Image description

ইরানে এক থেকে দুই বছর পরপরই বিক্ষোভ দেখা দিলেও প্রতিবারই দেশটির নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা কাঠামো আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে বলে মন্তব্য করেছেন পররাষ্ট্রনীতি ও ইতিহাস বিশেষজ্ঞ সাবিনা আহমেদ। 

রবিবার (১১ জানুয়ারি) নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক বিশ্লেষণধর্মী স্ট্যাটাসে তিনি বলেন, ‘এক দুই বছর পরপরই ইরানে বিক্ষোভ হয়। লক্ষ্য খামেনি রেজিমের  পতন। এসব বিক্ষোভে থাকে পশ্চিমা বিশ্বের সমর্থন। আর বিক্ষোভে প্রচুর মানুষ গ্রেফতারের পর কারাগার বরণ করে, মেইন ক্যারেক্টারগুলোর হয় ফাঁসি। ইরানে যতবার বিক্ষোভ হয়, ততবার তাদের নিরাপত্তা আর গোয়েন্দা শক্তিশালী হয়। তারা ঠিকই বিক্ষোভ দমন করে ফেলে।’

তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইরানের রেজিম এবং সরকারি লোকজন অত্যন্ত করাপ্টেড, এবং প্রায় প্রত্যেকেই প্রচুর অর্থশালী; যেখানে সাধারণ মানুষের জীবন যাত্রা খুব কঠিন। কাবাবের দেশের মানুষের এখন মাংস কেনার পয়সা নাই। কারেন্সি দফায় দফায় ডিভ্যালু হচ্ছে , মুদ্রাস্ফীতির জন্য জনজীবন বিপন্ন। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ইরানি রিয়াল ডলারের বিপরীতে রেকর্ড লো-তে পৌঁছেছে, প্রতি ডলারে ১.৪৭ মিলিয়ন রিয়াল, যা ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর থেকে মুদ্রার মূল্য ২০,০০০ শতাংশ হারানোর সমান। মুদ্রাস্ফীতি ৪২-৫০ শতাংশে পৌঁছেছে, যা খাদ্যসামগ্রীর দাম দ্বিগুণ করে দিয়েছে এবং দারিদ্র্যসীমার নিচে ২৭-৫০ শতাংশ মানুষকে ঠেলে দিয়েছে। এর ফলে মাংস, দুধের মতো বেসিক আইটেমগুলো সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। তার উপর স্যাঙ্কশনস, মিসম্যানেজমেন্ট এবং রেজিমের প্রক্সি ওয়ারে অর্থ খরচ এই সংকটকে আরও গভীর করেছে।

তিনি বলেন, ইরান এমন একটা দেশ, যেখানে মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী রেজিমকে পছন্দ করে না এমন লোকের সংখ্যা অনেক, বিশেষ করে ইয়াং জেনারেশন। কিন্তু ইরানের সরকারের একটি স্থিতিশীল সমর্থন ভিত্তি রয়েছে। যার প্রমানে গত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অতি-রক্ষণশীল প্রার্থী জলিলির পক্ষে ১৩ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ ভোট দিয়েছিল। এই ধরনের সমর্থন সরকার এবং বাসিজ ও বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীর কার্যকলাপের প্রতি বিপুল সংখ্যক মানুষের সমর্থন জোগায়। এগুলো সহজে বিলুপ্ত হবে না।

সাবিনা আহমেদ বলেন, ইরানে বিক্ষোভ চলছে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে এখন পর্যন্ত। এই বিক্ষোভের মূল লক্ষ্য হলো রেজিম—যেটা নির্বাচিত নয়, ধর্মীয় নেতৃত্বের উপর ভিত্তি করে, সুপ্রিম লিডার খামেনির নেতৃত্বে। এতে আইআরজিসি, গার্ডিয়ান কাউন্সিল এবং বিচার বিভাগের মতো সংস্থা রয়েছে। লোকেরা এই অংশকে সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত বলে মনে করে। এরা বড় বড় দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত, যেমন উচ্চপদস্থ ধর্মীয় নেতা এবং আইআরজিসি এলিটরা অর্থনৈতিক সেক্টর নিয়ন্ত্রণ করে (যেমন চোরাকারবার, তেল, নির্মাণ)। মানবাধিকার লঙ্ঘন করে এবং দেশের ভিতরের চাহিদার চেয়ে প্রক্সি যুদ্ধে টাকা খরচ করে। বিক্ষোভকারীরা খামেনির বিরুদ্ধে স্লোগান দেয় এবং ধর্মীয় ব্যবস্থার শেষ চায়, কারণ এই রেজিমকে সংস্কার করা যায় না এবং তারা জনগণের কাছে দায়বদ্ধ নয়।

তিনি আরও বলেন, সরকার হচ্ছে নির্বাচিত অংশ, প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের নেতৃত্বে। তার অর্থনৈতিক ভুল ব্যবস্থাপনা এবং সংস্কারের প্রতিশ্রুতি পূরণ না করার জন্য সমালোচনা পায়। কিন্তু এটাকে কম দুর্নীতিগ্রস্ত মনে করে মানুষ। এরা রেজিমের তত্ত্বাবধানে কাজ করে এবং স্যাঙ্কশন, মুদ্রাস্ফীতির মতো মূল সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা এদের কম। এবারের বিক্ষোভে দুর্নীতি এবং কষ্ট থেকে মুক্তি চাওয়া হয়, কিন্তু সরকারকে সরাসরি দোষ দেয় না—মূল ফোকাস রেজিমের স্বৈরাচারী অংশে।

তার বিশ্লেষণে বলা হয়, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর ২৮ থেকে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ সারা দেশের ৩১টি প্রভিন্সের ১০০টিরও বেশি শহরে ছড়িয়ে পড়েছে, কিন্তু ২০২২-২৩ এর মাহসা আমিনী আন্দোলনের তুলনায় অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা কম, যদিও স্ট্রাইকস এবং রোড ব্লকসের মতো কৌশলগুলো আরও সংগঠিত এবং এবারের বিক্ষোভে বিক্ষোভকারীদের পক্ষ থেকে সহিংসতার পরিমাণ অনেক বেশি। যেমন ক্ল্যাশে কালাশনিকভ ব্যবহার, গভর্নর অফিসে আগুন দেওয়া, পুলিশ কার পোড়ানো এবং আইআরজিসি ভবন দখলের চেষ্টা; এতে ২৮-৪৫ জন মারা গেছে, ২০০০-এর বেশি গ্রেফতার, এবং সিকিউরিটি ফোর্সেসেরও হতাহত হয়েছে, যা ২০২২ এর তুলনায় প্রোটেস্টারদের পক্ষ থেকে আরও আগ্রাসী প্রতিরোধ দেখাচ্ছে।

সাবিনা আহমেদ আরও উল্লেখ করেন, এই বিক্ষোভ বাইরে থেকে সাহায্য যেমন বিক্ষোভকারীদের পক্ষে ঢুকছে, তেমন বাইরে থেকে তুরস্ক ইন্টেল দিয়ে এটলিস্ট কুর্দি বিক্ষোভকারীদের তথ্য ইরানের ইন্টেলিজেন্সের কাছে দিচ্ছে। তুরস্কের ইন্টেলিজেন্স PJAK মিলিট্যান্টস এবং কুর্দি গ্রুপগুলোর মুভমেন্টস নিয়ে ইরানের সাথে শেয়ার করেছে, যা আইআরজিসি-কে কুর্দি-পপুলেটেড এরিয়ায় অ্যামবুশ এবং অপারেশন চালাতে সাহায্য করেছে; এছাড়া তুরস্কের ফরেন মিনিস্টার হাকান ফিদান বলেছেন যে প্রোটেস্টগুলো ইজরায়েলের মতো রাইভালস দিয়ে ম্যানিপুলেটেড হচ্ছে।

তিনি বলেন, রেজিমের প্রধান সমস্যা হচ্ছে ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার পরেও তারা বিক্ষোভ থামাতে পারছে না। রেজিম এখন পর্যন্ত ফুল ফোর্স দমনে না নেমে মূল হতাদের চিহ্নিত করার চেষ্টা করছে। কিন্তু খুবই শীঘ্রই দমন বৃদ্ধি করবে আর তাতে হতাহতের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু  বিক্ষোভ শান্ত হয়ে গেলেও, সরকারের পরিস্থিতি আগের মতন থাকবে বলে মনে করছি না। পর্দার আড়ালে অনেক কিছু চলছে ইরানের রেজিম/সরকারে। এই রেজিম এবং সরকার কোনও একক ব্যক্তির অধীনে নয়। আর রেজিম/সরকার একদিনে ভেঙে পড়বে বলেও মনে করি না, হাই প্রবাবিলিটি হচ্ছে সরকারের ভিতরেই পরিবর্তন আসবে। তা হতে পারে রাষ্ট্রপতি পেজেশকিয়ান, আলী লারিজানি এবং প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি রোহানির সমর্থনে নাটকীয়ভাবে সরকারের নীতির পরিবর্তন, অথবা যদি আইআরজিসি দেশের দায়িত্ব নেয় তবে সরকারের নীতিতে উল্টো দিকে চরম পরিবর্তন।

সাবিনা আহমেদের মতে, ইরানের অভ্যন্তরে সরকারের কোনো প্রকৃত বিরোধী দল নেই, অন্যদিকে ইরানের বাইরে বিরোধী দলগুলো বিভক্ত ও দুর্বল। তারা ব্যাপক হারে ভুল তথ্য ছড়ানো ছাড়া মাঠ পর্যায়ে তাদের প্রকৃত কোনো প্রভাব নেই। এক্সাইল্ড ক্রাউন প্রিন্স রেজা পাহলভি প্রোটেস্টগুলোকে সাপোর্ট করছে এবং রেজিমকে “ওয়েক এন্ড ডিভাইডেড” বলছে, কিন্তু বিরোধী গ্রুপগুলোর মধ্যে ঐক্যের অভাব এবং দেশের ভিতরে সাপোর্টের কমতি তাদের প্রভাবকে সীমিত করেছে; ইরানের ভিতরে কোনো সংগঠিত অপোজিশন নেই, যা রেজিমকে শক্তিশালী করে তুলেছে, যদিও এক্সাইল্ড গ্রুপস মিসইনফরমেশন ছড়িয়ে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে।

সাবিনা আহমেদ সতর্ক করে বলেন, প্রবলেম হবে যদি কোনও কারণে শাসনব্যবস্থার পতন হয় আর তার ফলে যে শূন্যতার সৃষ্টি হবে তা দেশকে অত্যন্ত অস্থির করে তুলবে। সেই সুযোগে আমেরিকা আর ইজরায়েল তাদের মোক্ষম চালটি চেলে দিবে। ইজরায়েল ইরানের নিউক্লিয়ার সাইটসে স্ট্রাইক চালাতে পারে, যেমন পারচিন বা অন্যান্য ফ্যাসিলিটিসে; আমেরিকা স্যাঙ্কশনস বাড়িয়ে বা মিলিটারি ইন্টারভেনশনের মাধ্যমে প্রক্সি গ্রুপসকে সাপোর্ট করতে পারে, যেমন ট্রাম্পের থ্রেটস অনুসারে ক্র্যাকডাউন অব্যাহত থাকলে ইন্টারভেনশন; এছাড়া ইজরায়েল এবং আমেরিকা রেজিমের দুর্বলতাকে ব্যবহার করে ব্যালিস্টিক মিসাইল বা নিউক্লিয়ার প্রোগ্রামকে টার্গেট করতে পারে, যা ইরানকে ইরাকের মতো অস্থির করে তুলবে। শান্তি চলে যাবে এই ভূখণ্ড থেকে। আর ঠিক এই কারণেই প্রচুর ইরানি আছে যারা এই রেজিমের বিরোধিতা করলেও রেজিম পতন নিয়ে চিন্তিত।

তিনি বলেন, ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড বা আইআরজিসির সরকারের প্রতি গভীর আনুগত্যের কারণে দলত্যাগ করবে বলে মনে করি না, তার উপরে আছে মাথার উপর ইজরায়েলের যে কোন সময়ে আক্রমণের হুমকি। আইআরজিসি তাদের সবচেয়ে ক্রিটিক্যাল সময় পার করছে এখন।

সবশেষে সাবিনা আহমেদ মন্তব্য করেন, ইরানের ইসলামিক রেজিম ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর থেকে সবচেয়ে গুরুতর অভ্যন্তরীণ সংকটের মুখোমুখি, যেখানে অর্থনৈতিক ধস এবং বিক্ষোভের সমন্বয়ে চাপ বেড়েছে। কিন্তু রেজিমের এখনও উল্লেখযোগ্য সমর্থন ভিত্তি রয়েছে, যা আরও কঠোর দমন-পীড়নের দিকে নিয়ে যাবে। তবে বিক্ষোভকারীদের প্রতিক্রিয়া এবং বাইরের চাপের ভিত্তিতে, রেজিমের অভ্যন্তরে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটতে পারে, যা হয়তো অনিবার্য হয়ে উঠবে।