Image description
 

সীমান্তে টানা উত্তেজনার মধ্যে নতুন করে বড় সামরিক অভিযানের দাবি করেছে পাকিস্তান। দেশটির প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের মুখপাত্র মোশাররফ জাইদি জানিয়েছেন, অপারেশন গজব লিল হক নামে চালানো অভিযানে আফগান তালেবানের ২৭টি সামরিক পোস্ট ধ্বংস এবং ৯টি দখল করা হয়েছে। জাইদির দাবি, অভিযানে ৮০টিরও বেশি ট্যাংক, কামান ও এপিসি ধ্বংস করা হয়েছে। অন্যদিকে তালেবান বলছে, তারা পাকিস্তানের ১৯টি সামরিক চৌকি ও দুটি ঘাঁটি দখল করেছে এবং ৫৫ জন পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়েছেন। উভয় পক্ষের তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা কঠিন।

এই পাল্টাপাল্টি দাবির পেছনে আছে কয়েক বছরের জমে থাকা অবিশ্বাস ও বিরোধ। ২০২১ সালের আগস্টে তালেবান কাবুলের ক্ষমতা দখল করলে পাকিস্তানে তা অনেকেই কৌশলগত সাফল্য হিসেবে দেখেছিল। তখন ধারণা ছিল, কাবুলে মিত্র শক্তি প্রতিষ্ঠা হলে দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে ইসলামাবাদের প্রভাব আরও বাড়বে।

সেই সময় পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ রাশিদ আহমেদ বলেছিলেন, তালেবানের দ্রুত ক্ষমতা দখল একটি নতুন জোট তৈরি করবে। প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান তালেবানের প্রত্যাবর্তনকে আফগান জনগণের দাসত্বের শিকল ভাঙা বলে মন্তব্য করেছিলেন। কথাবার্তায় ছিল আশাবাদ, কূটনীতিতে ছিল উষ্ণতা।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সমীকরণ বদলাতে শুরু করে। ২০২৪ সালে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী আফগানিস্তানে দুবার বিমান হামলা চালায়। ইসলামাবাদ বলছে, এসব হামলা টিটিপি বা তেহরিক ই তালেবান পাকিস্তানের বিরুদ্ধে। কিন্তু কাবুলের দৃষ্টিতে এটি তাদের সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন।

পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে তালেবানকে আশ্রয় ও সমর্থন দিয়েছে। ২০০১ সালের পর তালেবান সীমান্তবর্তী অঞ্চলে অবস্থান নেয়। কোয়েটা, পেশোয়ার, করাচি সহ বিভিন্ন শহর তাদের জন্য নিরাপদ জায়গা হিসেবে পরিচিত ছিল। পাকিস্তানের বিভিন্ন মাদ্রাসায় তালেবানের বহু নেতা পড়াশোনা করেছেন। সম্পর্ক ছিল পারস্পরিক স্বার্থে গড়া।

তবে ক্ষমতায় এসে তালেবান নিজেদের অবস্থান নতুনভাবে সাজাতে শুরু করে। তারা আফগানিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয়কে অগ্রাধিকার দিচ্ছে এবং পাকিস্তানের সরাসরি প্রভাব কমাতে চাইছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।

ডুরান্ড লাইন ইস্যু এই তিক্ততার বড় কারণ। ঔপনিবেশিক আমলে নির্ধারিত এই সীমান্ত পাকিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে মেনে নিলেও আফগানিস্তান কখনো স্বীকৃতি দেয়নি। তালেবানও পূর্বসূরি সরকারের মতো এই সীমান্ত মানতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। ফলে সীমান্তে কাঁটাতার, টহল ও চৌকি নিয়ে উত্তেজনা বাড়ছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে টিটিপি ইস্যু। তালেবান ক্ষমতায় আসার পর পাকিস্তানে সন্ত্রাসী হামলা বেড়েছে বলে ইসলামাবাদের দাবি। পাকিস্তান চায় আফগান ভূখণ্ডে থাকা টিটিপি নেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক। কিন্তু তালেবান বলছে, এটি পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ সমস্যা।

পাকিস্তানের সামরিক পদক্ষেপ আফগান জনগণের মধ্যে পাকিস্তানবিরোধী মনোভাব বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে পাকিস্তানের ভেতরেও পশতুন জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রতিক্রিয়া তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে তালেবান সামরিকভাবে শক্ত অবস্থানে নেই এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও একঘরে। ফলে প্রকাশ্যে কঠোর ভাষা ব্যবহার করলেও বাস্তবে তাদের বিকল্প সীমিত।

সব মিলিয়ে একসময়কার মিত্র দুই পক্ষ এখন অবিশ্বাস, সীমান্ত বিরোধ, সন্ত্রাস ও সামরিক পদক্ষেপের জটিল সমীকরণে আটকে গেছে। আঞ্চলিক শান্তি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার কথা থাকলেও বাস্তবতা বলছে, সম্পর্ক এখন তিক্ত ও অনিশ্চিত এক মোড়ে দাঁড়িয়ে।

সোর্সঃ আল জাজিরা