Image description
 

গত মাসে টোকিওর উয়েনো চিড়িয়াখানায় এক আবেগঘন দৃশ্য দেখা যায়। হাজার হাজার জাপানি ভক্ত চোখের পানিতে বিদায় জানান দুই জায়ান্ট পান্ডা শাও শাও ও লেই লেইকে। এরপর তাদের চীনের উদ্দেশে বিমানে তুলে দেওয়া হয়। এই দুই পান্ডার বিদায় এখন চীন-জাপান সম্পর্কের অবনতির এক স্পষ্ট প্রতীক।

বেইজিং জানিয়ে দেয়, তারা পান্ডা দুটিকে ফিরিয়ে নেবে। সেই সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার পর বহু দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো জাপানে আর কোনো চীনা পান্ডা থাকল না। বিষয়টি প্রতীকী হলেও এর রাজনৈতিক বার্তা ছিল পরিষ্কার।

সম্পর্কের টানাপোড়েন তীব্র হয়, যখন জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি এমন মন্তব্য করেন, যা দুই দেশের সম্পর্ককে বহু বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনে। এরপর থেকেই চীন নানা উপায়ে চাপ বাড়াতে থাকে। যুদ্ধজাহাজ পাঠানো, বিরল খনিজ রপ্তানি সীমিত করা, চীনা পর্যটন কমিয়ে দেওয়া, কনসার্ট বাতিল করা—এমনকি পান্ডা ফিরিয়ে নেওয়াও সেই চাপের অংশ।

সাম্প্রতিক আগাম নির্বাচনে ঐতিহাসিকভাবে শক্ত জনসমর্থন নিয়ে তাকাইচি নতুন মেয়াদ শুরু করেছেন। বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতিতে দুই পক্ষের কারও পক্ষেই উত্তেজনা দ্রুত কমানো সহজ হবে না। ফলে চীন-জাপান সম্পর্ক শিগগির স্বাভাবিক হবে—এমন আশা খুব কম।

বিতর্কের সূচনা নভেম্বর মাসে। তখন তাকাইচি ইঙ্গিত দেন, তাইওয়ানের ওপর আক্রমণ হলে জাপান তার আত্মরক্ষা বাহিনী সক্রিয় করতে পারে। এই বক্তব্যেই আগুনে ঘি পড়ে।

চীন তাইওয়ানকে নিজেদের অংশ বলে দাবি করে। একদিন বলপ্রয়োগ করে হলেও ‘পুনরেকত্রীকরণ’ করতে পারে—এ সম্ভাবনাও তারা নাকচ করেনি। তাইওয়ানের প্রধান মিত্র যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটন প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তাইওয়ানকে আত্মরক্ষায় সহায়তা করবে।

দীর্ঘদিন ধরেই আশঙ্কা রয়েছে, তাইওয়ানে কোনো হামলা হলে তা সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র-চীন সামরিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে। পরে এতে জাপান ও ফিলিপাইনের মতো যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক মিত্ররাও জড়িয়ে পড়তে পারে।

তাইওয়ান ইস্যুকে চীন একেবারেই ‘লাল দাগ’ হিসেবে দেখে। তাদের দাবি, এটি সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন এবং বাইরের কোনো ‘হস্তক্ষেপ’ তারা মেনে নেবে না। তাকাইচির মন্তব্যের পরপরই বেইজিং কড়া ভাষায় নিন্দা জানায় এবং বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবি তোলে।

পর্যবেক্ষকদের মতে, তাকাইচির বক্তব্য সরকারের আগের অবস্থানের সঙ্গেই মিল ছিল। অতীতেও জাপানের নেতারা এমন কথা বলেছেন। তবে এবার পার্থক্য হলো, ক্ষমতাসীন একজন প্রধানমন্ত্রী সরাসরি এমন মন্তব্য করলেন।

তাকাইচি ক্ষমা চাননি এবং বক্তব্যও প্রত্যাহার করেননি। বিশ্লেষকদের ধারণা, নির্বাচনে বড় জয় তার এই অবস্থানকে রাজনৈতিকভাবে শক্ত ভিত্তি দিয়েছে। তবে তিনি বলেছেন, ভবিষ্যতে নির্দিষ্ট পরিস্থিতি নিয়ে মন্তব্যে আরও সতর্ক থাকবেন। তার সরকার জ্যেষ্ঠ কূটনীতিকদের চীনা সমকক্ষদের সঙ্গে আলোচনায় পাঠিয়েছে। তবু এতে চীনের ক্ষোভ খুব একটা কমেনি।

তাকাইচি অনড় থাকায় চীন ধাপে ধাপে চাপ বাড়ায়। বিশ্লেষকদের ভাষায়, এবার চাপের পরিসর অনেক বিস্তৃত। ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের জাপান চেয়ারের দায়িত্বে থাকা রবার্ট ওয়ার্ড বলেন, এটি ছড়িয়ে থাকা, নিম্নমাত্রার চাপ। অনেকটা তাইওয়ানের বিরুদ্ধে চীনের ‘গ্রে জোন’ কৌশলের মতো, যেখানে অস্বাভাবিক বিষয়কে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক করে তোলাই লক্ষ্য।

কূটনৈতিকভাবে চীন জাতিসংঘে অভিযোগ জানায়। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে নির্ধারিত ত্রিপক্ষীয় শীর্ষ সম্মেলন স্থগিত করে। যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সকে নিজেদের পক্ষে টানার চেষ্টা করে। একই সঙ্গে রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়াকে জাপানের বিরুদ্ধে কথা বলতে উৎসাহিত করে।

মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের আগ্রাসনের ইতিহাস তুলে ধরেন। তিনি তাকাইচির মন্তব্যকে ‘অত্যন্ত বিপজ্জনক’ বলেন।

সামরিক দিক থেকেও উত্তেজনা বাড়ে। জাপানের দাবি, চীন ড্রোন পাঠিয়েছে, তাদের দ্বীপের পাশ দিয়ে যুদ্ধজাহাজ চালিয়েছে, এমনকি জাপানি বিমানের দিকে রাডার তাক করেছে। বিতর্কিত সেনকাকু বা দিয়াওইউ দ্বীপপুঞ্জের কাছে দুই দেশের কোস্টগার্ড মুখোমুখি হয়েছে। গত সপ্তাহে জাপান একটি চীনা মাছ ধরার নৌযান জব্দ করেছে।

তবে সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে অর্থনীতিতে। চীন বিরল খনিজসহ দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তি রপ্তানিতে সীমাবদ্ধতা আরোপ করেছে। অনেকের চোখে এটি অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের কৌশল। চীনা নাগরিকদের জাপানে পড়াশোনা ও ভ্রমণ এড়িয়ে চলতে সতর্ক করা হয়েছে। ৪৯টি রুটে ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। ফলে পর্যটক কমেছে, কিছু শেয়ারের দরও নেমেছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, জাপানে আগত বিদেশি পর্যটকদের এক-চতুর্থাংশই চীনা।

সংস্কৃতি ও বিনোদনও রেহাই পায়নি। চীনে জাপানি সঙ্গীতানুষ্ঠান বাতিল হয়েছে। একটি অনুষ্ঠানে শিল্পীকে মাঝমঞ্চ থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। কয়েকটি জাপানি চলচ্চিত্রের মুক্তি পিছিয়েছে। ইয়াসুকুনি মন্দিরে নির্ধারিত একটি অনুষ্ঠানের কারণে পোকেমনকেও সমালোচনার মুখে পড়তে হয়। মন্দিরটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিহতদের স্মরণে নির্মিত, যাদের মধ্যে চীনের দৃষ্টিতে যুদ্ধাপরাধীও রয়েছেন। শেষ পর্যন্ত অনুষ্ঠানটি বাতিল করা হয়।

চীনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনলাইন জাতীয়তাবাদীরা তাকাইচিকে লক্ষ্য করে আক্রমণ চালায়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি ভিডিওতে আলট্রাম্যান ও ডিটেকটিভ কোনানকে তার সঙ্গে লড়াই করতে দেখানো হয়।

তবে সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের বনি লিন ও ক্রিস্টি গোভেলার মতে, আগের সংঘাতগুলোর তুলনায় চীনের পদক্ষেপ তুলনামূলকভাবে সংযত। তারা সতর্ক করেছেন, এখনো উত্তেজনা আরও বাড়ার যথেষ্ট সুযোগ আছে।

রবার্ট ওয়ার্ড মনে করেন, চীন নিজেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থার রক্ষক হিসেবে উপস্থাপন করতে চায়। তাই তারা পুরোপুরি লাগামছাড়া পদক্ষেপ নিচ্ছে না।

বিশ্লেষকদের ধারণা, উত্তেজনা কমলেও সম্পর্ক আগের চেয়ে উঁচু মাত্রার টানাপোড়েনে স্থির হবে। চীন এখন অনেক শক্তিশালী। আর তাইওয়ান তাদের মূল স্বার্থের কেন্দ্র। ফলে কঠোর অবস্থানই সম্ভবত বজায় থাকবে।

তাকাইচিও তার নির্বাচনী জয়কে নীতিগত সমর্থন হিসেবে দেখবেন। তিনি জিডিপির ২ শতাংশ প্রতিরক্ষা ব্যয়ে বরাদ্দের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, নিরাপত্তা কৌশল সংশোধনের কাজ শেষ করতে চান এবং অর্থনৈতিক প্রণোদনা প্যাকেজ আনার পরিকল্পনা করেছেন।

স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের শোরেনস্টাইন এশিয়া-প্যাসিফিক রিসার্চ সেন্টারের পরিচালক কিয়োতেরু সুতসুই বলেন, চীন বুঝতে পারছে তাকাইচি শক্ত নেতা। অতিরিক্ত চাপ দিলে তিনি দেশে আরও জনপ্রিয় হতে পারেন। তাই চাপের মাত্রা হয়তো সীমিত রাখা হবে। তার ভাষায়, ‘এই ট্যাঙ্গো কিছুদিন চলবে।’

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাকাইচিকে সমর্থন জানিয়েছেন। তবে অনেকের ধারণা, এ বছর যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্ক কিছুটা উষ্ণ হতে পারে। ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের একাধিক বৈঠক নির্ধারিত আছে, এপ্রিল মাসে ট্রাম্পের বেইজিং সফরও রয়েছে।

লিন ও গোভেলা বলেন, সাম্প্রতিক বিরোধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া এখন পর্যন্ত সংযত, যা চীনকে উৎসাহিত করতে পারে। রবার্ট ওয়ার্ডের ভাষায়, জাপানের আশঙ্কা—শি ও ট্রাম্পের মধ্যে কোনো বড় সমঝোতা হয়ে যেতে পারে।

মিউনিখে মার্কো রুবিও ও তোশিমিতসু মোতেগির বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান তাদের সম্পর্ক পুনর্ব্যক্ত করেছে।  

চাপ বাড়তে থাকলে টোকিও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথ প্রতিরক্ষা দায়িত্ব আরও জোরদার করবে। রবার্ট ওয়ার্ড মনে করেন, জাপান চাইবে যুক্তরাষ্ট্র যেন এ অঞ্চল থেকে আগ্রহ হারিয়ে না ফেলে। সেই লক্ষ্যেই তারা আরও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করবে।

সূত্র: বিবিসি