টাইমস অব ইন্ডিয়ার রিপোর্ট
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে দেশের বাকি অংশের সঙ্গে যুক্ত করা পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়ি করিডরে শিগগিরই ভূগর্ভস্থ রেললাইন বসাতে যাচ্ছে ভারত। সোমবার এই ঘোষণা দেন কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব। এ খবর দিয়েছে অনলাইন টাইমস অব ইন্ডিয়া। এতে আরও বলা হয়, ‘চিকেনস নেক’ নামে পরিচিত এই করিডরটি সবচেয়ে সংকীর্ণ স্থানে মাত্র ২০ থেকে ২৫ কিলোমিটার চওড়া। এটি ভারতের অন্যতম সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কৌশলগত অঞ্চল হিসেবে বিবেচিত। করিডরটির এক পাশে নেপাল, ভুটান ও বাংলাদেশ। আর তারও বাইরে রয়েছে চীন।
রিপোর্টে আরও বলা হয়, ভারত সরকারের ভূগর্ভস্থ রেললাইন বসানোর এই সিদ্ধান্ত এমন এক সময় এলো, যখন বাংলাদেশের বিভিন্ন মহল থেকে প্রকাশ্যেই ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল বিচ্ছিন্ন করতে ‘চিকেনস নেক চেপে ধরা’র কথা বলছে। আরও কিছু কণ্ঠ এই অঞ্চলকে ‘গ্রেটার বাংলাদেশ’ ধারণার অংশ হিসেবেও তুলে ধরছে। তিস্তা নদী প্রকল্প ঘিরে ঢাকার সঙ্গে চীনের যোগাযোগ ভারতের উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই বক্তব্যগুলো নিছক উসকানি নয়; বরং এর পেছনে একটি সুস্পষ্ট ভূরাজনৈতিক কৌশল কাজ করছে।
কেন্দ্রীয় বাজেটে রেল মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ নিয়ে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে কথা বলতে গিয়ে অশ্বিনী বৈষ্ণব সাংবাদিকদের বলেন, উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে দেশের বাকি অংশের সঙ্গে যুক্ত করা ৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই কৌশলগত করিডরের জন্য বিশেষ পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। এখানে ভূগর্ভস্থ রেললাইন বসানো এবং বিদ্যমান রেলপথকে চার লাইনে উন্নীত করার পরিকল্পনা চলছে।
নর্থইস্ট ফ্রন্টিয়ার রেলওয়ে (এনএফআর)-এর মহাব্যবস্থাপক চেতন কুমার শ্রিবাস্তব জানান, পশ্চিমবঙ্গের তিন মাইল হাট থেকে রাঙাপানি স্টেশনের মধ্যবর্তী অংশে এই ভূগর্ভস্থ রেলপথ নির্মিত হবে। তিনি বলেন, নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে এই ভূগর্ভস্থ অংশটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ভারতের কাছে শিলিগুড়ি করিডর দীর্ঘদিন ধরেই এক ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ স্থান হিসেবে বিবেচিত। ২০১৭ সালের ডোকলাম সংকটের সময় সামরিক পরিকল্পনাকারীরা প্রকাশ্যেই এই অঞ্চলের ভঙ্গুরতার কথা বলেন। এখানে সামান্য কোনো বিঘ্ন ঘটলেই উত্তর-পূর্বাঞ্চল কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে। যোগান ব্যবস্থা ও সেনা চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক বক্তব্যগুলো সেই পুরোনো আশঙ্কাকেই আবার উসকে দিয়েছে এবং শক্তিশালী অবকাঠামোর প্রয়োজনীয়তাকে সামনে এনেছে।
রেললাইন ভূগর্ভে নিয়ে যাওয়া এবং পরিবহন সক্ষমতা বাড়ানোর মাধ্যমে নয়াদিল্লি সংকটকালেও নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ নিশ্চিত করতে চায়। এই পরিকল্পনা শুধু রেলপথ নিয়ে নয়, এটি দৃঢ় সংকেত দেওয়ার বিষয়ও। ভারত স্পষ্ট করে দিতে চায় যে, কোনো বাহ্যিক হুমকি বা অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার কারণে তার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জীবনরেখা বিপন্ন হতে দেয়া হবে না।
এদিকে বাংলাদেশে বিভিন্নজনের বক্তব্য নিজ দেশেই বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। জাতীয়তাবাদী কিছু গোষ্ঠী যেখানে ‘গ্রেটার বাংলাদেশ’ ধারণাকে এগিয়ে নিচ্ছে, সেখানে অন্যরা সতর্ক করে দিচ্ছে- এ ধরনের অবস্থান ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে অস্থিতিশীল করতে পারে। যে ভারত বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রতিবেশী ও বাণিজ্যিক অংশীদার। তবুও ‘চিকেনস নেক’-এর প্রতীকী গুরুত্ব প্রবলভাবেই রয়ে গেছে, এটি মনে করিয়ে দেয়। দক্ষিণ এশিয়ার নাজুক নিরাপত্তা বাস্তবতায় ভূগোল নিজেই এক ধরনের অস্ত্রে পরিণত হতে পারে।