হাম রুবেওলা ভাইরাস দ্বারা সৃষ্ট অত্যন্ত সংক্রামক একটি রোগ, যা সাধারণত জ্বর, সর্দি, কাশি, লাল চোখ এবং ত্বকে ফুসকুড়ির মাধ্যমে প্রকাশ পায়। হঠাৎ করেই বাংলাদেশে এ রোগের প্রকোপ ব্যাপক আকারে ছড়িয়েছে, যা শিশুদের অভিভাবকদের মাঝেও এক ধরনের ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে।
হামের ক্ষেত্রে দুটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হাম সদৃশ্য জীবাণু দ্বারা নিউমোনিয়া ও হাম জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার পরবর্তী নিউমোনিয়া। বিশেষ করে বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোতে হাম সংক্রমণের পর নিউমোনিয়া একটি বড় জটিলতা হিসেবে দেখা যায়।
হাম সদৃশ জীবাণু দ্বারা নিউমোনিয়া
হাম সদৃশ জীবাণু দ্বারা নিউমোনিয়া বলতে এমন অসুখকে বোঝায়, যেখানে রোগীর জ্বর, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া, চোখ লাল হওয়া, শরীরে র্যাশ থাকে। কিন্তু এটি সব সময় হাম ভাইরাস দ্বারা নাও হতে পারে। অন্য ভাইরাসও একই ধরনের উপসর্গ তৈরি করতে পারে। হাম সদৃশ সম্ভাব্য ভাইরাসগুলোর মধ্যে রয়েছে—রুবেলা ভাইরাস, অ্যাডিনোভাইরাস, ইন্টারোভাইরাস, পারভোভাইরাস বি১৯, হিউম্যান হারপাসভাইরাস ৬।
হাম সংক্রমণের পথ সাধারণ তিনটি। এটি কাশি ও হাঁচির মাধ্যমে ছড়ায়, আক্রান্ত ব্যক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শ এবং জনসমাগমপূর্ণ পরিবেশে (স্কুল, ডে-কেয়ার)। এসব ঘটনা ও পরিস্থিতির সঙ্গে শিশুদের সম্পর্ক অনেক বেশি হওয়ায় অন্যান্য বয়সিদের তুলনায় তারাই বেশি আক্রান্ত হয়। বিশেষ করে আক্রান্তের ঝুঁকিতে থাকে অপুষ্ট, টিকা না নেওয়া ও ৫ বছরের কম বয়সি শিশু।
হাম জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার পরবর্তী নিউমোনিয়া:
অন্যদিকে, হাম হওয়ার পরে যখন ফুসফুসে সংক্রমণ হয়ে নিউমোনিয়া হয়, তাকে পোস্ট মায়াসলেস নিউমোনিয়া বা হাম জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার পরবর্তী নিউমোনিয়া বলা হয়। এটি হাম রোগের সবচেয়ে মারাত্মক জটিলতা।
কারণ, পোস্ট মায়াসলেস নিউমোনিয়া দুই ধরনের হতে পারে। একটি প্রাইমারি ভাইরাল নিউমোনিয়া, যে হাম ভাইরাস সরাসরি ফুসফুস আক্রান্ত করে। অন্যটি হলো—সেকেন্ডারি ব্যাকটেরিয়াল নিউমোনিয়া। হামের পরে ইমিউনিটি (রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা) কমে যাওয়ার কারণে ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ হয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বলছে, হাম অত্যন্ত সংক্রামক রোগ। একজন আক্রান্ত ব্যক্তি ৯০ শতাংশ পর্যন্ত সংবেদনশীল ব্যক্তিকে সংক্রমিত করতে পারে। বিশ্বে প্রতি বছর ৯০ লাখ মানুষ এতে আক্রান্ত হয়। মৃত্যু এক লাখ। মৃত্যুর বড় অংশ নিউমোনিয়ার কারণে ঘটে।
বাংলাদেশে হাম নিয়ন্ত্রণে টিকাদান কর্মসূচি থাকলেও মাঝে মাঝে প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। এর মূলে সময়মতো টিকা না নেওয়া, অপুষ্টি, ঘনবসতি, সীমান্ত অঞ্চলে সংক্রমণ। আক্রান্তদের মধ্যে ৫ থেকে ৬ শতাংশের নিউমোনিয়া হয়। মারাত্মক ক্ষেত্রে মৃত্যুর প্রধান কারণ নিউমোনিয়া।
হাম জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার পরবর্তী নিউমোনিয়ায় মৃত্যুর কারণ এটি দ্রুত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নষ্ট করে দেয়। টি-সেল কমে যায়, ম্যাক্রোফেজ কার্যকারিতা কমে এবং অ্যান্টিবডি প্রতিক্রিয়া দুর্বল হয়। ফলে শিশুদের মধ্যে এ রোগের প্রকোপ বেশি।
ক্লিনিক্যাল লক্ষণ:
শিশু হামে আক্রান্ত হলে সাধারণত জ্বর, কাশি, চোখ লাল হয়ে যাওয়া।
করণীয়:
হামের নির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা নেই। তবে বিশ্রাম, প্রচুর পানি পান এবং চিকিৎসকের পরামর্শে প্যারাসিটামল অথবা আইবুপ্রোফেন দিয়ে উপসর্গ নিয়ন্ত্রণ করা হয়।
হাম থেকে সুরক্ষায় সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো টিকা। বাংলাদেশে এটি দুটি ডোজ দেওয়া হয়। প্রথম ডোজ এমআর ভ্যাকসিন, যেটি ৯ মাস বয়সে দিতে হয়। আর বুস্টার ডোজ দিতে হয় ১৫ মাস বয়সে। এছাড়াও উচ্চমাত্রার ভিটামিন এ, অপুষ্টি প্রতিরোধ ও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ। এছাড়াও সাধারণ চিকিৎসা হিসেবে অক্সিজেন থেরাপি, ভিটামিন এ ও পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিতে হবে।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক
পালমনোলজি বিভাগ,
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট