Image description

কর্মকর্তাদের জন্য বাসাভাড়া করা হয়। সাত বছরে এজন্য দিতে হয়েছে ৭৭ লাখ টাকার বেশি। কিন্তু এসব বাসায় কখনো থাকেননি। বরং হোটেলে বিলাসী জীবন কাটিয়েছেন কর্মকর্তারা, যার জন্য প্রায় ২ কোটি ৮০ লাখ টাকা বাড়তি দিতে হয়েছে সরকারকে।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কর্মকর্তাদের রাশিয়ায় এমন হোটেল বিলাসে সরকারের গচ্চা গেছে প্রায় ৩ কোটি টাকা। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশের কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল (সিএজি) কার্যালয়ের নিরীক্ষায় কাজ ছাড়াই লাখ লাখ টাকা বেতন, শত কোটি টাকা ব্যয়েও জনবলের অদক্ষতা, এক ব্যক্তির তিন শীর্ষ পদ দখলে রাখার মতো নানা অনিয়ম উঠে এসেছে।

দেশের সবচেয়ে ব্যয়বহুল রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রকল্পের ২০১৬-১৭ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের নিরীক্ষা করেছে সিএজির একটি দল। এরপর গত বছর নিরীক্ষা প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়। এতে দেখা যায়, ২০১৬-১৭ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত রূপপুর প্রকল্পের বিভিন্ন যন্ত্রপাতি অডিট ও ইন্সপেকশনের জন্য রাশিয়ান ফেডারেশনের তিনটি অঞ্চলে আবাসিক সুবিধাসহ পৃথক ‘কোয়ালিটি ইন্সপেকশন ইউনিট’ স্থাপন করে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ। ২০১৮-১৯ থেকে ২০২৩-২৪ সাল পর্যন্ত এই তিনটি ফ্ল্যাটের ভাড়া মেটাতে প্রকল্পের তৎকালীন উপপ্রকল্প পরিচালক (ডিপিডি) ড. জাহেদুল হাছান ৭৭ লাখ ৩ হাজার ৪২৯ টাকা তহবিল থেকে উত্তোলন করেন।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ৩ থেকে ১০ সদস্যের ইন্সপেকশন টিম সরকারি আদেশে বিভিন্ন সময় রাশিয়ায় গেছেন। তারা ওই তিন অঞ্চল পরিদর্শন করলেও কখনো সরকার নির্ধারিত বাসায় থাকেননি। ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ১২৫টি ভাউচারের মাধ্যমে তাদের হোটেল ভাড়াবাবদ ২ কোটি ৭৯ লাখ ৫৩ হাজার ৬০০ টাকা পরিশোধ করতে হয়েছে।

অডিট দলের ভাষ্য, সরকার নির্ধারিত বাসা থাকার পরও হোটেলে অবস্থান দেখিয়ে বিল পরিশোধের সুযোগ নেই। তা ছাড়া রাশান ফেডারেশনে তিনটি বাসা ভাড়া নেওয়ার জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের নথি পাওয়া যায়নি। এমনকি বাসাভাড়া পরিশোধে নগদ অর্থ সমন্বয়ের প্রমাণও মেলেনি।

এ ব্যাপারে প্রকল্পের পরিচালক (পিডি) ড. কবীর হোসেন স্ট্রিমকে বলেন, অডিটে (নিরীক্ষা) একশর বেশি বিষয়ে আপত্তি ছিল। এতগুলোর মধ্য থেকে আলাদা করে হোটেলে থাকার বিষয়টি মনে করতে পারছি না।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প উদ্বোধন হয় ২০১৩ সালের অক্টোবরে। পাবনার ঈশ্বরদীর রূপপুরে রাশান ফেডারেশনের কারিগরি সহায়তায় সর্বাধুনিক ৩ প্লাস জেনারেশনের ভিভিইআর-১২০০ প্রযুক্তির এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুটি ইউনিটের মাধ্যমে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার কথা। ২০২৩ সাল থেকে এখানকার বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়ে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার কথা ছিল। তবে এখন পর্যন্ত সংশ্লিষ্টরা শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের নতুন নতুন সময়সীমা দিয়েই যাচ্ছেন।

প্রশিক্ষণের ঘাটতি, মেলেনি দক্ষতা

রূপপুর প্রকল্প পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (এনপিসিবিএল) কর্মকর্তাদের দক্ষতার অভাব ও অর্থের অপচয় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, রুশ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান থেকে এনপিসিবিএল কর্মীদের এমনভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথা, যাতে তারা বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে পুরোপুরি সক্ষম হন। কিন্তু বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (বাপশনিক) জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক গাইডলাইন অনুযায়ী কেন্দ্র পরিচালনার জন্য ৪৪ জনের আটটি ক্যাটাগরিতে লাইসেন্স প্রয়োজন। অথচ এনপিসিবিএল কর্মকর্তাদের অভিজ্ঞতার অভাবে মাত্র দুটি ক্যাটাগরিতে লাইসেন্স দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

এর মানে বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও কর্মকর্তারা সার্টিফাইড এক্সপার্ট হওয়ার দক্ষতা অর্জন করতে পারেননি। নিরীক্ষা দলের দাবি, এনপিসিবিএলের তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ড. শৌকত আকবর নির্ধারিত প্রশিক্ষণার্থীর বদলে খেয়ালখুশিমতো অন্য ক্যাটাগরির লোকজন রাশিয়ায় পাঠিয়েছেন। এতেও সরকারি অর্থের অপচয় হয়েছে।

কাজ ছাড়াই ‘বিশেষজ্ঞ’ পদে লাখ লাখ টাকা বেতন

আইনি সুযোগ না থাকলেও এনপিসিবিএলের ১৩৯তম বোর্ড সভায় ‘ইলেকট্রিক্যাল পাওয়ার স্পেশালিস্ট’ নামে একটি অস্থায়ী পদ সৃষ্টি করা হয়। এই পদে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ফজলুল হককে ১ লাখ ৭৫ হাজার টাকা মূল বেতনে নিয়োগ দেওয়া হয়। ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে ২০২৪ সালের একই সময়ে তাঁকে ৪৪ লাখ ৬৪ হাজার ৬৯৭ টাকা দেওয়া হয়েছে।

ফজলুল হকের মূল দায়িত্ব ছিল পাওয়ার পারচেজ অ্যাগ্রিমেন্ট (পিপিএ) চূড়ান্ত এবং গ্রিড সংযোগের কাজ সমন্বয়। কিন্তু নিরীক্ষা বলছে, এখনো বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজই শেষ হয়নি। সঞ্চালন লাইনও প্রস্তুত নয় এবং পিপিএ স্বাক্ষরের সময়ও আসেনি। ফলে কোনো কাজ ছাড়াই তাঁকে বিপুল অঙ্কের বেতন দিয়ে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ক্ষতি করা হয়েছে।

লাখ টাকা ব্যয়েও অধরা চাকরি বিধিমালা

এনপিসিবিএল একটি পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি হিসেবে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র আইন-২০১৫ অনুযায়ী পরিচালিত হওয়ার কথা। কোম্পানিটি গঠনের পর থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত ১৯৬টি বোর্ড সভা হয়েছে। প্রতি সভায় সম্মানী ও অন্যান্য খরচবাবদ ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে।

এতগুলো সভার পরও কোম্পানির চাকরি বিধিমালা চূড়ান্ত করা যায়নি। এমনকি তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, ডিকমিশনিং পরিকল্পনা বা জরুরি অবস্থা মোকাবিলার মতো পারমাণবিক নিরাপত্তার মূল বিষয়গুলো নিয়ে বোর্ড সভায় কোনো আলোচনাই হয়নি।

এক ব্যক্তির দখলে শীর্ষস্থানীয় ৩ পদ

প্রকল্পের বেহাল দশার অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে শীর্ষ নেতৃত্বের চরম গাফিলতি এবং ক্ষমতা কুক্ষিগত করা। ড. শৌকত আকবর একই সঙ্গে রূপপুর প্রকল্পের (১ম ও মূল পর্যায়) প্রকল্প পরিচালক এবং এনপিসিবিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। আইনি বৈধতা না থাকলেও সাধারণ সভার নামে তাঁকে দ্বিতীয় দফায় এমডি করা হয়। এমনকি ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে শৌকত আকবর বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের (বাপশক) চেয়ারম্যান পদে আসীন হন।

নিরীক্ষায় বলা হয়েছে, একই ব্যক্তির হাতে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পদ থাকায় কাজের মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে। ঠিকাদারের নির্মাণকাজে বিলম্ব হওয়া সত্ত্বেও চুক্তির শর্ত অনুযায়ী কোনো জরিমানা (এল/ডি) আরোপ করা হয়নি। সঞ্চালন লাইন নির্মাণের সমন্বয়, পিপিএ এবং কোম্পানির নিয়োগবিধিও চূড়ান্ত হয়নি।

এ ব্যাপারে বর্তমান প্রকল্প পরিচালক ড. কবীর হোসেন বলেন, ‘এগুলো আগের ইস্যু। আমি নতুন দায়িত্ব নিয়েছি। তবে এসব অডিট আপত্তির জবাব দেওয়া হয়েছে।’

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের আওতায় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প পরিচালিত হচ্ছে। মন্ত্রণালয়ের সচিব আনোয়ার হোসেন স্ট্রিমকে বলেন, অডিট নিয়মিত বিষয়। এক্ষেত্রে আপত্তি থাকলে তার জবাব দেওয়া হচ্ছে। এসব অডিট আপত্তি থেকে আলাদা করে কোনো ঘটনার বিষয়ে মন্তব্য করা কঠিন।

যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র কেবল উচ্চ প্রযুক্তিনির্ভর অবকাঠামো নয়; এটি মানুষের দক্ষতা ও নৈতিকতার ওপর নির্ভরশীল। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার নির্দেশিকা অনুযায়ী মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতার অভাব থাকলে পারমাণবিক নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়ে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম স্ট্রিমকে বলেন, অডিট আপত্তিগুলোর নিষ্পত্তি হয়েছে কিনা জানা দরকার। সরকার কী ব্যবস্থা নিল, সেটিও আমরা জানি না। সরকারি প্রতিষ্ঠানের অডিটেই যদি এত অনিয়ম উঠে আসে, তাহলে আমরা স্বচ্ছতা কীভাবে আশা করব? এসব ঘটনা থেকে প্রকৃত চিত্র কতটা ভয়ঙ্কর তা আঁচ করা যায়।

তিনি বলেন, মেগা এই প্রকল্পে স্বচ্ছ মানবসম্পদ কাঠামো ও যোগ্য নেতৃত্ব চরমভাবে ব্যাহত হয়েছে। রাষ্ট্র সত্যিই রূপপুরকে একটি নিরাপদ ও টেকসই প্রকল্প হিসেবে দেখতে চায়, তবে দুর্নীতির লাগাম টানা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার বিকল্প নেই।