দেশের রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান সংহত করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরিসরে যোগাযোগ বাড়াতে তৎপর ইসলামি দলগুলো। সাম্প্রতিককালে দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের বিদেশ সফর, বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও শিক্ষাবিদদের সঙ্গে মতবিনিময়, প্রবাসী কমিউনিটির সঙ্গে যোগাযোগ এবং কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠকের উদ্যোগে এই তৎপরতা স্পষ্ট। মুসলিম বিশ্বের গণ্ডি পেরিয়ে পশ্চিমা দেশ ও আন্তর্জাতিক পরিসরে নিজেদের পরিচিতি বাড়ানোর প্রচেষ্টাও রয়েছে কয়েকটি দলের।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হকের মালয়েশিয়া সফর, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীমের যুক্তরাষ্ট্র সফর এবং এর আগে জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতৃত্ব ও সংসদ সদস্যদের বিভিন্ন দেশে যাতায়াত— সব মিলিয়ে ইসলামি রাজনীতির আন্তর্জাতিক যোগাযোগের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায়।
দলগুলোর নেতাদের ভাষ্য, বিদেশ সফরের মধ্য দিয়ে নিজ নিজ সংগঠনের কার্যক্রম বিস্তৃত করা, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ জোরদার এবং দেশের বাইরে দল সম্পর্কে প্রচলিত ধারণা ও পরিচিতির পরিসর বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হচ্ছে। তবে এসব উদ্যোগের কতটা আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক যোগাযোগে রূপ নেবে, তা নির্ভর করবে ভবিষ্যতের কার্যক্রম ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ধারাবাহিকতার ওপর।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক পাঁচ দিনের মালয়েশিয়া সফর শেষে ২৬ অক্টোবর রাতে ঢাকায় ফেরেন। গত ২২ অক্টোবর তিনি দলের একটি প্রতিনিধিদল নিয়ে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে ঢাকা ছাড়েন। সফরসঙ্গীদের মধ্যে ছিলেন সংগঠনের মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দীন আহমদ, সংসদ সদস্য ও কেন্দ্রীয় নির্বাহী সদস্য মুফতি মুহাম্মদুল্লাহ এবং কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা ফয়সল আহমদ।
এর আগে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে মামুনুল হক আফগানিস্তান এবং ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে সফর করেছেন নেপাল। আফগানিস্তান সফরে তালেবান সরকারের (ইমারাতে ইসলামিয়া) রাষ্ট্রীয় আমন্ত্রণে একটি ওলামা প্রতিনিধিদল নিয়ে তিনি আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলে যান। এই সফরে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং বিশেষ করে মানবাধিকার ও নারী অধিকারের বাস্তব পরিস্থিতি নিয়ে দেশটির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন তারা।
মালয়েশিয়া সফরটি সম্পর্কে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দীন আহমদ আগামীর সময়কে বলেছেন, নিয়মিত সাংগঠনিক কার্যক্রমের অংশ হিসেবেই মালয়েশিয়া সফর। সেখানে বিভিন্ন সেমিনারে অংশগ্রহণ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময় এবং বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যোগাযোগের কর্মসূচি ছিল। তিনি বললেন, তাদের দলের কার্যক্রম বিশ্বের ২২টি দেশে রয়েছে। নিজেও সৌদি আরব, ওমানসহ বিভিন্ন দেশ সফর করেছেন। ভবিষ্যতে দলের আমিরের আরও বিদেশ সফরের পরিকল্পনা রয়েছে।
ইসলামী আন্দোলনের আমির রেজাউল করীমের যুক্তরাষ্ট্র সফরও সাম্প্রতিক সময়ে আলোচনায় এসেছে। সফরসূচিতে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটি, মসজিদ, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময়ের কর্মসূচি রাখা হয়। তিনি বিভিন্ন ধর্মীয় আলোচনা ও দাওয়াতি অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ভারত, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের সুফিবাদের অনুসারীদের সঙ্গেও তার মতবিনিময়ের কথা জানা গেছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সঙ্গে বৈঠক এবং বাংলাদেশে বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনার তথ্যও সামনে এসেছে।
তবে ইসলামী আন্দোলনের নেতারা এ সফরকে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক আদর্শ বা নীতি গ্রহণের উদ্যোগ হিসেবে দেখতে নারাজ। দলটির মহাসচিব মাওলানা গাজী আতাউর রহমান বলছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রে প্রবাসী বাংলাদেশি এবং দলের নেতাকর্মীরা বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালনা করেন। তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশ নিতেই আমির সেখানে গেছেন।
ইসলামী আন্দোলনের সহকারী মহাসচিব শেখ ফজলুল করিম মারুফ বললেন, এ সফরের মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মুসলিম কমিউনিটির সঙ্গে দলের যোগাযোগ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক পরিসরে সংগঠনের পরিচিতি বাড়ানোর পাশাপাশি বাংলাদেশে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি সম্পর্কে প্রচলিত ধারণার বাইরে দলটির নিজস্ব অবস্থান তুলে ধরাও গুরুত্বপূর্ণ।
দলীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বাড়ানোর লক্ষ্যে ইসলামী আন্দোলন একটি আন্তর্জাতিক উপকমিটির কার্যক্রম জোরদার করেছে। দলের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক অধ্যাপক ড. বেলেল নুর আজিজির নেতৃত্বে সাত সদস্যের এই কমিটিতে সাবেক রাষ্ট্রদূত গোলাম মসিহসহ কয়েকজন নেতা রয়েছেন। চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন, জার্মানি, ইরান, অস্ট্রেলিয়া, ফিলিস্তিনসহ বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের কথা জানিয়েছে দলটি।
আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে জামায়াতের তৎপরতাও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে আলোচনায় এসেছে। গত সেপ্টেম্বরে দলটির ৩৪ সংসদ সদস্য মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও ফিলিপাইন সফর করেন। দলটি সফরটিকে শিক্ষামূলক ও অভিজ্ঞতা অর্জনের কর্মসূচি হিসেবে ব্যাখ্যা করে। সফরে মালয়েশিয়ার সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সঙ্গে বৈঠক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শন এবং সিঙ্গাপুরের উন্নয়ন ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো নিয়ে মতবিনিময়ের বিষয় উঠে আসে।
এরপর গত ৭ অক্টোবর জামায়াতের আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান তুরস্ক সফরে যান। ইস্তাম্বুল বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশবিষয়ক একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে তার অংশগ্রহণের কর্মসূচি ছিল। তুরস্কের সঙ্গে বাংলাদেশের সহযোগিতার সম্ভাবনা এবং রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে আলোচনাও সফরটির গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে সামনে আসে। ১১ অক্টোবর তিনি দেশে ফেরেন।
কেন বাড়ছে এই তৎপরতা
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কাছে ইসলামি দলগুলোর বিদেশমুখী তৎপরতার কয়েকটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা রয়েছে। প্রথমত, বাংলাদেশের রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরতে আন্তর্জাতিক পরিসরে পরিচিতি বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। দ্বিতীয়ত, প্রবাসী বাংলাদেশিরা দলগুলোর সাংগঠনিক ও আর্থিক যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তৃতীয়ত, বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক দল, শিক্ষাবিদ, ব্যবসায়ী ও সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ ভবিষ্যতে অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং পারস্পরিক সহযোগিতার সুযোগ তৈরি করতে পারে।
এ ছাড়া ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও অবস্থান নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এ পরিস্থিতিতে ইসলামি দলগুলোও নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয়, সাংগঠনিক সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বিদেশি মহলে তুলে ধরতে আগ্রহী হতে পারে।