একদিকে পড়ছে ক্ষেপণাস্ত্র। হচ্ছে ড্রোন হামলা। বিস্ফোরণে কেঁপে উঠছে গোটা এলাকা। এই ভয়ার্ত পরিবেশেই দুবাইয়ে কাজ করছেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা। কর্মক্ষেত্রে মৃত্যু তাড়া করছে তাদের। কখন কোথায় মিসাইল-ড্রোন পড়বে কেউ জানেন না। তার ওপর কঠোর বিধি লঙ্ঘনে চলছে গ্রেপ্তার। শিকার হচ্ছেন নানা বিড়ম্বনার। সোমবার সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিভিন্ন স্থানে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে প্রবাসীসহ স্থানীয়দের মধ্যে। দুবাই বিমানবন্দরের কাছে একটি ড্রোন হামলায় জ্বালানি ট্যাংকে আগুন লাগায় ফ্লাইট চলাচলে সাময়িক বিঘ্ন ঘটে। অন্যদিকে আবুধাবিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় এক ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে আমিরাতে এ পর্যন্ত সাতজনের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। এসব বিষয়ে মানবজমিন সরাসরি যোগাযোগ করেছে দুবাইয়ে বসবাসরত বাংলাদেশিদের সঙ্গে। তারা জানিয়েছেন, দুবাইয়ে সবকিছু স্বাভাবিক থাকলেও আতঙ্ক বড় বিষয় হয়ে জনজীবনে প্রভাব ফেলছে। কখন কীভাবে কোথায় হামলা হবে কেউ জানেন না। হামলা হচ্ছে দুবাইয়ের বিভিন্ন স্থাপনায় তবে চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে।
এদিকে আবুধাবি শহরের কাছাকাছি একটি এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে একটি চলন্ত গাড়িতে। এতে একজন ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিক নিহত হন। সূত্র জানিয়েছে, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত আমিরাতে মোট সাতজন নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে পাঁচজন বেসামরিক নাগরিক এবং দুইজন সামরিক সদস্য। ফুজাইরাহ এলাকাতেও ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে। সেখানে তেলের অবকাঠামোতে আগুন লাগার খবর পাওয়া গেছে।
যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে নিরাপত্তা উদ্বেগ বেড়েছে। অনেকেই ঘরের বাইরে কম বের হচ্ছেন। ফলে দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় পণ্য আনা-নেয়ার ক্ষেত্রে ডেলিভারি সেবার চাহিদা বেড়েছে। এ কাজে যুক্ত হয়ে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও নেপালের বহু প্রবাসী শ্রমিক রাস্তায় রাস্তায় ছুটছেন। তবে এতে ঝুঁকিও বাড়ছে তাদের জীবনে।
জানা গেছে, ইরানের পাল্টা হামলা শুরুর পরদিনই দুবাইয়ে এক বাংলাদেশি ডেলিভারি রাইডার তুলনামূলক ফাঁকা রাস্তায় কাজ করে সেদিন ভালো আয় করেছিলেন। কিন্তু সংঘাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রবাসীদের মৃত্যুর খবরও সামনে আসতে শুরু করে।
দুবাই সিটিতে কর্মরত এক বাংলাদেশি শ্রমিক মানবজমিনকে বলেন, দুবাইয়ে থাকা বাংলাদেশি শ্রমিকদের অবস্থা খুব বেশি ভালো নেই। সরকারের গোয়েন্দা সংস্থার নজরদারির মধ্যেই থাকতে হচ্ছে আমাদের। সোশ্যাল মিডিয়ায় যুদ্ধ বা দুবাইয়ের কোনো ছবি-ভিডিও প্রকাশ না করার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
দুবাইয়ের আরেক শহরে বসবাসকারী জাহিদ হাসান বলেন, এখন পরিস্থিতি নিয়ে দেশে থাকা অনেকে যোগাযোগ করেন। কিন্তু এ বিষয়ে কোনো তথ্য শেয়ার করা কঠিন হয়ে পড়েছে। কারণ এখানকার সরকার নিয়মকানুন আরও কঠোর করেছে। কেউ যুদ্ধসংক্রান্ত ছবি বা ভিডিও শেয়ার করলে তাকে শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে প্রায় শতাধিক শ্রমিককে এ কারণে আটক করা হয়েছে বলেও তিনি জানান।
দুবাইতে অবস্থানরত কুতুব উদ্দিন নামের এক প্রবাসী মানবজমিনকে জানান, বিস্ফোরণ-হামলা আতঙ্ক তো আছেই। কিন্তু কাজ কোনোভাবে থেমে নেই। আমাদের পেটের দায়ে কাজটা করে যেতে হচ্ছে। দেশে স্বজনরা আছে। তাদের জন্য আমাদের কাজ করতে হয়। তবে সরকার থেকে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা দেয়া হচ্ছে। তারপরও সারাক্ষণ ভয়-আতঙ্কে থাকি।
দুবাই বিমানবন্দরের কাছেই বসবাসকারী মামুন বলেন, আজ ভোরেও হামলার শব্দ শোনা গেছে। এখানে একের পর এক হামলার ঘটনায় মানুষের মধ্যে আতঙ্ক রয়েছে। তবে কাজকর্ম পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। স্বাভাবিক কার্যক্রম চললেও এক ধরনের চাপা উদ্বেগ বিরাজ করছে।
দুবাইয়ে অবস্থানরত চাঁপাইনবাবগঞ্জের আব্দুল ওয়াদুদ মানবজমিনকে বলেন, আমাদের এখানে সব কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে। দূতাবাস থেকে আমাদের সতর্ক করা হয়েছে। সবরকম নিয়মকানুন মেনে থাকতে হচ্ছে।
এদিকে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, দুবাইসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সরকারের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করছে বাংলাদেশ। বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশি কাউন্সিলর অফিসগুলো প্রবাসী শ্রমিকদের সমস্যার বিষয়েও কাজ করছে।
মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, সৌদি আরব, কাতার, বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ কয়েকটি দেশে ফ্লাইট চলাচলে সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে চার্টার ফ্লাইট পরিচালনা করা হচ্ছে।
এদিকে, ইরান-ইসরাইল যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ হতে বাংলাদেশে ছুটিতে আসা প্রবাসী কর্মীদের ভিসার মেয়াদ বৃদ্ধি সংক্রান্ত বিষয়ে গণবিজ্ঞপ্তি দিয়েছে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ইরান-ইসরাইল যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে ছুটিতে অবস্থানকালে যেসব কর্মীর ভিসার মেয়াদ ইতিমধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে বা শিগগিরই উত্তীর্ণ হতে যাচ্ছে এবং এ মুহূর্তে সংশ্লিষ্ট দেশে গিয়ে ভিসা নবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না, তাদের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দেশসমূহ নিম্নরূপ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে- সৌদি আরব, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান এবং বাহরাইন হতে বাংলাদেশে আসা কর্মীগণের ভিসা নবায়নের জন্য কর্মীর নিয়োগকর্তা, স্পন্সর বা কফিলের মাধ্যমে যোগাযোগ/অনলাইনে আবেদন করতে হবে; কুয়েত, কাতার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকার ইতিমধ্যে যে সকল ভিসার মেয়াদ শেষ হয়েছে বা শেষ হওয়ার পথে এমন সকল এন্ট্রি ভিসার মেয়াদ ১ মাস বৃদ্ধি করেছে।
প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন মানবজমিনকে বলেন, এসব বিষয়ে শ্রমিকদের আগেই বিভিন্ন মাধ্যমে সতর্ক করা হয়েছে। আমরা নিজেরাও তাদেরকে নিষেধ করেছি। এমনকি ওই দেশে অবস্থিত বাংলাদেশের দূতাবাস থেকেও বলা হয়েছে- যুদ্ধ পরিস্থিতি বা নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট কোনো তথ্য, ছবি বা ভিডিও যেন তারা হোয়াটসঅ্যাপ, ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার না করেন। এরপরও কেউ যদি অতিরিক্ত উৎসাহী হয়ে ওই দেশের আইন ভঙ্গ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু পোস্ট করেন, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই তিনি আইনের আওতায় পড়বেন।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক নুর মানবজমিনকে বলেন, আমাদের দেশের মানুষ ফেসবুকে খুবই সক্রিয়। তবে আমরা বারবার সতর্ক করে আসছি যে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে আইন-কানুন বেশ কঠোর। তাই সেখানে অবস্থানরত সবাইকে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট দেশের আইন মেনে চলতে হবে। সাম্প্রতিক যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের পোস্ট বা কনটেন্ট ছড়াতে দেখা যাচ্ছে। এর আগেও আমরা দেখেছি, এ ধরনের ঘটনার জেরে বাহরাইনে একজন বাংলাদেশি গ্রেপ্তার হয়েছেন।
তিনি বলেন, অনেক সময় এসব কনটেন্টকে সঠিক সংবাদ নয় বা এআই-জেনারেটেড কনটেন্ট হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু কেউ যদি এসব প্রচার করে এবং তাতে কোনো সমস্যা তৈরি হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট দেশের আইন অনুযায়ীই ব্যবস্থা নেয়া হয়। সেক্ষেত্রে আমাদের পক্ষ থেকে খুব বেশি কিছু করার সুযোগ থাকে না- শুধু মানবিক দিক বিবেচনার অনুরোধ করা যেতে পারে। তাই যারা মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে থাকেন, তাদের প্রতি আমাদের অনুরোধ থাকবে- সেখানে যে আইন-কানুন ও বিধিবিধান রয়েছে, সেগুলোর প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকুন এবং সেগুলো মেনে চলুন। আমরা অবশ্যই আমাদের দেশের নাগরিকদের জন্য চেষ্টা করবো, কিন্তু সবার আগে তাদের নিজেদেরই সতর্ক থাকতে হবে।