সারাদেশে ব্যাপক হারে ছড়িয়েছে ছোঁয়াচে রোগ হাম। গত জানুয়ারির শেষ দিকে ছড়াতে শুরু করা হামে সারাদেশে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। ঢাকার সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালেই ২৮ মার্চ পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে ২২ শিশুর। চিকিৎসকরা বলছেন, হাম অত্যধিক ছোঁয়াচে একটি রোগ। একজন আক্রান্ত শিশুর হাঁচি-কাশির মাধ্যমে সর্বোচ্চ ১৮ জন শিশু এই রোগে আক্রান্ত হতে পারে।
বিশ্বব্যাপী হামের টিকা দেওয়া হয় ৯ মাস বয়সে। সম্প্রতি হামের দুটি টিকা দেওয়া শুরু হয়েছে, দ্বিতীয়টি দেওয়া হয়ে থাকে ১৫ মাস বয়সে। সাধারণত মায়ের কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে এই সময়ের জন্য হামপ্রতিরোধী শক্তি পেয়ে থাকে শিশু। কিন্তু হাম এ বছর কোনো ব্যাকরণ মানছে না। ৬ মাস বয়সী শিশুরাও এই রোগে আক্রান্ত হতে শুরু করেছে। চিকিৎসকরা বলছেন, আক্রান্ত শিশুদের নিয়ে শেষ পর্যায়ে হাসপাতালে পৌঁছানোয় মৃত্যুর ঘটনা বাড়ছে।
ঢাকার সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে আসা আক্রান্ত ও মৃত শিশুদের বেশিরভাগই ঢাকার কড়াইল বস্তি ও মোহাম্মদপুর এলাকার। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা হওয়ায় এখানে খুব দ্রুত এর সংক্রমণ ছড়িয়েছে বলে ধারণা হাসপাতালটির চিকিৎসকদের।
এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) উপ-পরিচালক ডা. মো. শাহরিয়ার সাজ্জাদ দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, কোভিডের থেকে হাম কিন্তু ছোঁয়াচে বেশি। একজন যদি আক্রান্ত হয়, সে ১৩ থেকে ১৮ জনকে আক্রান্ত করতে পারে। যদি একজন আক্রান্ত হয়, তার সংস্পর্শে যদি তার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা না থাকে এরকম ১৩ থেকে ১৮ জন আক্রান্ত হতে পারে। তাহলে বস্তি এলাকায় এটার সম্ভাবনা খুব বেশি হবে। আবার বস্তি এলাকায় এমন হতে পারে, কারণ এটা সিটি কর্পোরেশনের অধীনে। এখানে টিকাদানের হারটা অন্যান্য এলাকা থেকে একটু কম।
তিনি বলেন, আপনার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম হলেই যেকোন রোগে আপনি আক্রান্ত হতে পারেন। এটা হতে পারে, আমরা বলি যে মায়ের বুকের দুধ যদি এক্সক্লুসিভ ব্রেস্টফিডিং হয়, তাহলে নয় মাসের আগে হাম হওয়ার কথা না। কিন্তু এখন হচ্ছে। এর একটা কারণ হতে পারে, এখানে কিছু ব্যত্যয় ঘটছে। যেমন— এখন কর্মজীবী নারী অনেক বেশি। হয়তো শিশুকে পর্যাপ্ত বুকের দুধ খাওয়ানো হচ্ছে না। আবার বিগত দুই বছরে কোন ভিটামিন-এ ক্যাম্পেইন হয়নি।সামগ্রিকভাবে বিবেচনা করলে অনেক কিছুই হতে পারে যেটার কারণে এই হামটা হচ্ছে। তবে সময়ের আগে হামের আক্রমণের বিষয়টা বৈজ্ঞানিকভাবে চিন্তা-ভাবনা করে ব্যাখ্যা করতে হবে। এজন্য বিভিন্ন কমিটির বৈঠক হচ্ছে।
হাম কিভাবে বুঝবেন অভিভাবকরা, কী করবেন
সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের (আইডিএইচ) জুনিয়র কনসালটেন্ট (মেডিসিন) ডা. শ্রীবাস পাল দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, হামের লক্ষণ হচ্ছে— প্রথম তিন চার দিন কিছু কমন উপসর্গ থাকে। যেমন জ্বর, শরীর ব্যথা করা, সর্দি, কাশি। এরপরেই তিনটা ক্লাসিক্যাল ফিচার আসে। এগুলো হচ্ছে কফ, কাশি, শরীর দুর্বল হওয়া, ব্যথা করা, আরেকটা হচ্ছে ব্রঙ্কিওলাইটিস বা চোখ লাল হয়ে যাওয়া। এরপরে লাল লাল ছোপছোপ দাগ বা র্যাশ শুরু হয়। এর সাথে মুখের ভেতরে একটা স্পট হয়, আমরা কমপ্লেক্স স্পট বলি। এই র্যাশ এবং কমপ্লেক্স স্পট আসলে আমরা ধারণা করতে পারি যে শিশুর হাম হয়েছে।
তিনি বলেন, এখানে একটা খুব বড় ধরনের সমস্যা হচ্ছে— আমরা হাম সন্দেহ করি যখন র্যাশ ডেভেলপ করে। তার আগ পর্যন্ত যে উপসর্গগুলো, সেগুলো অন্যান্য ভাইরাস জ্বরের মত, একই রকম। এজন্য আমরা ডিফারেনশিয়েট করতে পারি না বা বুঝতে পারি না যে হাম হয়েছে। কিন্তু হামের ক্ষেত্রে যেদিন থেকে শিশুর জ্বর শুরু হয়, সেদিন থেকেই হাম ছড়ানো শুরু হয় এবং র্যাশ আসার পরও এক সপ্তাহ পর্যন্ত এটা ছড়াতে থাকে। তার মানে আমি হাম সন্দেহ করার আগে থেকেই বাচ্চাটা হাম ছড়াতে থাকে, এইজন্য হাম ছড়ানো বন্ধ করা একটা ডিফিকাল্ট ইস্যু। যখন র্যাশ আসে তখন আমি বুঝতে পারলাম যে তার হাম, আমি তার থেকে অন্যদেরকে দূরে রাখলাম, কিন্তু তার আগের এক সপ্তাহ তো সে ছড়িয়ে আসছে। এজন্য হাম খুবই ছোঁয়াচে। যতগুলো ছোঁয়াচে রোগ আছে তার মধ্যে হাম একটা অত্যধিক ছোয়াচ রোগ।
ডা. শ্রীবাস পাল বলেন, শুধু শিশুদেরই নয়, বড়দেরও হাম আক্রান্ত করতে পারে। তবে বড়দের এটা কম হয়, কারণ আমাদের ভ্যাক্সিনেশন আমরা পেয়েছি। ভ্যাক্সিন পেলে আমরা লাইফলং ইমিউনিটি পাই। আরেকটা হচ্ছে কারো যদি একবার হাম হয়, তাহলেও লাইফলং ইমিউনিটি। সুতরাং কারো যদি হাম হয়ে যায় অথবা সে যদি ভ্যাকসিন পায়, তাহলে তার হাম হওয়ার সম্ভাবনা নেই। এজন্য অ্যাডাল্টদের মধ্যে খুবই কম।
অভিভাবকদের করণীয় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এখন যেহেতু প্রকোপ চলছে, অভিভাবকদের ভিড় এড়িয়ে চলা। তার বাচ্চাকে হচ্ছে যে নিজের কন্ট্রোলে রাখা। অন্যান্য যে ভিড় যেখানে আছে একরকম ভিড়যুক্ত জায়গাগুলোকে করা বা কারো সর্দি আছে তার থেকে দূরে থাকা করোনার সময় যেভাবে আমরা আইসোলেশন করেছি বা সতর্কতা মেনে চলেছি একচুি এখনো সেভাবেই মেনে চলা উচিত।
অভিভাবকরা হাম কিভাবে বুঝবে? এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, শিশুর হাম হয়েছে কিনা এটা প্রায় সর্বশেষ ধাপে বা র্যাশ হওয়ার পর বোঝা যায়। এজন্য আগের গুরুত্বপূর্ণ জটিলতাগুলো দেখা দিলেই শিশুকে হাসপাতালে নিতে হবে। যেমন— হামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং কমন জটিলতা হচ্ছে নিউমোনিয়া। আমরা কিভাবে বুঝব? ঘন ঘন শ্বাস নিবে, শ্বাসের গতিবেগ বেড়ে যাবে, চেস্ট অ্যান্ড রেন বা বুকের খাঁচা নিচের দিকে দেবে যাবে এবং শ্বাসকষ্ট শুরু হবে। তাহলেই বুঝতে পারব এটা নিউমোনিয়া। এই রোগীকে অতি সত্ত্বর হাসপাতালে নিতে হবে এবং ভর্তি করে চিকিৎসার প্রয়োজন রয়েছে। হামে আক্রান্ত শিশুদের ৯৯ শতাংশ ক্ষেত্রেই নিউমোনিয়া নিয়ে আসছে। তারপর হচ্ছে ডায়রিয়া। কারো যদি ডায়রিয়া শুরু হয়, তাহলে তার পানিশূন্যতা পূরণের জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে এবং ভর্তি প্রয়োজন। তারপর হচ্ছে সিভিয়ার কনজাংটিভাইটিস বা চোখ লাল হয়ে যাওয়া ও চোখ ফুলে যাওয়া। এ ধরনের রোগীদের ক্ষেত্রে ভিটামিন এ সাপ্লিমেন্টেশনের প্রয়োজন হয়। না হলে এখান থেকে অন্ধত্ব হতে পারে। তারপরে হচ্ছে এনকেফলাইটিস বা খিঁচুনি হওয়া।
হামে আক্রান্ত হয়ে শিশু মৃত্যুর কারণ প্রসঙ্গে ডা. শ্রীবাস পাল বলেন, আমাদের এখানে যারা আসে, সবাই মোটামুটি সিভিয়ার মারাত্মক নিউমোনিয়া নিয়ে আসছে, যাদের প্রত্যেকেরই অক্সিজেন প্রয়োজন। আমাদের যারা মারা গেছে, এদের যে শুধুমাত্র হাম আর নিউমোনিয়া ছিল তা না, আমাদের এই ২২ জনের মধ্যে অধিকাংশেরই অন্য কোন রোগ ছিল। এর মধ্যে হার্টের কোন না কোন রোগ ছিল। হৃদরোগ হাসপাতাল থেকে আমাদের এখানে অনেকগুলো পেশেন্ট আসছে। মৃত্যুবরণ করা ২২ জনের মধ্যে এক চতুর্থাংশ পাবেন, যাদের হচ্ছে জন্মগত হৃদরোগ ছিল। কারো কিডনি রোগ ছিল, কারো হয়তো অন্য কোন ক্যান্সার ছিল। এজন্য তাদের মৃত্যুটা আসলে এক্সেলারেট হয়েছে।