রাজপরিবারের উত্তরাধিকারীর তালিকা থেকে সাবেক প্রিন্স অ্যান্ড্রু মাউন্টব্যাটেন-উইন্ডসরকে বাদ দিতে ব্রিটিশ সরকার নতুন আইন পাসের কথা বিবেচনা করছে।
যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষামন্ত্রী লিউক পোলার্ড বিবিসিকে বলেছেন, পুলিশি তদন্তের ফলাফল যা-ই হোক, এ পদক্ষেপ নেওয়াটাই ‘সঠিক কাজ’। এর ফলে অ্যান্ড্রু কখনোই রাজা হতে পারবেন না।
কুখ্যাত যৌন নিপীড়ক ধনকুবের জেফরি এপস্টিনের সঙ্গে সম্পর্কের খবর প্রকাশিত হওয়ার জেরে গত অক্টোবরে তীব্র চাপের মুখে অ্যান্ড্রুর ‘প্রিন্স’ উপাধিসহ অন্যান্য খেতাব কেড়ে নেওয়া হয়। তা সত্ত্বেও রাজা তৃতীয় চার্লসের ছোট ভাই অ্যান্ড্রু বর্তমানে সিংহাসনের উত্তরাধিকারীদের তালিকায় অষ্টম স্থানে রয়েছেন।
সরকারি পদে থাকাকালে অসদাচরণের সন্দেহে গ্রেপ্তার করার ১১ ঘণ্টা পর গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় অ্যান্ড্রুকে মুক্তি দেওয়া হয়। তবে তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত চলবে।
তবে অ্যান্ড্রু বারবারই যেকোনো দুষ্কর্মের অভিযোগ জোরালোভাবে অস্বীকার করে আসছেন।
বিবিসি রেডিও ফোরের ‘অ্যানি কোয়েশ্চনস’ অনুষ্ঠানে কথা বলার সময় পোলার্ড নিশ্চিত করেন, সাবেক এই প্রিন্সকে ‘সিংহাসনের কাছাকাছি যাওয়া’ থেকে আটকাতে যুক্তরাজ্য সরকার বাকিংহাম প্যালেসের সঙ্গে ‘পুরোপুরিভাবে’ কাজ করছে।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী পোলার্ড বলেন, ‘এটা এমন কিছু, যা আমি আশা করি সর্বদলীয় সমর্থন পাবে। তবে পুলিশি তদন্ত শেষ হওয়ার পরই এটি ঘটা সঠিক।’
কুখ্যাত যৌন নিপীড়ক ধনকুবের জেফরি এপস্টিনের সঙ্গে সম্পর্কের খবর প্রকাশ হওয়ার জেরে গত অক্টোবরে তীব্র চাপের মুখে অ্যান্ড্রুর ‘প্রিন্স’ উপাধিসহ অন্যান্য খেতাব কেড়ে নেওয়া হয়। তা সত্ত্বেও রাজা তৃতীয় চার্লসের ছোট ভাই অ্যান্ড্রু বর্তমানে সিংহাসনের উত্তরাধিকারীদের তালিকায় অষ্টম স্থানে রয়েছেন।
গতকাল শুক্রবার ‘রয়্যাল লজে’ পুলিশের অচিহ্নিত বেশ কয়েকটি গাড়ি ও ভ্যান আসা-যাওয়া করতে দেখা গেছে। উইন্ডসরের ৩০ কক্ষের এ বিশাল প্রাসাদে অ্যান্ড্রু বহু বছর ধরে বসবাস করে আসছেন।
একপর্যায়ে ওই প্রাসাদে ২০টির বেশি যানবাহন পার্ক করে থাকতে দেখা যায়। তবে এসব গাড়ির সবই তদন্ত বা তল্লাশি অভিযানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিল কি না, জানা যায়নি।
অ্যান্ড্রুকে গ্রেপ্তার করা টেমস ভ্যালি পুলিশ আগামী সোমবার পর্যন্ত রয়্যাল লজে তাদের তল্লাশি অভিযান চালিয়ে যাবে—এমন ধারণার কথা জানতে পেরেছে বিবিসি।
বেশ কয়েকজন ব্রিটিশ পার্লামেন্ট সদস্য ওই ধরনের আইনের প্রতি সমর্থন জানানোর পরই সরকার এ–সংক্রান্ত প্রস্তাব সামনে এনেছে। সদস্যদের মধ্যে লিবারেল ডেমোক্রেটিক ও স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টির (এসএনপি) আইনপ্রণেতারাও আছেন।
রাজতন্ত্রের সমালোচক লেবার পার্টির কয়েকজন পার্লামেন্ট সদস্য বিবিসিকে জানিয়েছেন, এ পদক্ষেপ আদৌ জরুরি কি না, তা নিয়ে তাঁরা সন্দিহান। কারণ, সাবেক ডিউক অব ইয়র্ক (অ্যান্ড্রু) সিংহাসনের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারবেন—এমন সম্ভাবনা একেবারেই ক্ষীণ।
গত অক্টোবরে ডাউনিং স্ট্রিট জানিয়েছিল, উত্তরাধিকারীর তালিকা পরিবর্তনের জন্য নতুন কোনো আইন আনার পরিকল্পনা তাদের নেই।
উত্তরাধিকারীর তালিকা থেকে কাউকে বাদ দিতে হলে পার্লামেন্টে আইন পাস করতে হবে। এ আইনে হাউস অব কমন্স ও হাউস অব লর্ডসের সদস্যদের অনুমোদন লাগবে। এরপর রাজার সম্মতি পেলে তা কার্যকর হবে।
শুধু তা-ই নয়, এ পদক্ষেপে কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, জ্যামাইকা, নিউজিল্যান্ডসহ ১৪টি কমনওয়েলথভুক্ত দেশের সমর্থনেরও প্রয়োজন পড়বে। এসব দেশের রাষ্ট্রপ্রধান রাজা তৃতীয় চার্লস।
পার্লামেন্টে আইন পাসের মাধ্যমে উত্তরাধিকারীর তালিকা সর্বশেষ পরিবর্তন করা হয়েছিল ২০১৩ সালে। তখন ‘সাকসেশন টু দ্য ক্রাউন অ্যাক্ট’-এর মাধ্যমে আগে বাদ পড়া ব্যক্তিদের আবার তালিকায় যুক্ত করা হয়। ক্যাথলিক সম্প্রদায়ের কাউকে বিয়ে করার কারণে তাঁদের বাদ দেওয়া হয়েছিল।
আর পার্লামেন্টে আইন পাসের মাধ্যমে সর্বশেষ ১৯৩৬ সালে কাউকে উত্তরাধিকারীর তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল। সে সময় তৎকালীন রাজা অষ্টম এডওয়ার্ড সিংহাসন ত্যাগ করায় তাঁকে ও তাঁর বংশধরদের এ তালিকা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতা স্যার এড ডেভি বলেন, পুলিশকে ‘ভয় বা পক্ষপাতিত্ব ছাড়া তাদের স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়া উচিত।’ তিনি আরও বলেন, ‘তবে স্পষ্টতই এটি এমন একটি বিষয়, যা উপযুক্ত সময়ে পার্লামেন্টকে বিবেচনা করতে হবে। স্বভাবতই রাজপরিবারও চাইবে, তিনি (অ্যান্ড্রু) যেন কখনো রাজা হতে না পারেন।’
এসএনপির ওয়েস্টমিনস্টার নেতা স্টিফেন ফ্লিন জানিয়েছেন, অ্যান্ড্রুকে উত্তরাধিকারীর তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার জন্য আইনের প্রয়োজন হলে তাঁদের দল তাতে সমর্থন জানাবে।
অ্যান্ড্রু ও ভার্জিনিয়ার আলোচিত সেই ছবি ‘আসল’, প্রমাণ পাওয়া গেল ই–মেইলে
ইয়র্ক সেন্ট্রালের লেবার পার্টির আইনপ্রণেতা র্যাচেল মাসকেলও এই পদক্ষেপকে সমর্থন জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘অ্যান্ড্রুকে উত্তরাধিকারীর তালিকা ও কাউন্সিলর অব স্টেটের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার যেকোনো আইন আমি সমর্থন করব।’
রাজা অসুস্থ থাকলে বা দেশের বাইরে গেলে তাঁর হয়ে কাউন্সিলর অব স্টেটের দায়িত্ব পালন করে থাকেন। তবে বাস্তবে রাজপরিবারের সক্রিয় সদস্যরাই শুধু এ দায়িত্ব পালনের ডাক পান।
হাউস অব কমন্স লাইব্রেরি অনুযায়ী, মাউন্টব্যাটেন-উইন্ডসরকে (অ্যান্ড্রুকে) উত্তরাধিকারীর তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হলে তাঁর ওই পদও (কাউন্সিলর অব স্টেট) স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে।
জেফরি এপস্টিনের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে বিবিসি নিউজনাইটে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারের পর তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন অ্যান্ড্রু। এর জেরে ২০১৯ সালে তিনি রাজপরিবারের সব সরকারি দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ান।
শীর্ষনিউজ