অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দেড় বছরের বেশি সময়ে রাজধানীর মোহাম্মদপুর ও আদাবর থেকে আট হাজারের বেশি অপরাধীকে গ্রেপ্তার করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এ সময় দুই থানায় চাঁদাবাজি, ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধের ঘটনায় মামলা হয় দুই হাজারের বেশি। তবু কমছে না অপরাধ।
২০২৪ সালে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের পুলিশ–ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। এ সুযোগে মোহাম্মদপুর, আদাবর, বছিলা এলাকায় পেশাদার অপরাধীরা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। খুনোখুনির পাশাপাশি দেশি অস্ত্র ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে প্রকাশ্য মহড়া, প্রতিষ্ঠান দখলে গুলি, হামলাসহ একের পর এক সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটে। বেপরোয়াভাবে চাঁদাবাজি শুরু করে বিভিন্ন সন্ত্রাসী দল।
এরপর যৌথ বাহিনীর অভিযান শুরু হলে পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসে। অপরাধীরা গা ঢাকা দেয়। তবে এদের কাউকে কাউকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রচারে অংশ নিতে দেখা গেছে। নির্বাচন শেষে তাদের আশ্রয়েই আবার তারা সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে বলে পুলিশের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের পর থেকে মোহাম্মদপুর ও আদাবর এলাকায় চাঁদাবাজি, ছিনতাই, মাদক নিয়ে দ্বন্দ্ব, অবৈধ দোকান বসানো নিয়ে কুপিয়ে জখম করাসহ বিভিন্ন সন্ত্রাসী দলের অন্তত ১০টি অপরাধের ঘটনা সামনে এসেছে।
অন্তর্বর্তী সরকার আমলে দড়ে বছরে এই দুই থানায় ২ হাজার ১০২টি মামলা হয়। মোহাম্মদপুর থানায় হওয়া ১ হাজার ৭৭৫টি মামলার মধ্যে ৩৭টি চাঁদাবাজি, ৪০টি দস্যুতা, ৬টি ছিনতাই, ৫১টি চুরি ও ডাকাতির ঘটনার। আদাবর থানার ৩২৭টি মামলার মধ্যে ৮টি চাঁদাবাজি, ২২টি দস্যুতা, ২৮টি চুরি, ১৫টি ডাকাতির প্রস্তুতি এবং ১৩টি দস্যুতার চেষ্টার।
সর্বশেষ ৮ মার্চ রাতে তারাবিহ্র নামাজ শেষে রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজের পাশে হাঁটাহাঁটির সময় ছিনতাইয়ের শিকার হন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মহাপরিচালক মোতাহার হোসেন। ছিনতাইকারীরা তাঁকে কুপিয়ে তাঁর মুঠোফোন, মানিব্যাগসহ মূল্যবান জিনিসপত্র ছিনিয়ে নেয়। পরে এ ঘটনায় জড়িত দুজনকে জেনেভা ক্যাম্প থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গ্রেপ্তার দুজনই ছিনতাইকারী চক্রের সক্রিয় সদস্য বলে পুলিশ জানিয়েছে।
এর আগে ২১ ফেব্রুয়ারি রাতে আদাবরের মনসুরাবাদ হাউজিংয়ের আবির এমব্রয়ডারি কারখানায় হামলা চালায় একদল সন্ত্রাসী। চাঁদা চেয়ে না পাওয়া এবং কারখানার শ্রমিকদের মুঠোফোন ছিনতাইয়ে বাধা দেওয়ায় এ হামলা হয়। প্রতিবাদে কারখানাটির মালিক-শ্রমিকেরা ওই রাতেই আদাবর থানা ঘেরাও করেন। পরে হামলায় জড়িত রোহান খান রাসেলসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
একই দিন বিকেলে মোহাম্মদপুরের বছিলা রোডের ময়ূরভিলা এলাকায় চাঁদা আদায়ে বাধা দেওয়ায় মো. রাসেল ও মো. মামুন নামে দুজনকে কুপিয়ে জখম করে একদল সন্ত্রাসী। বছিলা রোড এলাকার ফুটপাতের দোকানিদের কাছে চাঁদা চাওয়ায় বাধা দিলে তাঁদের ওপর হামলা করা হয়।
একই ব্যক্তিকে একাধিকবার গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। কিছুদিন পর আদালত থেকে জামিন নিয়ে তাঁরা আবার একই অপরাধে জড়াচ্ছেন। এভাবে চললে কোনোভাবেই এখানকার অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না।
পরদিন ২২ ফেব্রুয়ারি রাত সাড়ে ১০টার দিকে বছিলা রোডের একই এলাকায় জুলাই হত্যা মামলার সাক্ষী ইব্রাহিম খলিলকে (২৯) অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে জখম করা হয়। এ দুই ঘটনার সঙ্গে জড়িত সোহেল ওরফে গ্যারেজ সোহেলকে পরে গ্রেপ্তার করে র্যাব। এ সময় তাঁর কাছ থেকে বিদেশি রিভলবার ও ধারালো অস্ত্র উদ্ধার করা হয়।
এমন পরিস্থিতিতে মোহাম্মদপুর ও আদাবর থানা পুলিশ বলছে, নির্বাচনী ব্যস্ততায় গ্রেপ্তার অভিযান কিছুটা শিথিল থাকায় মোহাম্মদপুর ও আদাবর এলাকার কিশোর গ্যাং, ছিনতাইকারী ও চাঁদাবাজেরা আবার সক্রিয় হয়েছে। এই এলাকার শীর্ষ সন্ত্রাসীদের মদদে ঈদকে সামনে রেখে তারা তৎপর হচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অভিযান শুরু করেছে পুলিশ।
নতুন সরকার গঠনের পর পুলিশের নতুন মহাপরিদর্শক (আইজিপি) হিসেবে আলী হোসেন ফকির দায়িত্ব নিয়েছেন। দায়িত্ব নেওয়ার পর ২৬ ফেব্রুয়ারি গভীর রাতে মোহাম্মদপুর এলাকা পরিদর্শনে যান তিনি। পরিদর্শনে গিয়ে তিনি নতুন করে অভিযানের কথা জানান।
আলী হোসেন ফকির সাংবাদিকদের জানান, কিশোর গ্যাং, ছিনতাইকারী ও মাদক কারবারিদের তৎপরতায় সাধারণ মানুষ ভীতির মধ্যে আছে। এ কারণে তিনি নিজেই পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রাস্তায় নেমেছেন। সন্ধ্যার পর বিশেষ ব্লক রেইড পরিচালনা করে ছিনতাইকারী থেকে শুরু করে মাদকসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনার কার্যক্রম চলছে।বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্প এলাকায় নিজে ছিনতাইয়ের শিকার হওয়ার কথা জানিয়ে আইজিপি বলেন, মোহাম্মদপুর দীর্ঘদিন ধরেই অপরাধপ্রবণ এলাকা। এখানে বিভিন্ন অবৈধ ব্যবসার বিস্তার রয়েছে।
দুই থানায় গ্রেপ্তার ৮ হাজার
ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের বেশি সময়ে রাজধানীর মোহাম্মদপুর ও আদাবর থানায় আট হাজারের বেশি অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা হয়। বেশির ভাগই গ্রেপ্তার হয় চাঁদাবাজি, ছিনতাই, দস্যুতা ও চুরির অপরাধে। অনেকেই পরে জামিনে বের হয়ে যান।
এ সময় ২ থানায় ২ হাজার ১০২টি মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে মোহাম্মদপুর থানায় ১ হাজার ৭৭৫টি এবং আদাবর থানায় ৩২৭টি। এর মধ্যে জুলাই-আগস্টে সংঘটিত বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ঘটনায় দুই থানায় ৫২টি মামলা হয়। মোহাম্মদপুর থানায় ৩৫টি এবং আদাবর থানায় ১৭টি মামলা হয়েছে।
পুলিশের তথ্যমতে, মোহাম্মদপুর থানায় হওয়া ১ হাজার ৭৭৫টি মামলার মধ্যে ৩৭টি চাঁদাবাজি, ৪০টি দস্যুতা, ৬টি ছিনতাই, ৫১টি চুরি ও ডাকাতির ঘটনার। আদাবর থানার ৩২৭টি মামলার মধ্যে ৮টি চাঁদাবাজি, ২২টি দস্যুতা, ২৮টি চুরি, ১৫টি ডাকাতির প্রস্তুতি এবং ১৩টি দস্যুতার চেষ্টার।
এ বিষয়ে ডিএমপির মোহাম্মদপুর অঞ্চলের অতিরিক্ত উপকমিশনার জুয়েল রানা প্রথম আলোকে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত মোহাম্মদপুর ও আদাবর এলাকা থেকে আট হাজারের বেশি অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে বেশিরভাগই চুরি, ছিনতাই, চাঁদাবাজির ঘটনায় গ্রেপ্তার হন। এসব ঘটনায় মামলাও হয়েছে বেশি। যখনই কোনো ঘটনা ঘটে, সেটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

জামিনে বেরিয়ে আবার অপরাধে
১৯ ফেব্রুয়ারি মোহাম্মদপুর থানার বছিলা সিটি ডেভেলপার্স এলাকায় এক গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবসায়ীর কাছে দুই লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন মো. ফারুক ও তাঁর সহযোগীরা। চাঁদা না দিলে গুলি করার হুমকি দেন। একপর্যায়ে দোকানের কর্মচারীকে ইলেকট্রিক শক দিয়ে চলে যান তাঁরা। একই দিন বছিলার ৪০ ফিট রোডে এ কে পিচ টাওয়ারের সব দোকান বন্ধ রাখারও নির্দেশ দেয় তারা। দোকানের সিসি ক্যামেরায় এ দৃশ্য ধরা পড়ে।
পরে এ ঘটনায় জড়িত ফারুককে (৫০) গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের পর ফারুককে নিয়ে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে মাইকিংও করেছিল পুলিশ। ঘটনাটি সে সময় বেশ আলোচনা তৈরি করেছিল।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্র বলছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে চাঁদাবাজির ঘটনায় তিনবার সেনবাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন ফারুক। জামিনে বের হয়ে আবার একই অপরাধে অপরাধে জড়ান। তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে।
এ ছাড়া আদাবরের আবির এমব্রয়ডারি কারখানায় হামলার ঘটনায় গ্রেপ্তার রোহান খান রাসেলের বিরুদ্ধে তিনটি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে একটি মামলায় গ্রেপ্তারও হন তিনি।
নির্বাচনের পর থেকে গত দুই সপ্তাহে মোহাম্মদপুর ও আদাবরে অভিযান চালিয়ে বিভিন্ন অপরাধে দেড় শর বেশি ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৫ ফেব্রুয়ারি ঈদকে সামনে রেখে বিশেষ সাঁড়াশি অভিযানে এ দুই থানার বিভিন্ন এলাকা থেকে ৯৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরদিন ২৬ ফেব্রুয়ারি মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্প থেকে আরও ৩৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ ছাড়া চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও কুপিয়ে জখমের ঘটনায় আরও ১০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব।
গ্রেপ্তার করেও অপরাধ কমাতে না পারার বিষয়ে মোহাম্মদপুর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) রাকিবুজ্জামান তালুকার প্রথম আলোকে বলেন, একই ব্যক্তিকে একাধিকবার গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। কিছুদিন পর আদালত থেকে জামিন নিয়ে আবার একই অপরাধে জড়াচ্ছেন। এভাবে চললে কোনোভাবেই এখানকার অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না।’
এই এলাকার অপরাধ নিয়ন্ত্রণে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন অতিরিক্ত উপকমিশনার জুয়েল রানা। তিনি বলেন, এ এলাকায় ভাসমান মানুষের সংখ্যা অনেক বেশি। তারা নানা অপরাধ করে জীবিকা নির্বাহ করে। ফলে শুধু গ্রেপ্তার, মামলা দিয়ে এই এলাকার অপরাধ কমানো যাবে না। এ জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হবে। শুধু দুটি থানা দিয়ে হবে না।