Image description

Ali Ahmad Mabrur আলী আহমেদ মাবরুর


 
 
সম্মানিত ব্যক্তিত্ব সাইয়্যেদ নাকীব আল আত্তাস গতকাল ৮ মার্চ ইন্তেকাল করেছেন। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। যারা একাডেমিক বা মুসলিম নোলেজের সাম্প্রতিক বিস্তারের সাথে সম্পৃক্ত নন, তারা হয়তো ওনার সম্পর্কে খুব ভালো জানবেন না। তবে আমার বিবেচনায় তিনি বিগত ১শ বছরের মধ্যে তৈরি হওয়া শ্রেষ্ঠ একজন মুসলিম একাডেমিক এবং দার্শনিক ছিলেন।

১৯৭৭ সালে মক্কায় বিশ্বের বিভিন্ন মুসলিম দেশের স্কলারদের একটি সম্মেলন হয়েছিল। পশ্চিমাদের বিপরীতে মুসলিমদের অনগ্রসরতার কারণ চিহ্নিত করে কীভাবে মুসলিমদের আরো এগিয়ে নেয়া যায় সে কর্মকৌশল নির্ধারন করার জন্যই ঐ সম্মেলনটি হয়েছিল। উক্ত সম্মেলনে কী নোট স্পিকার ছিলেন এই নাকীব আল আত্তাস। তিনি সেখানে ইসলামাইজেশন অব নোলেজ শিরোনামে নতুন একটি ধারণা দেন- যা সবাইকে তাক লাগিয়ে দেয়।

যদিও পরবর্তীতে ইসমাইল রাজী আল ফারুকীসহ আরো অনেকেই এ বিষয়ে কাজ করেছেন তবে নাকীব আল আত্তাসকে এই কনসেপ্টের পুরোধা বলা যায়। মক্কায় অনুষ্ঠিত ঐ কনফারেন্সের আলোকেই মুসলিম বিশ্বের চার প্রান্তে চারটি ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয় করার সিদ্ধান্ত হয়। এর মধ্যে মালয়েশিয়ায় আইআইইউএম চালু হয় যেখানে বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেকগুলো মুসলিম দেশের অসংখ্য মুসলিম ছাত্র বিগত কয়েক যুগে উচ্চশিক্ষা লাভ করে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছেন এবং কাজ করছেন। এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এবং সেখানকার কারিকুলাম প্রনয়ণেও নাকীব আল আত্তাসের ভূমিকা অপরিসীম। সে হিসেবে তার পরোক্ষ ছাত্রের সংখ্যা এখন কয়েক লাখ হয়ে যাবে।

আল-আত্তাসের বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল জ্ঞান, শিক্ষা এবং সভ্যতার সম্পর্ক। তাঁর মতে, আধুনিক মুসলিম সমাজের অনেক সংকটের মূল কারণ কেবল রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক নয়, বরং তা বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক সংকট। তিনি যুক্তি দেন যে আধুনিক যুগে পশ্চিমা ধর্মনিরপেক্ষ জ্ঞানব্যবস্থা মুসলিম সমাজে এমন এক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করেছে, যেখানে জ্ঞানের সঙ্গে নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিকতার সম্পর্ক দুর্বল হয়ে গেছে। ফলে জ্ঞান অর্জন অনেক সময় কেবল প্রযুক্তিগত দক্ষতা বা উপযোগিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে, অন্যদিকে, মানুষের আত্মিক ও নৈতিক উন্নয়ন উপেক্ষিত হয়।

এরই সমাধান হিসেবে তিনি জ্ঞানকে ইসলামীকরণ বা ইসলামাইজেশন অব নোলেজের সুপারিশ করেন। তিনি মালয়েশিয়ায় থাকতেন। সেখানে তিনি ইসলামী চিন্তা ও সভ্যতা গবেষণাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠা করেন International Institute of Islamic Thought and Civilization- যা ইসটাক নামেও পরিচিত।

লেখক হিসেবেও আল-আত্তাস অত্যন্ত প্রভাবশালী। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে Islam and Secularism, The Concept of Education in Islam এবং Prolegomena to the Metaphysics of Islam। এসব বইয়ে তিনি আধুনিকতা, ধর্মনিরপেক্ষতা, জ্ঞানতত্ত্ব এবং ইসলামী দর্শনের সম্পর্ক নিয়ে গভীর আলোচনা করেছেন।

আধুনিক ইসলামী চিন্তার গুরুত্বপূর্ণ এক স্তম্ভ নাকীব আল আত্তাস ১৯৩১ সালে জন্ম নিয়েছিলেন। সে হিসেবে তিনি প্রায় ৯৫ বছর হায়াত পেলেন। আল্লাহ তার এই দীর্ঘ হায়াতে জিন্দেগীতে করা ভালো কাজগুলো কবুল করে তাকে জান্নাত নসীব করুন। তার ইলমের আলোয় আলোকিত ছাত্রছাত্রীদের কার্যক্রমকে সদকায়ে জারিয়া হিসেবে কবুল করুন। আমিন।