Image description

জাতীয় সংসদে জুলাই জাতীয় সনদের প্রস্তাব বাস্তবায়নে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন নিয়ে বিতর্ক হয়েছে। সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান না করায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বিপরীতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বিরোধীদলীয় নেতাকে সংবিধান সংস্কারের বিষয়ে সংসদের কার্য উপদেষ্টা কমিটিতে আলোচনার প্রস্তাব দেন।

 

রোববার (১৫ মার্চ) জাতীয় সংসদে অনির্ধারিত আলোচনায় সংবিধান সংস্কার পরিষদ নিয়ে এই অনির্ধারিত বিতর্ক হয়।

 

এদিন সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্ব শেষে বিরোধীদলীয় নেতা জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে গঠিত এই সংসদ স্বাভাবিকভাবে তার নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় আসেনি। এটি রাষ্ট্রপতির আদেশের মাধ্যমে এসেছে। এটি জারি করা হয়েছে ১৩ নভেম্বর ২০২৫। এ সময় সংসদে জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ পুরোটা পড়ে শোনান বিরোধীদলীয় নেতা। তিনি বলেন, এই আদেশ অনুযায়ী নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার ৩০ দিনের মধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বানের কথা রয়েছে।

 

বিরোধীদলীয় নেতা আরও বলেন, কিন্তু এর মধ্যে এই অধিবেশন ডাকা হয়নি। আমার উদ্বেগের বিষয়টি এখানে। জুলাই সনদ আদেশের বিভিন্ন ধারা উল্লেখ করে শফিকুর রহমান বলেন, আদেশে বলা রয়েছে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হবে। কিন্তু এটি গঠন হয়নি। যে পদ্ধতিতে সংসদের অধিবেশন আহ্বান করা হবে, সেই একই পদ্ধতিতে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করা হবে। প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে রাষ্ট্রপতি সংসদের অধিবেশন আহ্বান করেছেন।

শফিকুর রহমান বলেন, জুলাই আদেশ অনুযায়ী বিরোধী দলের ৭৭ জন সদস্য সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছেন। এ আদেশ অনুসারে তারা একই সঙ্গে সংসদ সদস্য ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ পেতে চান।

 

এরপর বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্যের জবাব দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, সংসদের অধিবেশন না থাকা অবস্থায় রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ জারি করতে পারেন। কিন্তু সংবিধানের ধারা পরিবর্তন হবে বা সংবিধান পরিবর্তন হবে, এ রকম কোনো বিষয় অধ্যাদেশের মাধ্যমে আসতে পারে না। সেটা জায়েজ নয়। কিন্তু এই যে আদেশ (জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ), এই আদেশটা না অধ্যাদেশ, না আইন। মাঝামাঝি জিনিস, সেদিন আমি বলেছিলাম, এটা হয়তো নিউট্রাল জেন্ডার হতে পারে।

 

তিনি আরও বলেন, সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি দুটি কাজ ছাড়া সবগুলো প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে করে থাকেন। একইভাবে এই সংসদের আহ্বানও তিনি করেছেন প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী। কিন্তু সংবিধানে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অস্তিত্ব না থাকায় প্রধানমন্ত্রীও সেটা রাষ্ট্রপতিকে পরামর্শ দিতে পারেন না। রাষ্ট্রপতিও সেই অধিবেশন আহ্বান করতে পারেন না বিধায় তা করেননি।

 

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, এখন যদি বিরোধী দলের প্রশ্ন অনুসারে রাষ্ট্রপতির জারি করা আদেশটা সাংবিধানিক হয়, সেটা নিয়ে এখানে আলোচনা হতে পারে। সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন আদেশ এইটা এবং গণভোট অধ্যাদেশের নির্দিষ্ট অংশ কেন অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না মর্মে আদালত রুল জারি করেছেন। এখানে হয়তো বিচার বিভাগ মতামত দেবে। কিন্তু তাদের মতামত এই সার্বভৌম সংসদের ওপর কখনও বাইন্ডিং (বাধ্যতামূলক) না। কিন্তু সার্বভৌম সংসদ আবার এমন কোনো আইন প্রণয়ন করতে পারে না, যেটা জুডিশিয়ারিতে গিয়ে চ্যালেঞ্জ হয়ে বাতিল হয়ে যাবে বা ভায়োলেশন অব কনস্টিটিউশন হয়ে যাবে। সুতরাং উভয় দিকে লক্ষ রেখে জাতির বৃহত্তর স্বার্থে আইনানুগভাবে এবং সাংবিধানিকভাবে যেতে হবে।

 

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এখন যদি বলা হয় যে গণভোটের রায় বাস্তবায়নের জন্য সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করতে হবে, মানলাম। আমরা নির্বাচিত হয়েছি সাংবিধানিক ভোটে। নির্বাচন কমিশনের দুইটাই এখতিয়ার। একটা হচ্ছে জাতীয় সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠান করা, আরেকটা হচ্ছে রাষ্ট্রপতির নির্বাচন অনুষ্ঠান করা। এটা হচ্ছে কনস্টিটিউশনাল ম্যান্ডেট, যেটা নির্বাচন কমিশন পালন করতে বাধ্য।

 

তিনি বলেন, গণভোটের জন্য আরেকটা আইন হয়েছে। বিএনপিও এটা প্রস্তাব করেছিল। কিন্তু মাঝখানে আদেশটা জারি করে গণভোট দেওয়া হলো চারটা প্রশ্ন। যে প্রশ্নের মধ্যে একটা বিশাল প্রশ্ন জুলাই জাতীয় সনদের সমঝোতা হয়নি। এটা একটা জবরদস্তিমূলক আরোপিত আদেশ করে সেই আদেশের একটা প্রশ্ন গণভোটের মধ্যে দেওয়া হয়। চারটা প্রশ্ন হলেও মানুষ কোন কোন প্রশ্নে হ্যাঁ, কোন কোন প্রশ্নে না বলবে সে বিকল্প ছিল না। তারপরও গণভোটের রায় যদি বাস্তবায়ন করতে হয়, সংবিধানে আগে সংস্কার আসতে হবে।

 

তিনি আরও বলেন, তারা জাতির কাছে অঙ্গীকার করেছেন, জুলাই জাতীয় সনদ যেভাবে স্বাক্ষরিত হয়েছে, রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল হিসেবে তার প্রতিটি শব্দকে তারা সম্মান করেন। কিন্তু জুলাই জাতীয় সনদের বাইরে আরোপিত কোনো আদেশ দিয়ে, কোনো অবৈধ আদেশ দিয়ে সংবিধান সংশোধন করা যায় কি না, সেটা একটা বিশাল আইনি প্রশ্ন, সাংবিধানিক প্রশ্ন। তিনি সেটা নিয়েও বিতর্ক ও আলোচনার আহ্বান জানান।