Image description
 

দুই দশকের রাজনৈতিক আধিপত্যের পর এবার থাইল্যান্ডের ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে সরতে শুরু করেছে সিনাওয়াত্রা পরিবার। থানসিন সিনাওয়াত্রা, যিনি একসময় দেশটির রাজনৈতিক মঞ্চে অপরাজেয় চরিত্র হিসাবে আলো ছড়াতেন, আজ তার সেই রাজনৈতিক সূর্য অস্তাচলে। রাজনৈতিক অস্থিরতা, ক্ষমতার লড়াই, এবং জনগণের ক্ষোভের স্রোতে পরিবারতন্ত্রের প্রভাব ক্ষীণ হয়ে পড়েছে। 

 

শুক্রবার থাইল্যান্ডের সাংবিধানিক আদালতের মাধ্যমে পেতংতার্ন সিনাওয়াত্রাকে বরখাস্ত করলে আরও অস্তিত্ব সংকটে পড়ে সিনওয়াত্রা পরিবার।

গত ২৫ বছর ধরে থাইল্যান্ডের রাজনীতিতে একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তার করেছে সিনাওয়াত্রা পরিবার। মূলত ব্যবসায়ী হলেও থাই রাজ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক শক্তি হিসাবে গড়ে উঠেছিল পরিবারটি। তবে শুক্রবার পেতংতার্নের বরখাস্তের মধ্য দিয়ে আপাতত সিনাওয়াত্রা পরিবারের অধ্যায় শেষ হয়েছে বলেই ধারণা করা হচ্ছে। 

২০২৪ সালের আগস্টে দেশটির ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন পেতংতার্ন। কম্বোডিয়ার সাবেক নেতার সঙ্গে তার একটি ফোনকলের রেকর্ড ফাঁস হওয়ায় মাত্র এক বছরের মধ্যেই ক্ষমতা হারালেন তিনি। সদ্য সাবেক এ প্রধানমন্ত্রী থাই রাজনীতির অন্যতম প্রভাবশালী সিনাওয়াত্রা পরিবারের সদস্য।

গত ১৫ জুন ফাঁস হওয়া সেই ফোনকলে তাকে কম্বোডিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী হুন সেনকে ‘আঙ্কেল’ বলতে শোনা যায়। ওই সময় তিনি তার নিজ দেশের সেনাবাহিনীর সমালোচনা করে বলেছেন, তার সেনাদের কারণেই কম্বোডিয়ার এক সেনার প্রাণ গেছে। ওই ফোনকলে পেতংতার্নকে আরও বলতে শোনা যায়, ‘যে কোনো কিছু চাইলে, আমাকে বলবেন। আমি বিষয়টি দেখব।’ তার এ কথাটি নিয়েই মূলত বেশি সমালোচনা শুরু হয়। তার এ ফোনকলের রেকর্ড ভাইরাল হলে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়। 

বিরোধী দলগুলো অভিযোগ করে পেতংতার্ন গোপনে থাইল্যান্ডের স্বার্থকে বিসর্জন দিচ্ছেন। এরপর সাধারণ মানুষের কাছে ক্ষমা চান তিনি। পেতংতার্ন দাবি করেন, কম্বোডিয়ার সঙ্গে উত্তেজনা প্রশমনের কৌশল হিসাবে তিনি এভাবে কথা বলেছিলেন। তবে এসব বলে শেষ রক্ষা হলো না তার। সাময়িক বরখাস্তের পর অবশেষে শুক্রবার আদালতের রায়ে পুরোপুরি ক্ষমতাচ্যুত হলেন তিনি।

 

 

২০০১ সালে থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন পেতংতার্ন সিনওয়াত্রার বাবা থাকসিন সিনওয়াত্রা। তিনি সিনওয়াত্রা পরিবারের সবচেয়ে পরিচিত ও প্রভাবশালী নেতা ছিলেন। তার নীতি ও অর্থনৈতিক প্রজ্ঞার কারণেই জনপ্রিয়তার শীর্ষে ওঠেন থাকসিন। তিনি গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জন্য উন্নয়নমূলক কর্মসূচি চালু করেন। এই নীতি সাধারণ জনগণের মধ্যে তার বিশাল সমর্থন তৈরি করে। থাইল্যান্ডের রাজনীতিতে টপ টু বটম বা প্রান্তিক থেকে ধনী মানুষের রাজনৈতিক দল বলে ধারণা করা হয় থাকসিনের ফেউ থাই পার্টিকেই। 

২০০৫ সালে আবারও ক্ষমতায় এসেছিলেন থাকসিন। সে বছর চমকপ্রদ জয় লাভ করেন থাকসিন। যা তাকে প্রায় অবাধ ক্ষমতা দেয়। কিন্তু এই ক্ষমতা সমানভাবে বিতর্কও বয়ে আনে। তাকে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং গণমাধ্যমের ওপর নিয়ন্ত্রণের অভিযোগে অভিযুক্ত করেন বিরোধীরা।

২০০৬ সালের সেপ্টেম্বরে এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে থাকসিন সিনাওয়াত্রাকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। এই অভ্যুত্থান শুধু রাজনৈতিক দৃশ্যপটই পরিবর্তন করে না, বরং থাইল্যান্ডের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। ২০০৮ সালে স্বেচ্ছায় নির্বাসনে যান থাকসিন। কিন্তু সিনাওয়াত্রা বংশের উত্তরসূরিরা বিভিন্নভাবে ঘুরে ফিরে থাই রাজনীতিতে এসেছেন। 

পরবর্তীতে ২০১১ সালে দেশটির প্রধানমন্ত্রী হন থাকসিনের বোন ইংলাক। রাজনৈতিক নেতা হিসাবে ইংলাক বড় ভাইয়ের ছায়া থেকে মুক্ত হতে পারেননি। তিনি থাকসিনকে প্রত্যাবর্তনের জন্য একটি সাধারণ ক্ষমা বিল পাশ করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। তিনি সেনাবাহিনীর সঙ্গে বোঝাপড়ার মাধ্যমে থাকসিনকে দেশে ফেরাতে চেষ্টা করেন। তবে এই পদক্ষেপই তার কাল হয়ে দাঁড়ায়। সরকারবিরোধীদের ক্ষুব্ধ করে তোলে। যা একসময় সহিংস বিক্ষোভে রূপ নেয়। 

২০১৪ সালে আদালতের রায়ের মাধ্যমে ইংলাকের প্রধানমন্ত্রিত্ব বাতিল করা হয়। কয়েক সপ্তাহ পরে সামরিক বাহিনী তার প্রশাসনের বাকি অংশকেও বিলুপ্ত ঘোষণা করে। এরপর ২০২৩ সালে থাই ক্ষমতার লাগাম ধরতে রাজনীতিতে পা রাখেন থাকসিন সিনাওয়াত্রার কনিষ্ঠ সন্তান পেতংতার্ন সিনাওয়াত্রা। মাত্র এক বছরের মাথায় ক্ষমতা হারালেন তিনিও। থাই রাজনৈতিক বিশ্লেষক থিটিনান পংসুধিরাক বলেছেন, সিনাওয়াত্রা বংশের ভবিষ্যৎ এখন ক্রমশ অন্ধকারের দিকে ধাবিত হচ্ছে।

এদিকে দেশটির ভুমজাইথাই পার্টির নেতা অনুতিন চারণভিরাকুল ঘোষণা করেছেন, নতুন একটি জোট সরকার গঠনের জন্য তার প্রয়োজনীয় সমর্থন আছে। তিনি থাইল্যান্ডের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হতে প্রস্তুত আছেন বলেও জানিয়েছেন। অনুতিন বলেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হিসাবে আমি ২০১৯ সাল থেকেই প্রস্তুত। আদালতের সিদ্ধান্তের পর আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, থাইল্যান্ডকে স্থবির হতে দেওয়া যাবে না। আমরা দেশের শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে চাই।’ তিনি আরও জানিয়েছেন, নতুন জোট সরকারের জন্য পিপলস পার্টির শর্ত মেনে নেওয়া হয়েছে। যা তাদের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনে সমর্থন নিশ্চিত করবে। শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে- সংবিধান সংশোধনের জন্য গণভোট আয়োজন, দেশের শান্তি ফিরিয়ে আনার জন্য সমাধান, প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে আলোচনা, সরকারের নীতিগত বিবৃতি প্রদানের চার মাসের মধ্যে সংসদ ভেঙে সাধারণ নির্বাচন করা। পিপলস পার্টির সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি সংসদে সবচেয়ে বড় দল (১৪৩ আসন)। অনুতিন বলেছেন, ‘আমাদের এমপিরা নতুন সরকারের কোনো পদ নেবেন না। আমরা এখানে সমস্যা সমাধান করতে এসেছি এবং দ্রুত জনগণের হাতে ক্ষমতা ফিরিয়ে দিতে চাই।’ প্রায় ১০ জন ফেউ থাই এমপিও অনুতিনকে সমর্থন দেবেন বলেও জানা গেছে। অনুতিন নিশ্চিত করেছেন, জোট সরকারের জন্য পর্যাপ্ত সমর্থন আছে এবং তিনি দেশের সমস্যা সমাধানে দ্রুত কাজ শুরু করবেন।