Image description

রাজধানীর মোহাম্মদপুরে বায়োলজি বিষয়ের কোচিং ব্যবসার জন্য নামের আগে ডাক্তার পদবী ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে আবিদুর রহমান খান নামে এক শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে। নামের শেষে ব্যবহার করছেন এমবিবিএস ডিগ্রিও। বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি) আইন অনুযায়ী, এমবিবিএস অথবা বিডিএস কোর্স উত্তীর্ণ হওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটির রেজিস্ট্রেশন ছাড়া ডাক্তার পদবী ব্যবহার আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।

এদিকে অভিযোগের সত্যতা জানতে চাইলে নিজেকে আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট মো. আসাদুজ্জামান ও মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাফিজুর রহমান তার আত্মীয় বলে পরিচয়ও দিয়েছেন তিনি। তবে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, মোহাম্মদপুর থানায় হাফিজুর রহমান নামে কোনো কর্মকর্তা নেই। তথ্য বলছে, গত বছরের জুলাইয়ে মোহাম্মদপুর থানার ওসি (তদন্ত) হাফিজুর রহমানকে ক্লোজ করেছিল ডিএমপি।

‘প্রবলেম করতে আসলে ব্যাকগ্রাউন্ডটা চেক করবেন ভাইয়া। আপনাকে যে এগুলো উসকাচ্ছেন এবং যে আপনাকে এগুলো ইনফরমেশন পাঠিয়েছেন, তাকে বলেন আবিদের বাপের খোঁজ নিতে, চৌদ্দগুষ্টির খোঁজ নিতে। যদি বেশি দূরে যায় ভাইয়া, আমরা কিন্তু বসে থাকব না’

আবিদুর রহমান খান রাজধানীর বেসরকারি বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজের এমবিবিএস ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের ছাত্র। তিনি মোহাম্মদপুরের তাজমহল রোডে বায়োলজি সিকার্স নামে কোচিংটি পরিচালনা করেন। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকের জীববিজ্ঞান বিষয় পড়ানো হয় এতে। প্রতিষ্ঠানটি সাইনবোর্ডে নিজের নামের পূর্বে ‘ডা.’ পদবী এবং শেষে ‘(এমবিবিএস)’ ডিগ্রি ব্যবহার করেছেন তিনি।


‘ডা.’ পদবী এবং শেষে ‘(এমবিবিএস)’ ডিগ্রিসহ আবিদের ব্যানার


খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আবিদুর রহমান খানের সহপাঠীরা ২০২৩ সালের ৮ অক্টোবর ফাইনাল প্রফেশনাল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। পরবর্তী বছরের অক্টোবরে তাদের ইন্টার্নশিপ শেষ হয়। কিন্তু আবিদুর রহমান খান এখনও তৃতীয় প্রফেশনাল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেননি। সর্বশেষ নভেম্বর ২০২৫ স্লটে তৃতীয় প্রফে বসলেও তিন বিষয়ে অনুত্তীর্ণ হন।

নিয়ম অনুযায়ী, পাঁচটি বর্ষের এমবিবিএস কোর্সে চারটি প্রফেশনাল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়। এরপর এক বছরের ইন্টার্নশিপ শেষে বিএমডিসির রেজিস্ট্রেশন সাপেক্ষে ডাক্তার পদবী ব্যবহারের সুযোগ মেলে।

বিএম‌ডিসি আইন ২০১০-এর ২৯ ধারায় চিকিৎসক না হয়েও পরিচয় প্রদানে শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। এই আইন অনুযায়ী, ন্যূনতম এমবিবিএস অথবা বিডিএস ডিগ্রি প্রাপ্ত চিকিৎসক ব্যতীত অন্য কেউ তাদের নামের পূর্বে ডাক্তার পদবি ব্যবহার করতে পারবেন না। এই বিধান লঙ্ঘন করলে এটি অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে এবং এজন্য তিনি ৩ বছরের কারাদণ্ড বা এক লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডনীয় হবেন। এ ছাড়া অপরাধ অব্যাহত থাকলে প্রত্যেকবার পুনরাবৃত্তির জন্য অন্যূন ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ডে অতিরিক্ত হিসেবে দণ্ডনীয় হবেন।


আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগের প্রোগ্রামে আবিদের অংশগ্রহণের / পুরনো ছবি


বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজের ছাত্র আবিদুর রহমান খান শাখা ছাত্রদলের একটি অংশকে ‘মেইন্টেইন’ করেন বলে জানা গেছে। এ ঘটনায় তার প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে বিব্রত শাখা ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। তাদের অভিযোগ, জুলাই গণ‌অভ্যুত্থানের পরে ছাত্রদলের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করলেও পূর্বে ছাত্রলীগের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ছিল তার। বিভিন্ন সময়ে শাখা ছাত্রলীগের জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে বিভিন্ন কর্মসূচিতে তাকে অংশ নিতে দেখা গেছে।

শাখা ছাত্রদলের এক জ্যেষ্ঠ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, এম‌বিবিএস উত্তীর্ণ না হয়েও ডাক্তার পদবী ব্যবহারের কারণে আইন লঙ্ঘন হচ্ছে। একইসঙ্গে প্রতারিতও হচ্ছেন কোমলমতি শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকরা। এছাড়া এই পরিচয় ব্যবহার করে আবিদ কোনো রোগী দেখছে কিনা— সেটি নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

স্বামী-স্ত্রীর নাটকীয়তা এবং ‘ব্যাকগ্রাউন্ড চেক করবেন’, ‘আমার কিচ্ছু হবে না’
অভিযোগের বিষয়ে জানতে মুঠোফোনে আবিদুর রহমান খানের সঙ্গে কথা হয় প্রতিবেদকের। কথার শুরুতে আবিদুর রহমান খান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, আমি কোনো রোগী দেখি না। যদি রোগী দেখতাম, তাহলে একটা ব্যাপার থাকত। এটা লেখার জন্য কারো কোনো ক্ষতি হচ্ছে কিনা, এটা দেখতে হবে।

এ পর্যায়ে মোবাইলটি আবিদুর রহমান খানের কাছ থেকে ‘কেড়ে নিয়ে’ কথা বলতে শুরু করেন এক নারী। তিনি নিজেকে আবিদের স্ত্রী বলে পরিচয় দেন। বলেন, এত আইনি প্রসেস জিজ্ঞাসা করছেন, কাইন্ডলি একটু খোঁজখবর নেন। লিখতে পারব কি পারব না— এজ এ মেডিকেল স্টুডেন্ট, এক এ ফার্মাসিস্ট কোচিংয়ে আমি এটা লেখতে পারব। আমি তো আর রিক্সাচালক না যে আমি একটা কোচিং চালিয়ে লেখব না যে আমি রিক্সাচালক, বাট আমি মেডিকেল স্টুডেন্ট।


শাখা ছাত্রলীগ সভাপতি-সেক্রেটারির সঙ্গে আবিদ (ডান থেকে চতুর্থ নম্বর) / পুরনো ছবি


তিনি বলেন, আর আবিদের ব্যাপারে কোনো প্রবলেম করতে আসলে ব্যাকগ্রাউন্ডটা চেক করবেন ভাইয়া। আপনাকে যে এগুলো উসকাচ্ছেন এবং যে আপনাকে এগুলো ইনফরমেশন পাঠিয়েছেন, তাকে বলেন আবিদের বাপের খোঁজ নিতে, চৌদ্দগুষ্টির খোঁজ নিতে। যদি বেশি দূরে যায় ভাইয়া, আমরা কিন্তু বসে থাকব না। ভাইবেন না যে আবিদ রাস্তার একটা ছেলের সাথে আসছে। আপনি যার উসকানিতে নিউজ করতেছেন এবং যে আপনাকে বলেছে, আপনি একটু তাকে বলেন যে তুমি ভুল জায়গায় হাত দিয়ে ফেলছ।

এক পর্যায়ে ওই নারী প্রতিবেদকের ‘ডিটেইলস’ জানতে চান। পুনরায় পরিচয় দেওয়ার পাশাপাশি আবিদুর রহমান খানের ‘ব্যাকগ্রাউন্ড’ জানতে চাইলে তিনি এড়িয়ে যান। পরে মুঠোফোনটি তার কাছ থেকে নিয়ে ফেলেন আবিদ। তিনি বলেন, আপনারা যারা সাংবাদিক হইছেন, আপনাদেরকে কিছু রুলস জানতে হবে। আপনি আমাকে কখন ধরতে পারবেন, জানেন? যখন আমি কোন রোগী দেখবো বা কোন কিছু যখন করব। আমি তো আপনাকে বলতেছি যে না আমার কাজ ঠিক আছে। কিন্তু একটা কোচিং সেন্টার যখন আমরা চালাই, এটা জাস্ট ফর মাই আইডেন্টিটি যে এখানে কোচিং সেন্টারটা কে চালায়, কারা চালায়। মেডিকেল স্টুডেন্ট আসলে বলা যায় না, এজন্য ওখানে জাস্ট নামের সাথে...। এখন আপনি আমার নামে একটা রিপোর্ট করলেন, আমি আমার সাইনবোর্ডটা খুলে ফেলে দিলাম; তারপরে আপনি আমার আইডেন্টিটিটা কই পাবেন? আমার পেজের (ফেসবুক) মধ্যে কোন জায়গায় লেখা নাই যে আমি ডাক্তার। আমি কালকে আমার সাইনবোর্ড খুলে ফেলানোর পরে আপনি কীভাবে প্রমাণ করবেন যে আমি এখানে কিছু করছি? ধরেন, নিউজ করলেন। আমার নামে কি কেস হবে? আপনারা যেটা চিন্তা করতেছেন থানা থেকে কেস, আসলে থানা থেকে আমি জানি যে আপনার কিচ্ছু হবে না।


ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে প্রোগ্রামে আবিদ (ডান থেকে দ্বিতীয়) / পুরনো ছবি


আবিদুর রহমান খান বলেন, আমি বলতে চাই যে এখানকার (মোহাম্মদপুর থানা) যে বর্তমান ওসি, সে আমার নিজের আপন বড় ভাইরা ভাই। ওসি হাফিজুর রহমান, চেনেন কিনা?

পরে আবারও প্রতিবেদককে কল দেন আবিদুর রহমান খান। এবার নিজেকে আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট মো. আসাদুজ্জামানের আত্মীয় বলে পরিচয় দেন। বলেন, আমি আগে ছাত্রলীগের সাথে ছিলাম বলতে কবে আমি ছাত্রলীগের সাথে ছিলাম বা কিসে ছিলাম আপনি একটু খোঁজ খবর নেন। আমার আইডিটা একটু ঢোকেন, জুলাই আন্দোলনে আমার কী ভূমিকা ছিল, কী না ছিল। ফারহান ফাইয়াজ (শহীদ) কিন্তু আমার স্টুডেন্ট। তার যে পোস্টটা ভাইরাল হইছে, সেটা কিন্তু আমার করা। কিন্তু আপনি যেগুলো চিন্তা করতেছেন বা যেগুলোতে যাচ্ছেন, এই যে আইনমন্ত্রী নতুন হয়েছে, সে কিন্তু আমাদের আত্মীয়। আমি বিষয়টাকে বড় করতে চাচ্ছি না। আপনি আমার যখন এই বিষয়টায় হাত দিবেন, আমি কীভাবে বসে থাকব একটু বলেন তো আপনি। আমি অন্য কাউকে দিয়ে আপনাকে ফোন দেয়াতে পারতাম, কিন্তু বড় করতে চাই না দেখে নিজে ফোন দিলাম। আমার নিজের মামা যশোর জেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান।

তিনি বলেন, আমি যখন কোচিং সেন্টার শুরু করি, তখন কিন্তু আমি শুরুই করেছিলাম ‘মেডিকেল স্টুডেন্ট দিয়ে পরিচালিত’ লিখে। তিন থেকে চার মাস মতো আমি এই নতুন সাইনবোর্ডটা লাগিয়েছি। মানে আমি আগেও মেডিকেল স্টুডেন্ট ছিলাম, এখনও আমি মেডিকেল স্টুডেন্ট আছি— এটা একটা দৃষ্টিকটু বিষয় না ভাই? নরমালি আপনি কতদিন ধরে মেডিকেল স্টুডেন্ট থাকবেন? এটা তো স্বাভাবিক না। আপনি আমার জায়গাটা একটু বসেন। বিষয়টা দাঁড়াইছে এই রকম। এই জায়গাটায় আমার ভুল হইছে।

এদিকে কথোপকথনের কিছুক্ষণ পরে একই নম্বর থেকে আরেকটি কল আসে। সেখানে বয়স্ক এক ব্যক্তি নিজেকে আবিদুর রহমান খানের বাবা পরিচয় দিয়ে কথা বলেন। প্রতিবেদকের সঙ্গে ছেলে ও পুত্রবধূর দুর্ব্যবহার ও প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ হুমকির ঘটনায় তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন। রবিবার (৫ এপ্রিল) সাইনবোর্ড খুলে ফেলা হবে বলেও জানান তিনি। আইনমন্ত্রী ও মোহাম্মদপুর থানার ওসির সঙ্গে আত্মীয়তার বিষয়ে জানতে চাইলে তা অস্বীকার করেন।