Image description

পরিপাটি পোশাক ধূসর হয়ে ওঠে মাত্র পাঁচ-সাত মিনিটেই! চশমার ফাঁক গলে ধুলোর ঢেউ জমে চোখের পাপড়িতেও। কোঁকড়ানো ভ্রু দুটোও বদলে যায়। অফিস বা বাড়ি পৌঁছে নিজের সুরত চেনা দায়।

মোহাম্মদপুর থেকে শুরু করে বসিলা ব্রিজ পার হয়ে ঘাটারচর ডিঙিয়ে জাওলা পর্যন্ত মহাসড়কের দশা ঠিক এমন। পাকা রাস্তা নামমাত্র। মনে হয় ধুলোর কুয়াশা ভেঙে ছুটছে গাড়িগুলো। ভরদুপুর, গভীর রাত, ভোর-সকাল, পড়ন্ত বিকাল— সবসময় ধুলো। সারাবেলায় ধুলো।

শুধু মোহাম্মদপুর-জাওলা নয়, বেড়িবাঁধ হয়ে কামরাঙ্গীরচর, গাজীপুর, দূষণগুলো দিন দিন আরও প্রকট হচ্ছে। এ বিষয়ে নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ আগামীর সময়কে বলেছেন, আগে দূষণ নিয়ে সরকার এবং মানুষের মধ্যে অনেক আলাপ থাকলেও এখন তা নেই। আজকাল দূষণে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে নাগরিক। এ জায়গা থেকে ফেরা কঠিন। সরকার এখন থেকেও যদি দূষণ রোধে পরিকল্পনা নেয়, সেটার গতি হবে মন্থর। এ নগরবিদ বায়ু, শব্দ, পানি, মাটিদূষণের পাশাপাশি দৃশ্য, আলো, প্লাস্টিক, ই-বর্জ্য দূষণের কথাও তুলে ধরেন।

ঢাকার দূষণের মধ্যে বায়ুদূষণ সবচেয়ে তীব্র। ৩৬৫ দিনের মধ্যে ২০০ দিনেরও বেশি সময় এ শহরের বায়ু অস্বাস্থ্যকর থাকে। এমনকি বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত বায়ুর শহরের তালিকায় ঢাকা নিয়মিতভাবে শীর্ষ ১০-এ অবস্থান করে। শীতে এ পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করে। বছরের অন্যান্য সময়েও এটি স্বাস্থ্যকর সীমার বাইরেই থাকে। সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বায়ুমান পর্যবেক্ষণ সংস্থা আই-কিউ-এয়ারের বৈশ্বিক ডেটা অনুযায়ী, ২০২৫ ও ২০২৬ সালের তথ্যে দেখা গেছে, ঢাকার বাতাসে অতি ক্ষুদ্র বিপজ্জনক কণার বার্ষিক গড় ঘনত্ব প্রতি ঘনমিটারে ৬৮ মাইক্রোগ্রাম, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত নিরাপদ বার্ষিক সীমার থেকে সাড়ে ১৩ গুণেরও বেশি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, এ নির্ধারিত মান ৫ মাইক্রোগ্রাম। তবে বাংলাদেশ এ মান নির্ধারণ করেছিল ১৫ মাইক্রোগ্রাম। যদিও ২০২২ সালের দিকে দেশে দূষণ কম বোঝাতে এ মাত্রা ৩৫ নির্ধারণ করে সরকার। ঢাকায় বায়ুদূষণ এত বেশি কেন? পরিবেশবিদরা বলছেন, মূলত মেগা প্রজেক্টগুলোর অনিয়ন্ত্রিত ধুলোবালি, রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি, ইটভাটা, গৃহস্থালির জ্বালানি, গাড়ির কালো ধোঁয়া বায়ুদূষণের অন্যতম কারণ।

ঢাকার চারপাশের নদীগুলো বিশেষ করে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা এবং অভ্যন্তরীণ খালগুলো তীব্রভাবে দূষিত। গবেষণা বলছে, বুড়িগঙ্গা নদীতে প্রতিদিন প্রায় ৯ হাজার ঘনমিটার শিল্পবর্জ্য সরাসরি ফেলা হয়। এ ছাড়া ঢাকার টেক্সটাইল ও ডাইং কারখানাগুলো প্রতি বছর প্রায় ৫৬ মিলিয়ন টন বর্জ্য এবং ০.৫ মিলিয়ন টন কাদাজাতীয় বর্জ্য নদীতে ফেলে। ফলে নদী-খালগুলোতে জলজ প্রাণীদের জীবনধারণের জন্য পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা প্রতি লিটারে ন্যূনতম ৫ মিলিগ্রাম থাকা প্রয়োজন হলেও বুড়িগঙ্গার পানিতে এর পরিমাণ ০.৫-এর কম। যার ফলে কোনো মাছ বা জলজ প্রাণী এখানে বেঁচে থাকতে পারছে না।

ঢাকা শহরে শব্দদূষণ এখন একটি মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। ২০০৬ সালের শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা অনুযায়ী, আবাসিক এলাকায় দিনের বেলা শব্দের সর্বোচ্চ সহনীয় মাত্রা ৫৫ ডেসিবেল এবং রাতে ৪৫ ডেসিবেল। কিন্তু বাস্তবে এর চিত্র ভয়াবহ। স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটির বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের গবেষণায় দেখা গেছে, হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতো সংবেদনশীল এলাকায় ৯৬.৭ শতাংশ সময় শব্দের মাত্রা আইনগত সীমার চেয়ে বেশি থাকে।

রাজধানীর জন্য মাটিদূষণ শব্দটি নতুন হলেও এর প্রভাব মারাত্মক। এ দূষণ সরাসরি মানুষের খাদ্যশৃঙ্খল বিষাক্ত করে ফেলছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা, পানি ও পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের যৌথ গবেষণা এ তথ্য দিচ্ছে। ​গবেষণায় দেখা গেছে, দূষিত বুড়িগঙ্গা ও তুরাগের তীরবর্তী এলাকায় চাষ করা সবজি ও ফলমূলে উচ্চমাত্রায় ক্রোমিয়াম, সিসা এবং ক্যাডমিয়াম উপস্থিত।

​প্লাস্টিক ও পলিথিন এখন ঢাকার পরিবেশের জন্য এক নীরব ঘাতক। গবেষণা বলছে, ঢাকা শহরে প্রতিদিন প্রায় ৬৪৬ টন প্লাস্টিক বর্জ্য তৈরি হয়, যার মধ্যে মাত্র ৩০ শতাংশ রিসাইকেল বা পুনর্ব্যবহার করা হয়। বাকি ৭০ শতাংশ প্লাস্টিক ড্রেন, খাল এবং নদীতে গিয়ে জমা হয়। এসব প্লাস্টিক বর্জ্য ঢাকার চারপাশের নদীর মাছেও পাওয়া যাচ্ছে। খাদ্যের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে এসব মাইক্রো পলিকণা ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

পরিবেশবিদরা বলছেন, ঢাকার এ দূষণের অন্যতম কারণ সরকারের প্রকল্পনির্ভর কাজ। তাদের পরামর্শ, পরিবেশ দূষণ রোধে কমিউনিটির অংশগ্রহণ। যতদিন পরিবেশের সঙ্গে মানুষকে যুক্ত করা যাবে না, ততদিন পরিবেশেরও কোনো উন্নতি হবে না। পরিবেশবিদ অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার আগামীর সময়কে বলেছেন, ​ঢাকার পরিবেশকে রক্ষা করতে হলে বায়ু, পানি, মাটির পাশাপাশি প্লাস্টিক এবং ই-বর্জ্যের মতো উদীয়মান দূষণগুলোর বিরুদ্ধেও এখনই সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। পরিবেশ আদালতে সরকার নয় বরং ভুক্তভোগীর মামলা করার অধিকার থাকা উচিত বলে মনে করেন এই পরিবেশবিদ। তিনি জানালেন, যে ক্ষতিগ্রস্ত তার মামলা করার অধিকার নেই পরিবেশ আইনে। সরকার বাদী হয়ে মামলা করে। এটাকে প্রহসন বলে উল্লেখ করেন অধ্যাপক কামরুজ্জমান।