মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট বিঘ্নের মধ্যে বাংলাদেশগামী অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজগুলো যাতে নিরাপদে হরমুজ প্রণালি পেরিয়ে আসতে পারে, সে জন্য ইরানের কাছে কূটনৈতিক সহায়তা চেয়েছে ঢাকা।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ গতকাল ঢাকায় অবস্থিত ইরানি দূতাবাসে একটি চিঠি পাঠিয়েছে। এতে বাংলাদেশগামী অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজ চলাচল সহজ করতে সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে বলে কর্মকর্তারা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে (টিবিএস) জানিয়েছেন।
এই অনুরোধের পেছনে কারণ হলো—মোট ৩ লাখ টন অপরিশোধিত তেল বহনকারী তিনটি চালানের আগমন এখন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। বৈশ্বিক তেল বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজে নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
জ্বালানি বিভাগ তাদের অনুরোধটি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে ইরান সরকারের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পশ্চিম এশিয়া ডেস্কের মহাপরিচালকের কাছে পাঠানো ওই চিঠিতে ইরান সরকারের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে যোগাযোগের অনুরোধ করা হয়েছে।

এদিকে পেট্রোলপাম্পে জ্বালানি সংকটের অভিযোগ ও যানবাহনের দীর্ঘ সারির মধ্যে সরকার গতকাল পেট্রোল, অকটেন ও ডিজেলের ওপর আরোপিত রেশনিং ব্যবস্থা পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত প্রত্যাহার করেছে, যাতে ঈদের সময় সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমে।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহপথ ব্যাহত হওয়ায় নির্দিষ্ট কিছু যানবাহনের জন্য জ্বালানি কেনায় আগে সীমাবদ্ধতা আরোপ করেছিল সরকার।
কর্মকর্তারা জানান, ঈদের ছুটির পর যাতে আবার রেশনিং চালু করতে না হয়, সে জন্য পর্যাপ্ত অপরিশোধিত তেল সরবরাহ নিশ্চিত করার বিভিন্ন বিকল্প এখন খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
অনিশ্চিত তিনটি চালান
জ্বালানি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১ লাখ টন অপরিশোধিত তেল বহনকারী ট্যাংকার এমটি নরডিক পোলাক্স গত ৩ মার্চ থেকে সৌদি আরবের রাস তানুরা বন্দরের বহিরাংশে অপেক্ষা করছে। সৌদি আরবের এই বন্দর থেকে তেল বোঝাই করার পর জাহাজটি হরমুজ প্রণালিতে নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে বাংলাদেশে রওয়ানা হতে পারছে না।
আরও প্রায় ১ লাখ টনের একটি চালান মার্চের শেষ দিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ থেকে লোড করার কথা রয়েছে। হরমুজ প্রণালি সংশ্লিষ্ট ঝুঁকি কমাতে এবার জেবেল ধান্নার পরিবর্তে ফুজাইরাহ বেছে নেওয়া হয়েছে।
তৃতীয় আরেকটি প্রায় ১ লাখ টনের চালান ১৪ থেকে ১৬ এপ্রিলের মধ্যে সৌদি আরবের ইয়ানবু থেকে লোড হওয়ার কথা রয়েছে।
চট্টগ্রামে অবস্থিত ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড সাধারণত ১ লাখ টন এরাবিয়ান লাইট অপরিশোধিত তেল থেকে প্রায় ১৫–২০ শতাংশ অকটেন ও পেট্রোল এবং ৩০–৩৫ শতাংশ ডিজেল উৎপাদন করে। এর বেশিরভাগ কাঁচামালই বা অপরিশোধিত তেলই মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করা হয়।
মার্চের জন্য নির্ধারিত তেলবাহী জাহাজগুলো যদি হরমুজ প্রণালি পার হতে না পারে, তবে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে চড়ামূল্যে পেট্রোল ও অকটেন আমদানি করতে হতে পারে।
আর যদি বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) সময়মতো এসব পরিশোধিত জ্বালানি সংগ্রহ করতে না পারে, তবে দেশের বাজারে আবারও জ্বালানি সংকট দেখা দিতে পারে।
অপরিশোধিত তেলের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে চিঠিতে
চিঠিতে জ্বালানি মন্ত্রণালয় উল্লেখ করেছে, দ্রুত বিকাশমান অর্থনীতি হিসেবে বাংলাদেশের রিফাইনারি কার্যক্রম সচল রাখা এবং নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে সময়মতো অপরিশোধিত তেল (ক্রুড অয়েল) আমদানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।
চিঠিতে বলা হয়েছে, দ্রুত উন্নয়নশীল অর্থনীতি এবং ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদার দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে রিফাইনারি চালু রাখতে এবং পরিবহন, শিল্প, কৃষি ও জরুরি সেবায় নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে সময়মতো অপরিশোধিত তেল আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয়।
জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে নির্ধারিত সময়ে তেল চালান পৌঁছানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
এতে আরও বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হচ্ছে, যার প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশমুখী চালানেও।
ভারত থেকে অতিরিক্ত ডিজেল সরবরাহ এখনো নিশ্চিত নয়
অতিরিক্ত ডিজেল সহায়তার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, "আমরা ভারতীয় পক্ষের সঙ্গে অতিরিক্ত সরবরাহের বিষয়ে কথা বলেছি। তারা বিষয়টি ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করার আশ্বাস দিয়েছে।"
বিপিসি এবং ভারতের নুমালিগড় রিফাইনারি লিমিটেড-এর মধ্যে বিদ্যমান চুক্তির আওতায়, বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী পাইপলাইন দিয়ে প্রতিবছর ১ লাখ ৮০ হাজার টন ডিজেল সরবরাহের কথা রয়েছে ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত পরিশোধনাগারটির।
এর মধ্যে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টন ইতোমধ্যে নিশ্চিত হয়েছে। তবে প্রয়োজনে আরও ৬০ হাজার টন আমদানির সুযোগ রয়েছে বাংলাদেশের।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, "তবে এখনো আমাদের অনুরোধের বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য পাইনি।"
জ্বালানি মজুদ ও নজরদারি
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, ১৪ মার্চ পর্যন্ত দেশে ডিজেলের মজুদ রয়েছে ১৩ লাখ ৫২ হাজার ২১৬ টন; অকটেন ১৬ হাজার ৯২০ টন; পেট্রোল ১৬ হাজার ৬০৮ টন; ফার্নেস অয়েল ৫৪ হাজার ৬৪৬ টন এবং জেট ফুয়েল ৫১ হাজার ৩১৭ টন।
কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন, রেশনিং প্রত্যাহারের ফলে জ্বালানির চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। ফলে অপরিশোধিত তেলের চালান সময়মতো পৌঁছানো আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশ নিয়মিতভাবে ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড-এর পরিশোধনাগার চালু রাখতে অপরিশোধিত তেল আমদানি করে থাকে। এসব চালান পরিবহনের জন্য জাহাজের ব্যবস্থা করে বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশন।
জ্বালানি রেশনিং প্রত্যাহার
আমদানি করা তেলবাহী কয়েকটি জাহাজ গতকাল চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছানোর পর সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় সরকার জ্বালানি রেশনিং প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত এ ঘোষণা দেন।
তিনি বলেন, "মানুষের নির্বিঘ্ন ঈদযাত্রা এবং চলমান বোরো মৌসুমে কৃষকদের জ্বালানি চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে সরকার জ্বালানি রেশনিংসহ সব ধরনের বিধিনিষেধ প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।"
তিনি আরও জানান, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত দেশের সব জ্বালানি বিতরণকেন্দ্রে চাহিদা অনুযায়ী তেল সরবরাহ করা হবে।
জ্বালানি সরবরাহে নজরদারি
জ্বালানি বিতরণে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে প্রতিমন্ত্রী জেলা প্রশাসকদের সঙ্গে একটি ভার্চুয়াল বৈঠক করেন। এতে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, জনপ্রশাসন সচিব এবং জ্বালানি সচিব অংশ নেন।
কর্মকর্তাদের প্রতিদিন ডিপোর ওপেনিং ও ক্লোজিং স্টকের হিসাব যাচাই করে নিয়মিত প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে বরাদ্দকৃত জ্বালানি ঠিকভাবে পেট্রোলপাম্পে পৌঁছায়।
যেসব ফিলিং স্টেশন বন্ধ থাকে সেগুলোর বিষয়েও তদন্ত করা হবে এবং ডিপোর হিসাবের সঙ্গে সরবরাহ তথ্য মিলিয়ে দেখা হবে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, "বর্তমান সরকার আন্তরিকভাবে চেষ্টা করছে যাতে জনগণ কোনো ভোগান্তিতে না পড়ে।"
জ্বালানি সাশ্রয়ের নির্দেশনা
অনিশ্চিত বৈশ্বিক জ্বালানি পরিস্থিতির মধ্যে সরকার বেশ কিছু জ্বালানি সাশ্রয়ী নির্দেশনাও দিয়েছে।
জেলা প্রশাসনকে এয়ার কন্ডিশনারের তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আসন্ন ঈদ মৌসুমে শপিং মল ও দোকানগুলোকে অতিরিক্ত আলোকসজ্জা সীমিত রাখতে বলা হয়েছে।
দোকান বন্ধ করার পর সাইনবোর্ডের আলোও বন্ধ রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার আশা
শিল্পখাতের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠকের পর কর্মকর্তারা আশা প্রকাশ করেছেন, শিগগিরই জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে।
পেট্রোলপাম্প মালিকদের সঙ্গে বৈঠকের পর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সমন্বয়ক ও সংসদ সদস্য শিমুল বিশ্বাস জানান যে, রোববার থেকে জ্বালানি সরবরাহ বাড়বে এবং পরের দিনের মধ্যেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যাবে।
এদিকে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলার্স, ডিস্ট্রিবিউটর্স, এজেন্টস অ্যান্ড পেট্রল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন-এর সভাপতি নাজমুল হক-ও বলেছেন, পরিস্থিতি উন্নতির দিকে।
তিনি টিবিএসকে বলেন, "অনেক ফিলিং স্টেশনে ইতোমধ্যে জ্বালানি তেল পৌঁছে গেছে এবং আশা করছি আগামীকাল (সোমবার) নাগাদ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যাবে।"