Image description

সাইবার বুলিংয়ের ভয়ংকর শিকার হওয়া ও ব্যক্তিগত ছবি-ভিডিও ছড়িয়ে নোংরা ভাষায় আক্রমণ করার পর তার গ্রামের বাড়িতে পরিবারের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছিল এবং বন্ধুরা দূরে চলে গিয়েছিল বলে জানান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনবিষয়ক সম্পাদক ফাতিমা তাসনিম জুমা।

 

এক সাক্ষাৎকারে জীবনের টার্নিং পয়েন্ট, সংগ্রামের বাস্তবতা, প্রশাসনিক অচলাবস্থা এবং ব্যক্তিগত বেদনা নিয়ে এশিয়া পোস্টের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলেছেন ঝুমা। এ সময় কীভাবে মনোবল ধরে রেখেছেন এবং পরিবারকেও প্রভাবিত করেছে কি না, এমন প্রশ্নে তিনি এ কথা বলেন।

 

ফাতিমা তাসনিম জুমা বলেন, এটি নিঃসন্দেহে সবচেয়ে কঠিন সময় ছিল। আমি সোশ্যাল মিডিয়ায় একজন প্রাইভেট ব্যক্তি ছিলাম। আমার কোনো অনলাইন উপস্থিতি ছিল না। কিন্তু যখন আমি ডাকসু নির্বাচনে আমার ফর্ম জমা দিয়েছিলাম, তখনই একটি সংগঠিত ক্যাম্পেইন শুরু হয়েছিল আমার বিরুদ্ধে। তারা আমার বিভিন্ন সময়ের কিছু ভিডিও সংগ্রহ করেছিল—যেমন আমি বন্ধুদের সঙ্গে ক্যাম্পাসে মজা করছি, বা কোনো ইভেন্টে আছি। এই ভিডিওগুলোতে কোনো অপরাধ ছিল না, কোনো নৈতিক সমস্যা ছিল না; শুধু একটি তরুণ মেয়ের স্বাভাবিক জীবন।

 

কিন্তু তারা এই ভিডিওগুলোকে সম্পূর্ণভাবে প্রসঙ্গের বাইরে নিয়ে এসে প্রচার করেছিল। একটি ভিডিওতে আমি মজা করে 'জয় বাংলা' বলেছিলাম, এটি ছিল একটি হালকা মুহূর্ত, বন্ধুদের সঙ্গে একটি নিরীহ মজা। কিন্তু তারা এটিকে এমনভাবে উপস্থাপন করেছিল যেন এটি একটি গুরুতর রাজনৈতিক বিবৃতি। যারা এটি ছড়াচ্ছিল তারা জানত যে এটি মিথ্যা প্রসঙ্গে রাখা ছবি, কিন্তু তারা জানাত যে এটি কাজ করবে। সোশ্যাল মিডিয়ায় মানুষের আবেগ উসকানো খুব সহজ এবং এটিই তাদের লক্ষ্য ছিল।

 

ঝুমা বলেন, এটি আমার পরিবারকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। আমার পিতা-মাতা প্রতিদিন চিন্তা করছিলেন, চিন্তায় ভুগছিলেন। আমার গ্রামের বাড়িতে গিয়ে মানুষ আমার পরিবারের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছিল। আমার বন্ধুরা দূরে চলে গিয়েছিল, কারণ তারা বুঝেছিল যে আমার সঙ্গে থাকা তাদের জন্য সমস্যা তৈরি করবে। এটি অত্যন্ত নির্মল এবং মনোযন্ত্রণাদায়ক ছিল। কিন্তু প্রতিটি চ্যালেঞ্জ আমার সংকল্প শক্তিশালী করেছে। আমি বুঝেছিলাম যে আমি সঠিক পথে আছি। সত্যিকারের কাজের জন্য এই ধরনের বাধা সাধারণ।

 

শহীদ ওসমান হাদির ছবি ব্যবহার করে একটা সেবোটাজ চলছে। তার ছবি ব্যবহার করে ডিপিতে ওসমান ভাইয়ের ছবি, কভারে হচ্ছে সাদিক কায়েম, এসএম ফরহাদ এবং মহিউদ্দিনের ছবি মানে ডাকসু ভিপি-জিএস-এজিএসের ছবি এবং সেই আইডি থেকে গালাগালি করছে লিটারালি আমাকে আর ওসমান ভাইকেই।

 

বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সাধারণ ছাত্রী হিসেবে জুলাই আপনার জীবনকে সম্পূর্ণভাবে পরিবর্তন করে দিয়েছে। কীভাবে সাধারণ জীবনযাপনকারী শিক্ষার্থী থেকে আজ এই অবস্থানে এসেছেন?

 

জবাবে ফাতিমা তাসনিম বলেন, আমার জীবনের আগে এবং পরে—এই দুটি অংশকে আলাদা করে দেখা যায় স্পষ্টভাবে। জুলাই আমার জীবনের একটি জলবিভাজক মুহূর্ত। জুলাইয়ের আগে আমি যখন কোনো অন্যায় দেখতাম, আমি প্রতিবাদ করতাম, আন্দোলনে অংশ নিতাম; এটা সত্য। কিন্তু আমার মনের মধ্যে কখনো এমন চিন্তাভাবনা ছিল না যে আমাকে একটি পাবলিক ফেইস হতে হবে, একটি আন্দোলনের নেতৃত্ব দিতে হবে বা সামাজিক মাধ্যমে সক্রিয়ভাবে রাজনৈতিক ভূমিকা পালন করতে হবে। আমার লক্ষ্য ছিল শুধু সত্য কথা বলা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো।

 

কিন্তু জুলাই আমাদের সম্পূর্ণভাবে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছে। রাজপথে আমাদের ভাইবোনদের মৃত্যু দেখলাম, শুধু সংখ্যায় নয়; সরাসরি আমাদের সামনে। আমাদের বন্ধুরা গুম হয়েছে, প্রিয়জনরা গুম হয়েছে। রাস্তায় রক্ত বইতে দেখেছি, মানুষের চিৎকার শুনেছি। সরকারের নির্মম দমন-পীড়ন, মানুষের অসহায়তা—এই সব কিছু দেখে আমার ভেতর থেকে একটি নতুন সাহস জেগে উঠেছে। শুধু সাহস নয়, একটি দায়িত্ববোধ, একটি মিশন, একটি প্রতিশ্রুতি।

 

আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে এই লড়াইটা আমার ব্যক্তিগত সুবিধা বা ক্যারিয়ারের জন্য নয়, এটা মৃত লাখ লাখ মানুষের জন্য, যাদের স্বপ্ন ভেঙে গেছে, যাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার হয়েছে। সেই সব মানুষের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য আমাকে সামনে আসতে হবে। এটা শুধু আমার ব্যক্তিগত পছন্দ নয়, এটা একটি ঐতিহাসিক দায়িত্ব।

 

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো যারা আমাকে থামাতে চেয়েছে, যারা আমার ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে, তাদের প্রতিটি প্রচেষ্টা আমাকে আরও শক্তিশালী করেছে। আমি জানি, যারাই সিগনিফিক্যান্ট হয়ে উঠবে, যারাই রিলেভেন্ট হয়ে উঠবে, যারাই ভোকালটা স্ট্রং রাখবে তাদেরকে টার্গেট করা হবে। যতবার আমাদেরকে টার্গেট করা হয় আমরা তত বেশি শক্তিশালী হই। আমাদেরকে টার্গেট করা হলে আমরা ১০ গুণ শক্তি নিয়ে ফিরি। আমরা শহীদ শরিফ উসমান বিন হাদির সহযোদ্ধা, আমাদেরকে তো এত সহজে টলানো যাবে না।