রাজধানী ঢাকা মহানগরের লাখ লাখ বাড়িঘর থেকে প্রতিদিন তৈরি হচ্ছে সাত হাজার টন বর্জ্য। ময়লা-আবর্জনার এই অন্তহীন জোয়ার এখন জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য এক মারাত্মক হুমকিতে পরিণত হয়েছে।
আবর্জনা থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে চীনের মতো সাফল্য পাওয়ার জন্য সরকার একটি উদ্যোগ নিয়েছিল। কিন্তু সেই পরিকল্পনা এখনো আলোর মুখ দেখেনি। ফেলার কোনো জায়গা না থাকায় প্রতিদিনের জমা হওয়া এই আবর্জনা শহরের দুই পাশে তৈরি করেছে দুটি বিশাল কৃত্রিম পাহাড়।
সরকারিভাবে এই জায়গাগুলোকে ল্যান্ডফিল বা বর্জ্যাগার বলা হলেও, এর একটি ৯ বছর আগে এবং অন্যটি ৫ বছর আগেই তাদের ধারণক্ষমতা হারিয়েছে। জায়গার অভাবে কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়ে এই উঁচু ও বিপজ্জনক পাহাড়গুলোর ওপরই আরও ময়লা জমা করছে। এর ফলে সেখানে তৈরি হয়েছে যেকোনো সময় বড় ধরনের ধস নামার ঝুঁকি।
এই কৃত্রিম পাহাড়গুলোর উচ্চতা যাতে আর না বাড়ে, সেজন্য বর্জ্য ব্যবস্থাপকেরা প্রায়ই সেগুলোতে আগুন ধরিয়ে দেন। এর ফলে প্লাস্টিক ও পলিথিন পুড়ে বিশাল অগ্নিকাণ্ডের সৃষ্টি হয়। এই আগুন থেকে তৈরি হওয়া বিষাক্ত ধোঁয়া পুরো বাতাসকে দূষিত করে তুলছে। পরিবেশবাদী ও চিকিৎসকেরা সতর্ক করে বলেছেন, এই ধোঁয়া সাধারণ মানুষকে ধীরে ধীরে বিষাক্ত করে মারছে।
শহরের উত্তর-পশ্চিমে গাবতলীর ঠিক বাইরে অবস্থিত আমিনবাজার ল্যান্ডফিল। সেখানে যাওয়া মাত্রই যেকোনো মানুষ তীব্র দুর্গন্ধের মুখোমুখি হন। আশ্চর্যজনক বিষয়, এই ময়লার স্তূপের একেবারেই কাছে মানুষের বসতি ও ফসলি জমি গড়ে উঠেছে। এই দূষিত মাটিতে উৎপাদিত ফসল নিয়মিত বিক্রি হয় ঢাকার বাজারে। কিন্তু এই খাবার মানুষের খাওয়ার জন্য নিরাপদ কি না, তা খতিয়ে দেখার প্রয়োজন মনে করেনি সরকার।
ল্যান্ডফিলের ঠিক পেছনে নগরকোন্ডা এলাকায় ৫৪ বছর বয়সী কৃষক মোহাম্মদ মালেক এই দূষিত মাটিতেই লাউ, আলু ও ধনেপাতা চাষ করছেন। ফসলের ফলন খুবই কম। মালেক এর জন্য অবিরাম ধোঁয়া এবং স্থানীয়ভাবে ‘অ্যাসিড পানি’ নামে পরিচিত কালো বিষাক্ত তরলকে দায়ী করেন। ময়লার বিশাল স্তূপের দিকে আঙুল উঁচিয়ে মালেক বলেন, ‘এটা শুধু আমাদের ফসলই পুড়িয়ে দিচ্ছে না, আমাদের জীবনও শেষ করে দিচ্ছে।’
বর্জ্যের ল্যান্ডফিল থেকে প্রতিনিয়ত চুইয়ে বের হয় বৈজ্ঞানিকভাবে ‘লিচেট’ নামে পরিচিত এই ঘন তরল। এর সাথে বের হয় কার্বন মনোক্সাইডযুক্ত ধোঁয়া, যা স্থানীয় কৃষিকে ধ্বংস এবং মানুষের শরীরে মারাত্মক ক্ষতি করছে। মালেক আক্ষেপ করে বলেন, ‘এটা আমাকে ভেতর থেকে ঝাঁজরা করে দিচ্ছে।’
গত দুই দশকে এই অঞ্চলের পরিবর্তন খুবই বেদনাদায়ক। ২০০৭ সালে সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়ি আসা শুরু করার আগে এই জমিতে প্রচুর বোরো ধান হতো। স্থানীয় জলাশয়গুলো মাছে ভরা ছিল, যা কৃষি ও মাছ ধরার ওপর নির্ভরশীল একটি সম্প্রদায়কে বাঁচিয়ে রাখত।
এখন মহানগরের উত্তর-পশ্চিমের এই দুর্দশার চিত্র দক্ষিণ-পূর্বের ডেমরার মাতুয়াইল ল্যান্ডফিলেও দেখা যায়। এটি ঢাকার দ্বিতীয় ময়লার পাহাড়। বাতাসের কারণে এই দুই জায়গা থেকে বিষাক্ত গ্যাস সরাসরি শহরের কেন্দ্রে চলে আসে।
প্রখ্যাত পরিবেশ বিজ্ঞানী আতিক রহমান বলেন, অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, খোলা জায়গায় ময়লা পোড়ানো এবং দুর্বল লিচেট নিয়ন্ত্রণের কারণে ঢাকার খাদ্যশৃঙ্খল, পানি সরবরাহ, বাতাসের মান ও জনস্বাস্থ্যে দীর্ঘমেয়াদি সংকট তৈরি হচ্ছে।
ক্রমবর্ধমান দূষণে দমবন্ধ আমিনবাজার
২০০৭ সালে মাত্র ৫২ একর জমির ওপর অস্থায়ীভাবে আমিনবাজার ল্যান্ডফিল তৈরি করা হয়। ২০১৭ সালেই এর মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। তা সত্ত্বেও এটি এখনো দূষণের এক বড় কেন্দ্র হিসেবে কাজ করছে।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের অধীনে প্রতিদিন গড়ে ৫৭০টি ময়লার ট্রাক এই স্থানে আসে। শহরের ৫৭টি সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন থেকে এই ময়লা আনা হয়। প্রতিটি ট্রাকে ৯ থেকে ১২ টন ময়লা থাকে। সেই হিসাবে ল্যান্ডফিলটিতে প্রতিদিন পাঁচ হাজার থেকে সাত হাজার টন নতুন বর্জ্য জমা হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ময়লার পরিমাণ কমাতে কেমিক্যালের সাহায্যে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। তবে সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা এই দাবি অস্বীকার করেন। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের অতিরিক্ত প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা মো. আরিফুর রহমান দাবি করেন, এই আগুন এমনি এমনিই লাগে।
তিনি বলেন, ‘ময়লার স্তূপের নিচে প্রাকৃতিকভাবেই আগুন ধরতে পারে। তবে বড় ধরনের আগুন লাগলে পানি ছিটিয়ে তা নিয়ন্ত্রণ করার ব্যবস্থা আমাদের আছে।’
কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। ল্যান্ডফিলের সব দিক থেকে সারাক্ষণ কালো ধোঁয়া বের হতে থাকে। বাতাস যেদিকে যায়, এই ধোঁয়াও সেদিকের বসতিগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। এই বিষাক্ত পরিবেশের মধ্যেই জীবনযাপন করে স্থানীয় মানুষ। শিশুরা খোলা মাঠে খেলছে, বৃদ্ধরা বিকালে হাঁটছেন এবং রাখালরা গরু-ছাগল চরাচ্ছেন। কিন্তু তাদের কোনো নিস্তার নেই।
চারপাশের মাঠে উৎপাদিত কলমি শাক, পালং শাক, লাল শাক ও ধনেপাতা পাশের কন্যাপাড়া খালের কালো ও দুর্গন্ধযুক্ত পানিতে ধোয়া হয়। এরপর এই সবজি পাঠানো হয় মিরপুর, মোহাম্মদপুর ও ধানমন্ডির মতো বড় বড় কাঁচাবাজারে।
পরিবেশের এই ক্ষতিকর প্রভাব কৃষকদের ওপর সরাসরি পড়ছে। খালে ধনেপাতা ধোয়ার সময় বাদল নামে একজন বলেন, ‘আগে একটি বাঁশের বেড়া বর্ষাকাল পর্যন্ত টিকত। এখন একটি ফসল তোলার আগেই তা পচে নষ্ট হয়ে যায়। এমনকি আমি যে কাস্তে দিয়ে কাজ করি, তাও দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়।’
দুপুরের দিকেও খালের ওপর কুয়াশার মতো ঘন ধোঁয়া জমে থাকে, যার কারণে মাত্র ৫০০ মিটার দূরের বালুবাহী জাহাজও দেখা যায় না।
এই দূষণের মারাত্মক প্রভাব বিজ্ঞানের গবেষণাতেও প্রমাণিত হয়েছে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) এক গবেষণায় দেখা গেছে, ডাম্পিং সাইটের ৪৫০ মিটারের মধ্যে মাটিতে সিসার পরিমাণ মার্কিন পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থার নির্ধারিত সীমার চেয়ে তিন গুণ বেশি। একই গবেষণায় ভূগর্ভস্থ পানিতে আর্সেনিকের কারণে উচ্চ স্বাস্থ্যঝুঁকির কথা বলা হয়েছে। ল্যান্ডফিলের দক্ষিণ অঞ্চলে ল্যান্ডফিল পলিউশন ইনডেক্স (এলপিআই) ১২ দশমিক ৪৪ পাওয়া গেছে, যা অত্যন্ত উচ্চ দূষণ নির্দেশকারী মাত্রা ৭ দশমিক ৩৭ এর চেয়ে অনেক বেশি।
স্থানীয় পরিবেশগত বিপর্যয় প্রভাব ফেলছে পুরো দেশের ওপর। আইকিউএয়ারের তথ্য অনুযায়ী, বায়ুদূষণে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। বিশ্বব্যাংকের তথ্য বলছে, ঢাকার বাতাস এত খারাপ হওয়ার পেছনে ১১ শতাংশ দায়ী সরাসরি খোলা জায়গায় ময়লা পোড়ানো।
দূষণে হাসপাতালে রোগীর ভিড়
পরিবেশ সংকটের কারণে স্থানীয় ক্লিনিকগুলোতে অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে রোগীর ভিড়। নগরকোন্ডা এলাকায় চার দশক ধরে চিকিৎসা সেবা দিচ্ছেন মোহাম্মদ শামসুদ্দিন। তিনি স্থানীয় মানুষের স্বাস্থ্যের দ্রুত অবনতি হতে দেখছেন।
তিনি বলেন, ‘সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, অ্যালার্জি এবং চর্মরোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। আগে আমরা এত স্ট্রোকের রোগী দেখতাম না, কিন্তু এখন এখানে মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ স্ট্রোক। শিশুদের শ্বাসকষ্টের সমস্যা এখন ঋতুপরিবর্তনের সর্দি-কাশির মতো সাধারণ হয়ে গেছে। এখন প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই নেবুলাইজার রয়েছে।’
পরিবেশ বিশেষজ্ঞ আতিক রহমান জানান, খোলা বাতাসে বর্জ্য পোড়ানোর ফলে পিএম-২ দশমিক ৫, পিএম-১০, ডাইঅক্সিন এবং ফুরানের মতো মারাত্মক দূষক নির্গত হয়। এটি দীর্ঘমেয়াদে ক্যানসার এবং হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। এই বিষাক্ত ধোঁয়া গর্ভবতী নারীদের গর্ভস্থ শিশুর বিকাশেও বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
আতিক রহমান আরও জানান, মাটিতে জমে থাকা ভারী ধাতু ফসলের মাধ্যমে মানুষের খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করছে। এর ফলে কিডনি নষ্ট হওয়া, স্নায়বিক সমস্যা এবং অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি রোগ দেখা দিচ্ছে।
এদিকে মাতুয়াইল ল্যান্ডফিলও দিন দিন বড় হচ্ছে। ১৯৮৯ সালে ৫০ একর জমি নিয়ে শুরু হওয়া এই ডাম্পিং গ্রাউন্ড এখন ১৮১ একর জুড়ে বিস্তৃত। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকা থেকে এখানে প্রতিদিন ৩ হাজার ২০০ থেকে ৩,৫০০ টন ময়লা আসে। অবশ্য কর্তৃপক্ষের দাবি, তারা এটি নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা মো. মাহবুবুর রহমান তালুকদার জানান, মিথেন গ্যাস নির্গমন কমাতে এবং প্রাকৃতিকভাবে আগুন লাগা রোধ করতে ময়লার ওপর এক ফুট মাটির স্তর দেওয়া হচ্ছে।
তিনি দাবি করেন, ‘ইতোমধ্যেই অর্ধেক কাজ শেষ হয়েছে এবং ডিসেম্বরের মধ্যে আমরা ১০০ একর জমি ঢেকে ফেলার লক্ষ্য নিয়েছি।’ এ ছাড়া সেখানে ফায়ার হাইড্রেন্ট বসানো হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
তবে কর্মকর্তাদের এই কথার সাথে বাস্তবতার কোনো মিল নেই। সেখানে মাটি দিয়ে ময়লা ঢাকার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। পুরো এলাকা উন্মুক্ত ময়লার স্তূপ হয়ে আছে, যেখানে প্রতিদিন নারী ও শিশু শ্রমিকেরা ময়লা কুড়ায়। স্থানীয় বাসিন্দারা কর্মকর্তাদের দাবিকে মিথ্যা বলে অভিযোগ করে বলেন, রাতের অন্ধকারে ইচ্ছা করেই আগুন লাগানো হয়।
স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ রুদ্র বলেন, ‘সন্ধ্যা নামার পর আপনি এই জায়গার কাছে যেতে পারবেন না। তারা রাতে এসে কেরোসিন দিয়ে ময়লার স্তূপে আগুন ধরিয়ে দেয়।’
বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ কেবলই পরিকল্পনা
দীর্ঘমেয়াদে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রযুক্তি এই সংকট থেকে মুক্তির পথ হতে পারত। সরকারের এমন পরিকল্পনাও ছিল। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে আমিনবাজারে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের জন্য চীনা প্রতিষ্ঠান সিএমইসি-এর সঙ্গে একটি চুক্তিও স্বাক্ষর হয়। কিন্তু চারবার সময় বাড়ানোর পরও প্রকল্পটি এখনো শুধু কাগজেই সীমাবদ্ধ আছে।
চীনের দিকে তাকালে বোঝা যায় কী সুযোগ হাতছাড়া করছে বাংলাদেশ। চীনে আধুনিক যন্ত্রের সাহায্যে এক হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রায় ময়লা পোড়ানো হয়, যা ল্যান্ডফিলের ময়লার পরিমাণ ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দেয়। বেইজিং এবং শেনজেনের মতো মেগাসিটিগুলো এখন ‘শূন্য ল্যান্ডফিল’ লক্ষ্য অর্জনে কাজ করছে। শুধু বেইজিংয়েই একটি বর্জ্য বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বছরে প্রায় ৬০ কোটি কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়।
বাংলাদেশের জন্য এই সম্ভাবনা অনেক বড়। কানাডিয়ান জার্নাল অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের সহযোগী সম্পাদক খান জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘দেশে প্রতিদিন ২৫ হাজার থেকে ৩০ হাজার টন বর্জ্য তৈরি হয়, যার মধ্যে কেবল ঢাকা থেকেই আসে প্রায় সাত হাজার টন। এই বর্জ্যকে যদি বিদ্যুতে রূপান্তর করা যেত, তবে প্রতিদিন ৩০০ থেকে ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হতো।’ কিন্তু বর্তমানে ময়লার পাহাড়ের নিচেই চাপা পড়ে আছে সেই সম্ভাবনা।