Image description

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ নিয়ে পরস্পর বিরোধী বক্তব্য দিয়েছেন সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যরা। ক্ষমতাসীন বিএনপির সদস্যরা এই পরিষদের আইনি অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। অন্যদিকে, বিরোধী দলের সদস্যরা বিষয়টি নিয়ে সরকারের নীরবতার সমালোচনা করেছেন।

রোববার সকালে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অধিবেশনের দ্বিতীয় দিনের কার্যক্রম শুরু হয়। অনির্ধারিত আলোচনায় অংশ নিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘আজ ৩০তম পঞ্জিকা দিবস, যা সংস্কার পরিষদের প্রথম অধিবেশন আহ্বানের শেষ সময়। কিন্তু এখন পর্যন্ত এই অধিবেশন আহ্বান করা হয়নি।’

তিনি বলেন, এই সংসদ কোনো সাধারণ নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় আসেনি। এটি একটি প্রেসিডেন্সিয়াল অর্ডারের মাধ্যমে এসেছে। ২০২৫ সালের ১৩ নভেম্বর জারি করা ওই আদেশে স্পষ্ট বলা আছে– ‘জাতীয় সংসদের মতো একই পদ্ধতিতে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন ডাকতে হবে’।

বিরোধীদলীয় নেতা জানান, বিরোধী দলের ৭৭ সদস্য নিয়ম অনুযায়ী সংসদ সদস্যের পাশাপাশি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দুটি শপথ নিয়েছেন। পরিষদের ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সংস্কার সম্পন্ন করার কথা ছিল। কিন্তু আজ মেয়াদের শুরুর সময়সীমা শেষ হতে চললেও সরকার নীরব।

জবাবে ট্রেজারি বেঞ্চ থেকে বক্তব্য দেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি সংসদে বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্যের আইনি ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, বিরোধীদলীয় নেতা কোন বিধিতে এই আলোচনা তুললেন? জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ নোটিশ ছাড়া এভাবে আলোচনা করা যায় না।

গত ১২ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে জুলাই জাতীয় সনদের বাস্তবায়ন আদেশের ওপর গণভোট হয়। ৬৮ শতাংশের বেশি ‘হ্যাঁ’ ভোটে আদেশটি অনুমোদিত হয়। আদেশ অনুযায়ী, ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে জুলাই সনদের ৪৮ সাংবিধানিক সংস্কার প্রস্তাবের ৩৮টি বাস্তবায়ন করতে হবে। বাকি ১০টি বাস্তবায়ন বাধ্যতামূলক নয়। দলগুলো নোট অব ডিসেন্ট (ভিন্নমত) অনুযায়ী, এসব সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়ন করতে পারবে।

গণভোটের প্রশ্নে ছিল, সনদে বর্ণিত পদ্ধতির আলোকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন, সরকারি কর্ম কমিশন, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক, ন্যায়পাল এবং দুর্নীতি দমন কমিশন গঠন করতে হবে। নির্বাচন কমিশন বাদে বাকি সংস্কারগুলোতে বিএনপির নোট অব ডিসেন্ট রয়েছে।

আদেশে বলা হয়, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে সংসদ নির্বাচনের ভোটের অনুপাতে (পিআর) সংসদের উচ্চকক্ষ গঠন করতে হবে। ১০০ আসনের এই উচ্চকক্ষের অনুমোদন নিতে হবে সংবিধান সংশোধনে। বিএনপি উচ্চকক্ষ গঠনে রাজি হলেও পিআর এবং সংবিধান সংশোধনে অনুমোদন দিতে একমত নয়। ৩০টি সংস্কার প্রস্তাবে বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ সব দল একমত ছিল। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ায় আদেশ অনুযায়ী এগুলো বাস্তবায়নের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

গণঅভ্যুত্থানের অভিপ্রায়ের ক্ষমতাবলে জারি করা আদেশে বলা হয়েছে, ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে নবনির্বাচিত এমপিদের নিয়ে ১৮০ কার্যদিবস মেয়াদি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করতে হবে। এই পরিষদ অনুযায়ী, সনদে বর্ণিত উপায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার; নির্বাচন কমিশনসহ অন্যান্য কমিশন এবং চলতি সংসদেই উচ্চকক্ষ গঠনের বিধান সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করবে। যে ৩০ সংস্কার প্রস্তাবে সব দলের ঐকমত্য হয়েছিল, সেগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে পরিষদকে।

আদেশের ১০ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, সংসদ নির্বাচনের ৩০ দিনের সংসদ অধিবেশন আহ্বানের অনুরূপ পদ্ধতিতে পরিষদের আহ্বান করতে হবে। অর্থাৎ, রাষ্ট্রপতি পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করবেন।

আদেশের ৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, নির্বাচিত এমপিদের যিনি যে পদ্ধতিতে শপথ পাঠ করিয়েছেন, একই পদ্ধতিতে তারা পরিষদ সদস্য হিসেবে শপথ নেবেন।

গণভোট আয়োজনে গত ২৫ নভেম্বর অধ্যাদেশ জারি করা হয়। এই অধ্যাদেশ অনুযায়ী, আদেশের ওপর গণভোট হয়েছে। ইতোমধ্যে গণভোট ও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে রিট হয়েছে। গণভোট ও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ কেন অবৈধ হবে না– জানতে চেয়ে হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন।

জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী সংস্কারের জন্য পরিষদ গঠন না করায় জামায়াত ডেপুটি স্পিকারের পদ গ্রহণে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। ১ মার্চ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানের চা চক্রে বিরোধী দলকে জুলাই সনদ অনুযায়ী ডেপুটি স্পিকারের পদ দেওয়ার প্রস্তাব দেয় সরকার। তবে পুরো সনদ বাস্তবায়ন ছাড়া এই পদ নিতে চায় না জামায়াত।

জামায়াত-এনসিপির নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্য হুমকি দিয়েছে, ১৫ মার্চের মধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান না করলে তারা রাজপথের আন্দোলনে যাবে।

অধিবেশনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদের কথা উল্লেখ করে বলেন, রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশের মাধ্যমে সংবিধান পরিবর্তনের কোনো বিধান নেই। এই তথাকথিত ‘বাস্তবায়ন আদেশ’ আইন নাকি অধ্যাদেশ, তা স্পষ্ট নয়। যে সংস্কার পরিষদের অস্তিত্ব নিয়েই আইনি প্রশ্ন আছে এবং উচ্চ আদালতে রুল জারি হয়েছে, সেই পরিষদের অধিবেশন ডাকার জন্য প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতিকে পরামর্শ দিতে পারেন না।

তিনি আরও বলেন, জনগণ জুলাই সনদের পক্ষে গণভোট দিয়েছে ঠিকই। কিন্তু সেই রায় বাস্তবায়নের জন্য আগে সংবিধানে সংশোধন আনতে হবে। সার্বভৌম সংসদ কোনো অসাংবিধানিক পথে হাঁটতে পারে না। আমরা সংস্কার চাই, তবে তা আইনানুগ ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায়। প্রয়োজন হলে বাজেট অধিবেশনে এই নিয়ে বিল উত্থাপন করা যেতে পারে।