস্কারের পক্ষের শক্তি হিসেবে নিজেদের উপস্থাপন করলেও বাস্তবে তারা নীতিগতভাবে সংস্কারপন্থী নয়। তাই জনগণকে সংস্কারের পক্ষে সুস্পষ্ট অবস্থান গ্রহণকারী দলগুলোর পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।
জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে নাঈম আহমাদ বলেন, দেশে ইতোমধ্যে জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে, যদিও সরকার তা অস্বীকার করছে। অল্প কিছু পাম্পে সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও অধিকাংশ স্থানে ঘাটতি রয়েছে। সিন্ডিকেটের মাধ্যমে জ্বালানি সরবরাহে অনিয়ম হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি এবং এর সঙ্গে সরকারদলীয় নেতাকর্মীদের যোগসাজশ আছে কি না, তা তদন্তের দাবি জানান।
দলটি জানায়, দেশে গড়ে মাত্র ১৫ দিনের জ্বালানি মজুত রাখা হয়, যেখানে আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী কমপক্ষে ৯০ দিনের মজুত থাকা প্রয়োজন। বিদ্যমান অবকাঠামোগত সক্ষমতা ৩০ দিনের বেশি নয় বলেও উল্লেখ করা হয়। গার্মেন্টস, কৃষি ও অন্যান্য শিল্প টিকিয়ে রাখতে জ্বালানির রিজার্ভ বাড়ানোর পদক্ষেপ নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।
কৃষি খাত নিয়ে জেডিপি সতর্ক করে জানায়, সেচনির্ভর বোরো মৌসুম চললেও কৃষকেরা পর্যাপ্ত ডিজেল পাচ্ছেন না। দেশের মোট ধান উৎপাদনের প্রায় ৬০ শতাংশ বোরো থেকে আসে উল্লেখ করে দলটি আশঙ্কা প্রকাশ করে, ডিজেল সংকট অব্যাহত থাকলে খাদ্যঘাটতি দেখা দিতে পারে। পাশাপাশি সার সংকট নিয়েও উদ্বেগ জানিয়ে বলা হয়, পাঁচটি সরকারি সার কারখানার মধ্যে চারটিই বন্ধ রয়েছে।
হকার উচ্ছেদ কার্যক্রমের সমালোচনা করে জেডিপি জানায়, বিকল্প কর্মসংস্থান নিশ্চিত না করে এ ধরনের পদক্ষেপ বেকারত্ব বাড়াবে এবং সাধারণ মানুষের জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে নতুন করে কাউকে বেকার না বানানোর আহ্বান জানান তারা।
সংবাদ সম্মেলনে কৃষকদের ন্যায্যমূল্যে নিরবচ্ছিন্ন ডিজেল ও সার সরবরাহের দাবিতে আগামী ১০ তারিখ বিকেলে জাতীয় জাদুঘরের সামনে মানববন্ধন কর্মসূচি ঘোষণা করে দলটি।
এ সময়ে আরো উপস্থিত ছিলেন জেডিপির সদস্য সচিব এডভোকেট আব্দুল আলিম, প্রধান সংগঠক মোঃ আহছান উল্লাহ, সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক ইমরান হোসেন রাহাত, যুগ্ম আহ্বায়ক মুত্তাকী বিন মনির, সাদমান আলম, সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব নূরা জেরিন, যুগ্ম সদস্য সচিব মাহতাব হোসেন সাব্বির, নাজমুন নাহার হাফসা, আব্দুল্লাহ আল মামুন, ইয়াসিন আরাফাত রাজ, কেন্দ্রীয় সদস্য সালমান শরীফ, মোহাম্মদ উল্লাহ জাবের প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।