Image description

প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে ঠাকুরগাঁও জেলায় ফিলিং স্টেশনগুলোতে জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। প্রতিদিন তেলের জন্য এক পাম্প থেকে আরেক পাম্পে ছুটছেন ক্রেতারা। কোথাও সীমিত পরিমাণ তেল এলেও তা দীর্ঘ লাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে শেষ হয়ে যাচ্ছে। অনেক সময় দীর্ঘ চেষ্টা সত্ত্বেও তেল না পেয়ে গ্রাহকরা ফিরে যাচ্ছেন।

তবে পাম্পে তেল না মিললেও একই সময়ে স্থানীয় হাট-বাজারগুলোতে অতিরিক্ত দামে প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে ডিজেল, পেট্রোল ও অকটেন। এই বৈপরীত্যে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ ভোক্তা, বিশেষ করে কৃষক ও মোটরসাইকেল চালকেরা।

সরেজমিনে দেখা গেছে, জেলার বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাড়িয়ে থেকেও কাঙ্ক্ষিত তেল পাচ্ছেন না গ্রাহকেরা। অধিকাংশ পাম্পেই ‘তেল নেই’লেখা নোটিশ ঝুলছে। কোথাও সীমিত সরবরাহ এলেও তা দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে। ফলে অনেক যানবাহন তেল না নিয়েই ফিরে যাচ্ছে। এ নিয়ে কোথাও কোথাও বাকবিতণ্ডা ও উত্তেজনার ঘটনাও ঘটছে।

জেলার বিভিন্ন হাট-বাজার থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা গেছে, রুহিয়া রামনাথ হাটে প্রতি লিটার পেট্রোল ২৭০ টাকা, সেনিহারী বাজারে ৩৫০ টাকা, ঢোলারহাটে ৩১০ টাকা, আকচা ইউনিয়নের ফাড়াবাড়ি বাজারে ২৫০ টাকা, রানীশংকৈল চেকপোস্ট বাজারে ২৩০টাকা, ধনিরহাটে ৩০০টাকা, ভরনিয়া বাজারে ৩২০টাকা, বাদামবাজারে ২৮০ টাকা, সনগাঁও বাজারে ৩০০ টাকা, লাহিড়ী বাজারে ২৬০ টাকা, কাচকালী বাজারে ৩০০ টাকা, পল্লীবিদ্যুৎ বাজারে ২৮০ টাকা এবং কাউন্সিল বাজারে ২৫০ টাকায় তেল বিক্রি হচ্ছে।

 

অথচ সরকার নির্ধারিত দামে পেট্রোল প্রতি লিটার ১১৬ টাকা এবং অকটেন ১২০ টাকা থাকার কথা।

এদিকে, গত বৃহস্পতিবার রাতে শহরের একটি ফিলিং স্টেশনে তেল সংগ্রহকে কেন্দ্র করে দীর্ঘ লাইনে দাড়ানো গ্রাহকদের মধ্যে তর্ক-বিতর্কের একপর্যায়ে সংঘর্ষে রূপ নেয়। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে ৫০-৬০ জনের একটি অজ্ঞাতপরিচয় দল স্টেশনে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করে। এতে অন্তত দুই স্টাফ আহত হন। একই রাতে শহরের বিসিক এলাকায় একটি ফিলিং স্টেশনে অভিযান চালিয়ে তেল কম দেওয়ার অভিযোগে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করেছে প্রশাসন। অভিযোগ ছিল মজুত থাকা সত্ত্বেও গ্রাহকদের তেল না দিয়ে গড়িমসি করা হচ্ছিল।

এছাড়া, শহরের আরেকটি ফিলিং স্টেশনে তেল না দেওয়াকে কেন্দ্র করে উত্তেজনার সৃষ্টি হলে ঘটনাস্থলে উপস্থিত সাংবাদিকদের ছবি ধারণে বাধা দেওয়া হয়। একপর্যায়ে তাদের মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়ার চেষ্টাও করা হয়।

মোটরসাইকেল চালক রাশেদ বলেন, পাম্পে গেলেই বলা হচ্ছে তেল নেই, অথচ একটু দূরে গেলেই একই তেল বোতলে করে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। তাহলে প্রশ্ন হলো, এ তেলগুলো আসছে কোথায় থেকে? পাম্পে যদি সত্যিই তেল না থাকে, তাহলে বাজারে এলো কীভাবে? বিষয়টা সাধারণ মানুষের কাছে খুবই সন্দেহজনক মনে হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, আমাদের কাছে এটা স্পষ্ট, এখানে একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট কাজ করছে। তারা পরিকল্পিতভাবে ফিলিং স্টেশনগুলোতে সরবরাহ সীমিত রেখে বা বন্ধ দেখিয়ে বাইরে বেশি দামে তেল বিক্রি করছে। এতে করে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে অতিরিক্ত মুনাফা লুটে নেওয়া হচ্ছে।

কৃষক আব্দুল মালেক বলেন, এখন সেচের মৌসুম চলছে। এ সময়টায় জমিতে নিয়মিত পানি দিতে না পারলে ধানসহ অন্যান্য ফসল বাচানো একেবারেই কঠিন হয়ে পড়ে। কিন্তু ডিজেল সংকটের কারণে আমরা ঠিকমতো সেচ দিতে পারছি না। ফিলিং স্টেশনগুলোতে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাড়িয়েও তেল পাওয়া যাচ্ছে না। খালি হাতে ফিরে আসতে হচ্ছে। অন্যদিকে খোলা বাজারে তেল পাওয়া গেলেও সেখানে দাম এত বেশি যে আমাদের মতো সাধারণ কৃষকদের পক্ষে তা বহন করা খুবই কষ্টকর। তারপরও ফসল বাঁচানোর জন্য বাধ্য হয়ে বেশি দামে তেল কিনতে হচ্ছে।

তবে একাধিক ফিলিং স্টেশন মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক নয়। চাহিদা বেশি হওয়ায় যা আসে তা দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে।

ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. খাইরুল ইসলাম বলেন, যেখানে অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে, সেখানে অভিযান চালানো হচ্ছে। কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। অবৈধভাবে তেল মজুত ও বেশি দামে বিক্রির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।