Image description

ইসরায়েলের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে প্রান্তিক অবস্থানে থাকা আরব সংখ্যালঘুরা এবারের নির্বাচনে নতুন করে নিজেদের শক্তির জানান দিয়েছেন। গত মঙ্গলবারের নির্বাচনে আরব ভোটারদের রেকর্ডসংখ্যক অংশগ্রহণ দেশটির রাজনৈতিক সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এত দিন ইহুদি-প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো সরকার গঠন ও প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনের ক্ষেত্রে আরব দলগুলোকে পাশ কাটিয়ে চলার যে প্রবণতা দেখিয়েছে, এবারের ফলাফল সেই অবস্থানকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আরব দলগুলোর নির্বাচনী সাফল্য এখন ইসরায়েলের ক্ষমতার লড়াইয়ে উপেক্ষা করা কঠিন এক বাস্তবতা হয়ে উঠেছে।

ইসরায়েলের মোট নাগরিকের প্রায় ২০ শতাংশ আরব। অথচ জাতীয় রাজনীতিতে তাদের প্রতিনিধিত্ব দীর্ঘদিন ধরেই জনসংখ্যার অনুপাতে সীমিত। নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু অভিযোগ করেছিলেন, আরবরা নির্বাচন ‘চুরি করার’ চেষ্টা করছে। তবে নির্বাচনী কর্মকর্তারা ব্যাপক অনিয়মের কোনো তথ্য পাননি। নেতানিয়াহুর এ বক্তব্যকে আরব ভোটারদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক মেরুকরণ তৈরির প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা যেতে পারে। তার লক্ষ্য ছিল ডানপন্থী সমর্থকদের ঐক্যবদ্ধ করা এবং আরব দলগুলোকে ক্ষমতার বাইরে রাখার অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করা।

কিন্তু নির্বাচনের ফলাফল নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক কৌশলকে জটিল করে তুলেছে। প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, আরবদের প্রধান দুটি রাজনৈতিক শক্তি রাআম ও জয়েন্ট লিস্ট সম্মিলিতভাবে পার্লামেন্টে ১৯টি আসন পেতে পারে। বিদায়ী পার্লামেন্টে তাদের আসন ছিল মাত্র ১০টি। এই অগ্রগতি শুধু আসনসংখ্যা বৃদ্ধির ঘটনা নয়; এটি ইসরায়েলের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে আরব নাগরিকদের প্রভাব বিস্তারের সম্ভাবনাও বাড়িয়েছে।

ইসরায়েলের ১২০ আসনের পার্লামেন্টে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ৬১টি আসন। নেতানিয়াহুর জোট এবং তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী শিবির—কোনোটিই এককভাবে প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারবে বলে প্রাথমিক ফলাফলে মনে হচ্ছে না। ফলে সরকার পরিবর্তনের প্রশ্নে আরব দলগুলোর সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আইজেনকট যদি নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করতে চান, তবে তাকে আরব দলগুলোর সঙ্গে সহযোগিতার রাজনৈতিক ঝুঁকি বিবেচনা করতে হবে। আর এখানেই ইসরায়েলের রাজনীতির দীর্ঘদিনের একটি বৈপরীত্য সামনে এসেছে: আরব নাগরিকদের ভোট গ্রহণযোগ্য হলেও তাদের রাজনৈতিক শক্তিকে সরকার গঠনের অংশ হিসেবে মেনে নেওয়ার ক্ষেত্রে অনীহা রয়েছে।

ইসরায়েলের বহু ইহুদি নাগরিক মনে করেন, একটি ইহুদি রাষ্ট্রের সরকারে ইহুদি দলগুলোরই একক প্রাধান্য থাকা উচিত। অন্যদের আপত্তির কেন্দ্রে রয়েছে জাতীয় নিরাপত্তা। তাদের আশঙ্কা, নিজেদের বৃহত্তর ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীর অংশ মনে করা আরব নেতাদের রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের দায়িত্ব দেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলা এবং পরবর্তী গাজা যুদ্ধের পর ইসরায়েলি রাজনীতিতে ডানপন্থী প্রবণতা জোরালো হওয়ায় এই আপত্তি আরও তীব্র হয়েছে। যদিও রাআম ও জয়েন্ট লিস্টের কিছু নেতা হামাসের হামলার নিন্দা জানিয়েছেন, তারা গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানেরও কঠোর সমালোচনা করেছেন।

আরব দলগুলোর মধ্যেও পরিবর্তন এসেছে। রাআম সামাজিকভাবে রক্ষণশীল এবং ইসলামপন্থী রাজনীতির শিকড় থেকে উঠে এলেও দলটি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রশ্নের চেয়ে ইসরায়েলের ভেতরে আরব নাগরিকদের বাস্তব সমস্যার সমাধানে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার মাধ্যমে মূলধারার ইহুদি রাজনীতির কাছে গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর চেষ্টা করেছে। দলটির নেতা মানসুর আব্বাস ইসরায়েলের ইহুদি রাষ্ট্রীয় চরিত্রকে বাস্তবতা হিসেবে স্বীকার করেছেন। এমনকি আরবদের জাতীয় সেবায় অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়েও ইতিবাচক অবস্থানের কথা বিবেচনা করেছেন। নির্বাচনী প্রচারে তিনি একজন ইহুদি আইনপ্রণেতাকে প্রার্থী তালিকার দ্বিতীয় স্থানে রেখে আন্তসম্প্রদায়িক সহযোগিতার বার্তাও দিয়েছেন।

নাজারেথে দলীয় নির্বাচন সদরদপ্তরে এক্সিট পোলের ফলাফলে প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন জয়েন্ট লিস্ট পার্টির ইউসেফ জাবারিন। ছবি: রয়টার্স
নাজারেথে দলীয় নির্বাচন সদরদপ্তরে এক্সিট পোলের ফলাফলে প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন জয়েন্ট লিস্ট পার্টির ইউসেফ জাবারিন। ছবি: রয়টার্স

অন্যদিকে, তিনটি ছোট দলের জোট জয়েন্ট লিস্টকে ইসরায়েলের জায়নবাদী রাজনৈতিক কাঠামোর প্রতি তুলনামূলকভাবে বেশি বিরোধিতাপূর্ণ হিসেবে দেখা হয়। এতে ইহুদি-আরব বামপন্থী শক্তির পাশাপাশি ফিলিস্তিনি জাতীয়তাবাদী ধারাও রয়েছে। প্রাথমিক ফলাফল অনুযায়ী, জয়েন্ট লিস্টই পার্লামেন্টে বড় আরব রাজনৈতিক শক্তি হতে যাচ্ছে। কিন্তু এই সাফল্য আইজেনকটের জন্য একই সঙ্গে সুযোগ ও সংকট তৈরি করেছে। তিনি রাআমকে সরকারে অন্তর্ভুক্ত করতে রাজি হলেও জয়েন্ট লিস্টের সঙ্গে সমঝোতা করলে তার জোটের অনেক ইহুদি ভোটার ও রাজনৈতিক মিত্রের বিরোধিতার মুখে পড়তে পারেন।

নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জয়েন্ট লিস্ট সরাসরি সরকারে যোগ না দিয়েও আইজেনকটকে সহযোগিতা করতে পারে। উদাহরণ হিসেবে, অনাস্থা প্রস্তাবের মাধ্যমে সরকার পতনের উদ্যোগ ঠেকানো বা বিরোধী জোটকে টিকিয়ে রাখতে বাইরে থেকে সমর্থন দেওয়ার কথা বিবেচনা করা যেতে পারে। ১৯৯০-এর দশকে ইসরায়েলের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইৎসাক রবিন আরব আইনপ্রণেতাদের সমর্থনের ওপর নির্ভর করে তার সংখ্যালঘু সরকার টিকিয়ে রেখেছিলেন। অর্থাৎ, বর্তমান পরিস্থিতির ঐতিহাসিক নজির রয়েছে।

ইসরায়েলের আরব নাগরিকদের রাজনৈতিক অবস্থান বুঝতে তাদের দৈনন্দিন বাস্তবতাও গুরুত্বপূর্ণ। তারা ভোট দিতে পারেন এবং কেউ কেউ সুপ্রিম কোর্টসহ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করেছেন। কিন্তু তাদের অনেকেই ইহুদি নাগরিকদের থেকে পৃথক শহর ও জনপদে বসবাস করেন। পশ্চিম তীর ও গাজার ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে তাদের পারিবারিক ও ঐতিহাসিক সম্পর্কও গভীর। আরব নাগরিকদের অনেকের অভিযোগ, আবাসন ও সরকারি পরিষেবার ক্ষেত্রে তারা বৈষম্য ও অবহেলার শিকার। ফলে নির্বাচনে তাদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি শুধু ক্ষমতার হিসাব নয়; রাষ্ট্রের ভেতরে সমান অধিকার ও স্বীকৃতির দাবির সঙ্গেও সম্পর্কিত।

এর আগে ২০২০ সালে আরব দলগুলো সর্বোচ্চ ১৫টি আসন পেয়েছিল। ২০২১ সালে মানসুর আব্বাসের নেতৃত্বে রাআম প্রথমবারের মতো একটি ইসরায়েলি সরকারে যোগ দিয়ে নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করার প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রেখেছিল। সেই সরকার অবশ্য বেশিদিন টেকেনি। এবারের নির্বাচনে আরব দলগুলোর সম্ভাব্য ১৯ আসন তাদের রাজনৈতিক গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

বিশেষজ্ঞ থাইর আবু রাসের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, আরব রাজনীতির একটি অংশ ইহুদি জায়নবাদী মূলধারার কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু ইহুদি রাজনৈতিক শিবিরের দিক থেকে একই আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না। এই বৈপরীত্যই ইসরায়েলের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার একটি মৌলিক প্রশ্ন তুলে ধরে: নাগরিকদের ভোটাধিকার থাকলেই কি তারা রাষ্ট্র পরিচালনায় সমান অংশীদার হতে পারেন?

তাই এবারের নির্বাচন আরব নাগরিকদের রাজনৈতিক শক্তিকে নতুন মাত্রায় দৃশ্যমান করেছে। তবে বেশি আসন পাওয়া আর ক্ষমতার অংশীদার হওয়া এক বিষয় নয়। নেতানিয়াহুবিরোধী জোট আরব দলগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা করতে পারে কি না, তার ওপর সরকার পরিবর্তনের সম্ভাবনা আংশিকভাবে নির্ভর করছে। শেষ পর্যন্ত আরব দলগুলোকে সরকার গঠনের ক্ষেত্রে গ্রহণ করা হবে, নাকি তাদের ভোটের ওপর নির্ভর করেও রাজনৈতিকভাবে দূরে রাখা হবে—সেই সিদ্ধান্তই ইসরায়েলের গণতন্ত্র, নাগরিক সমতা এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কাঠামোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।