বিশ্লেষকদের মতে, এই দেশগুলো এখন এক অসম্ভব দোটানার সামনে দাঁড়িয়েছে—হয় তাদের পাল্টা আঘাত করে ইসরায়েলের পাশে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করার ঝুঁকি নিতে হবে, অথবা নিজেদের শহর পুড়তে দেখেও হাত গুটিয়ে বসে থাকতে হবে।
ইরানের মিসাইলগুলো যখন দোহা, দুবাই এবং মানামার মতো শহরগুলোয় আঘাত হেনেছে, তখন কেবল কাঁচ আর কংক্রিটের দালানই ভাঙেনি, বরং ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে উপসাগরীয় দেশগুলোর দীর্ঘদিনের তিল তিল করে গড়ে তোলা ‘স্থিতিশীলতার স্বর্গরাজ্য’ ইমেজটি। মধ্যপ্রাচ্যের বাকি অংশের সংঘাত থেকে নিজেদের সুরক্ষিত রাখার যে কবচ এই দেশগুলোর ছিল, তা এখন প্রশ্নের মুখে। বিশ্লেষকদের মতে, এই দেশগুলো এখন এক অসম্ভব দোটানার সামনে দাঁড়িয়েছে—হয় তাদের পাল্টা আঘাত করে ইসরায়েলের পাশে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করার ঝুঁকি নিতে হবে, অথবা নিজেদের শহর পুড়তে দেখেও হাত গুটিয়ে বসে থাকতে হবে।
নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটি আবুধাবির অধ্যাপক মনিকা মার্কসের মতে, দুবাই বা দোহার মতো শহরে বোমাবর্ষণ দেখা স্থানীয়দের কাছে ততটাই অকল্পনীয় ছিল, যতটা আমেরিকানদের কাছে তাদের নিজ দেশের বড় শহরগুলোতে হামলা দেখা।
শনিবার থেকে শুরু হওয়া মার্কিন-ইসরায়েলি যৌথ অভিযানের প্রতিশোধ নিতেই ইরান এই হামলাগুলো চালিয়েছে। ওই অভিযানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা নিহত হন। এর জবাবে ইরান যখন মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি এবং ইসরায়েলের ওপর ড্রোন ও মিসাইল ছোঁড়ে, তখন তার বেশ কিছু অংশ সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত এবং ওমানের ভূখণ্ডেও আঘাত হানে।
দুবাইয়ের আইকনিক ভবন এবং কুয়েত বিমানবন্দরে ক্ষয়ক্ষতির চিত্র সামনে এসেছে। অথচ এই দেশগুলো শুরু থেকেই এই সংঘাত এড়াতে চেয়েছিল। ওমান তো যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে আলোচনার মধ্যস্থতাও করছিল এবং তাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন যে, শান্তি প্রায় হাতের নাগালে। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে শুরু হওয়া এই যুদ্ধ সব হিসাব বদলে দিয়েছে।
বাহরাইনের মানামার সিফ অঞ্চলে ইরানি ড্রোন হামলায় একটি ভবনে আগুন লেগেছে। ছবি- রয়টার্স
বিশেষজ্ঞদের মতে, জিসিসি (উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ) ভুক্ত দেশগুলো জানত যে, দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া ইরান সরকার পরাজয় বরণের চেয়ে তার প্রতিবেশীদের জিম্মি করে ‘ভ্রাতৃঘাতী’ পথ বেছে নেবে। কিংস কলেজ লন্ডনের লেকচারার রব গেস্ট পিনফোল্ড মনে করেন, উপসাগরীয় দেশগুলো এখন তাদের বৈধতার সংকটে ভুগছে। যদি তারা সরাসরি ইসরায়েলের সঙ্গে কাজ করে, তবে সাধারণ মানুষের কাছে তাদের গ্রহণযোগ্যতা কমবে।আবার যদি কিছুই না করে, তবে তাদের সার্বভৌমত্ব এবং জনগণের সুরক্ষা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। ধারণা করা হচ্ছে, এই দেশগুলো শেষ পর্যন্ত যুদ্ধে জড়াতে পারে, তবে তা হবে তাদের নিজস্ব শর্তে। সম্ভবত তারা সরাসরি ইসরায়েল বা আমেরিকাকে আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি দেয়ার বদলে ‘পেনিনসুলা শিল্ড ফোর্স’ (পিএসএফ)-এর মতো নিজস্ব যৌথ সামরিক বাহিনীর মাধ্যমে স্বাধীনভাবে পদক্ষেপ নিতে চাইবে।
উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য এখন বড় দুঃস্বপ্ন হলো তাদের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো রক্ষা করা। যদি হামলাগুলো বিদ্যুৎ গ্রিড, পানি শোধনাগার বা জ্বালানি কেন্দ্রের ওপর পড়ে, তবে এই প্রচণ্ড গরম এবং শুষ্ক অঞ্চলের জনজীবন অচল হয়ে পড়বে। তবে ভৌত ক্ষতির চেয়েও বড় ক্ষতি হচ্ছে তাদের ‘সফট পাওয়ার’ বা ব্র্যান্ড ইমেজের। বিনিয়োগ এবং পর্যটনের জন্য যারা এই অঞ্চলকে নিরাপদ মনে করত, যুদ্ধের এই আঁচ তাদের সেই বিশ্বাস নাড়িয়ে দিচ্ছে। আগে এই দেশগুলো কেবল হুতি বা হিজবুল্লাহর মতো গোষ্ঠীগুলোর হুমকি নিয়ে ভাবত। কিন্তু এখন তারা রাষ্ট্র-বনাম-রাষ্ট্র যুদ্ধের এক নতুন এবং ভয়াবহ যুগে প্রবেশ করেছে। শেষ পর্যন্ত এই দেশগুলো যুদ্ধের ময়দানে থাকবে নাকি একপাশে সরে দাঁড়াবে, তা নির্ভর করছে ইরানের পরবর্তী পদক্ষেপ এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপর।