Image description

কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমানের সাক্ষাৎকার

নীরব ফ্যাসিবাদীরা যদি ক্ষমতায় থাকে, তাহলে অন্তর্বর্তী সরকার ব্যর্থ হবেই—এমন মন্তব্য করেছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান। দেশের সমসাময়িক নানা বিষয় নিয়ে বাংলানিউজের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ মন্তব্য করেন।

 

জুলাই অভ্যুত্থানের এক বছর পার হওয়ার পর দেশের পরিস্থিতি কেমন দেখছেন—জানতে চাইলে কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘গত ১৫ বছরের কর্তৃত্ববাদী শাসনের প্রেক্ষাপটে মানুষের মাঝে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তার অনেক ক্ষেত্রেই মানুষ হতাশ। ১৫ বছর মানুষ ভোট দিতে পারেনি। তাদের মধ্যে ভোট দেওয়ার আকাঙ্ক্ষা আছে, তবে সেই আকাঙ্ক্ষা এখনো দৃশ্যমান নয়। ’

তিনি বলেন, ‘মানুষ আশা করেছিল—যারা বড় অপরাধী, যাদের কারণে গুম-খুন হয়েছে, অন্তত তাদের বিচার দৃশ্যমান হবে। সেটিও হয়নি। মানুষ ভেবেছিল—একটি দায়িত্বশীল সরকার গঠিত হবে, কিছু সংস্কার নিশ্চিত হবে। সরকার যতই অন্য দলকে দোষারোপ করুক, যেহেতু স্ট্রাইকে সরকার আছে, তাই সংস্কারে ব্যর্থতার দায় সরকারেরই। ’

এই অধ্যাপক বলেন, ‘আজ যদি অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস না থেকে অন্য কেউ সরকারে থাকতেন, তাহলে আমরা দায় কাকে দিতাম? সরকারকেই দায় দিতাম। সুতরাং, যেকোনো সাফল্য এবং ব্যর্থতার দায় সরকারের, তারপর অন্যদের। ’

রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য না হওয়ার দায়ও সরকারের বলে মনে করেন তিনি। বলেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলো ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেনি—এর দায় সরকারের। ২০টি ইস্যুতে ঐকমত্য তৈরির জন্য যদি এক বছর অপেক্ষা করতে হয়, সেটি সঠিক নয়। আমি দেখেছি, সরকার ৯টি ইস্যুতে ঐকমত্য তৈরির চেষ্টা করেছে। সেখানে মাত্র ২ দশমিক ৫ অর্থাৎ আড়াই ভাগ অর্জিত হয়েছে। দুটি ইস্যুতে ঐকমত্য হয়েছে, আরেকটি ইস্যুতে অর্ধেক হয়েছে। এক বছর পরে কি এই হওয়ার কথা? ’

তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্র কাঠামোয় ক্ষমতার যে পরিবর্তন হয়েছে, সেখানে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আওয়ামী লীগের লোকজন থেকে গেছেন। আওয়ামী লীগের বাইরে যাদের আনা হয়েছে, তারাও গত ১৫ বছর আওয়ামী লীগের সঙ্গেই কোনো না কোনোভাবে যুক্ত ছিলেন। যারা প্রকৃত অর্থে কর্তৃত্ববাদবিরোধী ছিলেন, মাঠপর্যায়ে আমরা যারা লড়াই করেছি, তাদের সরকার কোথাও ক্ষমতার কাঠামোর পুনর্গঠনে নিয়ে আসেনি। সরকার নিরপেক্ষ লোক খুঁজছে—কিন্তু  নিরপেক্ষ লোক মানেই তো আওয়ামী লীগের কর্তৃত্ববাদের বিরোধিতা না করা লোকগুলো। ’

তিনি আরও বলেন, ‘বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা বিভিন্ন পদ পেয়েছেন, গত এক যুগে আমি তাদের কোথাও কর্তৃত্ববাদবিরোধী লড়াইয়ে দেখিনি। তারা চুপ করে বসে ছিলেন এই ভেবে, সরকারের কোনো অত্যাচার তাদের ওপরে নেমে আসে কিনা। তারা নীরব ছিলেন এবং আমাদের থেকে দূরে থাকতেন। আজ সেই সরকার তাদেরকেই ক্ষমতায় এনেছে। ’

এই রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেন, ‘যারা উপদেষ্টা হয়েছেন, তাদের অনেকের কী এমন অবদান আছে জুলাই আন্দোলনে কিংবা গত ১৫ বছরের কর্তৃত্ববাদবিরোধী আন্দোলনে? আমি তেমন কিছু দেখতে পাচ্ছি না। গত ১৫ বছরে যারা লড়াই করেছেন, তারা রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী—যাদের বিরুদ্ধে লাখো মামলা হয়েছে, যারা গুম-খুনের শিকার হয়েছেন। ’

তিনি বলেন, ‘যারা সন্তান হারিয়েছেন, তাদের মূল্যায়ন করেনি এ সরকার। এমনকি বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে যারা ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তারাও রাস্তায় নেমেছেন তাদের স্বীকৃতির জন্য। এখন যদি মূল্যায়ন করি, তাহলে এই সরকারকে কোথায় রাখব?’

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের এই অধ্যাপক বলেন, ‘আমি মনে করি, সরকারের ভুলগুলো এখনই শোধরানো দরকার। সরকারের উচিত, যারা সত্যিকারের কর্তৃত্ববাদবিরোধী, তাদের সরকারে আনা। যদি তা না করে, আওয়ামী লীগের দোসরদের ক্ষমতায় রাখে বা নতুন করে নীরব ফ্যাসিবাদীদের ক্ষমতায় নিয়ে আসে, তাহলে সরকার ব্যর্থ হবেই। ’

তিনি বলেন, ‘সরকারের যেসব ব্যর্থতার কথা বললাম, তার মূল দায় সরকারের নিজেরই। সরকার নিজেই তাদের ক্ষমতার কাঠামোয় বসিয়েছে, যারা আওয়ামী লীগের দোসর। তারাই সরকারকে সফল হতে দেয়নি। তারা ক্ষমতায় থেকে চুপচাপ বসে থেকে সরকারকে ব্যর্থ করেছে। ’

জুলাই অভ্যুত্থানের পর মানুষের প্রত্যাশা কতটা পূরণ হচ্ছে—জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এবারের আন্দোলনের পর মানুষের প্রত্যাশা ছিল ১৯৯০ সালের চেয়েও বেশি। এবার তরুণরা ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। সবার আশা ছিল একটি জবাবদিহিমূলক সরকার আসবে। তারা ভেবেছিল, সুষ্ঠু নির্বাচনের কাঠামো তৈরি হবে। তরুণরা ভেবেছিল সংস্কারের মাধ্যমে একটি নতুন বাংলাদেশ পাবে। কিন্তু সেই প্রত্যাশা আজ কোথায়?’

‘যত সময় যাবে, সরকার তত বেশি দুর্বল হবে। সরকার যত দুর্বল হবে, রাজনৈতিক দলগুলোর সমর্থন তত কমে যাবে। আমি মনে করি, সরকার তিন মাসের মধ্যে সবকিছু শেষ করতে পারত, সর্বোচ্চ ছয় মাসের মধ্যে নির্বাচন দিতে পারত। সরকার হয় দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকতে চায়, নয়তো বাধ্য হয়েছে। অথবা যেকোনো কারণে থাকতে হচ্ছে। কিন্তু এতে সরকারের ক্ষতি হয়েছে, ক্ষতি হয়েছে বাংলাদেশের। দ্রুত নির্বাচন, দ্রুত সংস্কার এবং দ্রুত বিচার না হলে মানুষ হতাশ হতেই থাকবে। ’

তিনি আরও বলেন, ‘এই সরকার নানা সীমাবদ্ধতার মাঝেও অনেক চেষ্টা করছে। কিন্তু সেই চেষ্টা মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারছে না। সরকার যদি কর্তৃত্ববাদবিরোধীদের ক্ষমতায় বসাত, তাহলে তারাই সরকারকে সফল করার চেষ্টা করত, নিজেদের প্রয়োজনেই। ’

এই অধ্যাপক বলেন, ‘সরকার তাদেরই বসিয়েছে, যারা গত ১৫ বছর নীরব ছিলেন এবং আওয়ামী লীগ থেকে সুবিধা নিয়েছেন। এজন্য তারা নিজেরা বাঁচার জন্য আওয়ামী লীগের বিরোধিতা করেন না, আবার সরকারকে সফল করতেও আগ্রহী নন। সরকারের ব্যর্থতার অন্যতম কারণ—ক্ষমতার কাঠামোয় আওয়ামী লীগের লোকজনকে রেখে দেওয়া বা তাদের দোসরদের নিয়ে আসা। ’

তিনি বলেন, ‘এভাবে দেশ চললে, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনই হোক বা ১৫ বছরের কর্তৃত্ববাদবিরোধী আন্দোলনই হোক, সবার প্রত্যাশা অপূর্ণই থেকে যাবে। আমরা আশা করি, সরকার এই ভুল বুঝতে পারবে এবং দ্রুত ক্ষমতার কাঠামো পরিবর্তন করবে। কর্তৃত্ববাদের দোসরদের বের করে দেবে। না হলে সরকার আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নেবে। ’