Image description

রংপুর বিভাগের বৃহৎ চিকিৎসাকেন্দ্র রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (রমেক) নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) তীব্র শয্যা সংকটের কারণে শ্বাসকষ্ট আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা সেবা ব্যাহত হচ্ছে। হাসপাতালটি বিভাগের আট জেলার মানুষের চিকিৎসায় ভরসাস্থল হলেও গুরুতর রোগীদের জন্য সেখানকার আইসিইউতে রয়েছে মাত্র ১০টি শয্যা।

যেখানে আনুপাতিকহারে ১ হাজার শয্যা হাসপাতালে ১শ’টি আইসিইউ শয্যা থাকার কথা। শুধু শয্যা সংকট ছাড়াও রংপুর মেডিকেলের আইসিইউতে রয়েছে নানা সংকট। এ অবস্থায় চিকিৎসা নিতে আসা রোগীর মৃত্যুর হার বেড়ে যাচ্ছে।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত ১ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত ৩৫ দিনে আইসিইউতে ভর্তি হওয়া ৭৩ জন রোগীর মধ্যে ৩৫ জনেরই মৃত্যু হয়েছে। 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চিকিৎসক সংকটসহ নানা সমস্যার কারণে আইসিইউতে পর্যাপ্ত সুবিধা না পাওয়ার কারণে এসব মৃত্যুর হার বেড়েছে।

বর্তমানে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ১০ জন রোগী, যাদের বেশিরভাগই সংকটাপন্ন বলে জানা গেছে। এসব রোগীর অধিকাংশই স্ট্রোক, নিউমোনিয়া ও অন্যান্য জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে আইসিইউতে ভর্তি হয়েছেন। 

নীলফামারীর ডোমার উপজেলার সাইফুল ইসলামের স্ত্রী আরজিনা বেগম জানান, ২৪ দিন ধরে তার স্বামী গুরুতর অসুস্থ। তাকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি করা হয়। অনেক চেষ্টার পর তাকে আইসিইউতে ভর্তি করানো সম্ভব হয়েছে। কারণ আইসিইউতে চাহিদার তুলনায় শয্যা সংকট তীব্র। 

অপর এক রোগীর স্বজন সোনালী বেগম বলেন, আইসিইউতে শয্যা পাওয়া এখন সোনার হরিণ। শয্যা না থাকায় অনেক রোগীকে ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আমরা শুধু অপেক্ষা করছি কখন কী হয়।

রোগীর স্বজন জয়নাল আহমেদ তার রোগীর নাম গোপন করে বলেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ যদি নারাজ হন তাই রোগীর নাম প্রকাশ করছি না। 

তিনি জানান, সরকারি হাসপাতাল ছাড়া বাইরে প্রাইভেট হাসপাতালে আইসিইউতে ভর্তি করা হলে প্রতিদিন ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা ব্যয় বহণ করতে হয়। ফলে সরকারি  হাসপাতালে তার রোগী ভর্তি করার জন্য অপেক্ষা করছেন তিনি। তবে সিরিয়াল পাওয়ার অপেক্ষায় রোগীর মৃত্যুও হতে পারে। এ জন্য অতি দ্রুত রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে শয্যা বাড়ানোর দাবি জানান তিনি।

এক হাজার শয্যার এই হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে আড়াই হাজার থেকে তিন হাজার রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। কিন্তু রোগীর এত বিশাল চাপ সামাল দেওয়ার মতো আইসিইউ সুবিধা এখানে নেই। ফলে গুরুতর রোগীদের চিকিৎসা কার্যত বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

এ কারণে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের স্বজনদের মধ্যে তীব্র হতাশা ও ক্ষোভ বাড়ছে।  

রোগীর এক স্বজন নাম প্রকাশ না করে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ছয় মাস আগে আইসিইউর জন্য চেষ্টা করেও পাইনি। এখন আবার একই অবস্থা। টাকার অভাবে প্রাইভেট হাসপাতালে নিতে পারছি না। তাহলে আমরা যাব কোথায়?

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, প্রতিদিনই আইসিইউ এর চাহিদা বাড়ছে। কিন্তু সীমিত শয্যা ও যন্ত্রপাতির কারণে অনেক রোগীকেই ভর্তি করা সম্ভব হচ্ছে না। এতে গুরুতর রোগীরা প্রয়োজনীয় লাইফ সাপোর্ট থেকে বঞ্চিত হচ্ছে যা মৃত্যুঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

চিকিৎসক বিশেষজ্ঞদের মতে, বিভাগীয় পর্যায়ের সরকারি হাসপাতালে আইসিইউ সেবার এমন সংকট সমাধান করা জরুরি।  শুধু শয্যা বাড়ানোই নয়, আধুনিক লাইফ সাপোর্ট সিস্টেম, ভেন্টিলেটর, প্রশিক্ষিত চিকিৎসক ও নার্স নিশ্চিত করা জরুরি। 

তারা বলেন, বর্তমান বাস্তবতায় অনেক রোগী আর্থিক সঙ্গতি না থাকায় বাধ্য হয়ে বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন, বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা খরচ বহন করা সাধারণ মানুষের পক্ষে অসম্ভব। ফলে দরিদ্র রোগীরা চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। দ্রুত আইসিইউ ইউনিট সম্প্রসারণ, আধুনিক যন্ত্রপাতি সংযোজন এবং প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ ছাড়া এই সংকট থেকে উত্তরণের বিকল্প কোনো পথ নেই বলে মনে করেন তারা।

রমেকের ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. আলফে সানি মৌদুদ আহমেদ বলেন, আইসিইউতেই যদি এত রোগী মারা যায়, তাহলে বাইরে কতজন মারা যাচ্ছে তার কোনো পরিসংখ্যান নেই। প্রতিদিনে আড়াই থেকে তিন হাজার রোগীর জন্য অন্তত ১০ শতাংশের আইসিইউ প্রয়োজন। সে হিসেবে এখানে অন্তত ১শ’টি আইসিইউ শয্যা থাকা প্রায়োজন।  সেখানে মাত্র রয়েছে ১০টি শয্যা। যা দিয়ে চিকিৎসা সেবা দিতে খুবই সংকট পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হচ্ছে। পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতি ও দক্ষ জনবল না বাড়ালে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এ ব্যাপারে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আশিকুর রহমান এই প্রতিবেদককে বলেন, আমরা সীমিত সম্পদ নিয়েই সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছি। আইসিইউতে শয্যা বাড়ানোর বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। আশা করি দ্রুত সমাধান হবে।